Main Menu

২০ দিন না খেয়ে ছিলাম, বেঁচে ফিরব ভাবিনি: ইরান ফেরত বাবুল

Manual2 Ad Code

প্রবাস ডেস্ক: ‘পাখির মতো ঝাঁকে ঝাঁকে বিমান ওড়ে। একটু পরপর মিসাইলের শব্দ। প্রায় ২০ দিন ছিলাম ভাত না খেয়ে। শুধু শুকনো খাবার খেয়েছি। ঘরবন্দি ছিলাম। এক পর্যায়ে মনে হলো, এভাবে মরার চেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দূতাবাসে যাওয়া উচিত। চারদিকে রাস্তাঘাট ভেঙে চুরমার। অনেক ভবন মাটিতে মিশে গেছে। বেঁচে ফিরব বলেও ভাবতে পারছিলাম না।’

এভাবেই ইরানে যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার পানিউমদা গ্রামের বাবুল মিয়া। তিনি ইরানে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে আজারবাইজান হয়ে গত ১৫ এপ্রিল গ্রামের বাড়ি ফিরেছেন।

কাজের সন্ধানে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে ওমানে পাড়ি জমিয়েছিলেন বাবুল। দুই মাস পর অবৈধভাবে ইরানে যান। তেহরানের কাছে হাসিনাবাদ এলাকায় একটি স্টিল কোম্পানিতে কাজ করতেন। তিনি বলেন, ‘কোম্পানিতে আমরা ৮০ জন ছিলাম। থাকার জন্য ১০টি কক্ষ। একেকটি কক্ষে ৮-৯ জন করে থাকতাম। ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে খেয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর ৫টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দ। পুরো ভবন কেঁপে উঠল। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। সবাই এক জায়গায় জড়ো হই। একে অপরের দিকে শুধু তাকিয়ে ছিলাম। বাইরে সাইরেনের শব্দ। প্রথমে ভাবি, ইরানের যুদ্ধবিমান মহড়া দিচ্ছে। পরে জানালা দিয়ে দেখলাম ওপর থেকে মিসাইল ছুড়ছে। সকালে কর্মক্ষেত্রে গিয়ে শুনি যুদ্ধ লেগেছে।’

Manual4 Ad Code

ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারছিলেন না বাবুল। তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকার কাছেই স্কুলে হামলা করে শিশুদের মারা হয়েছে। আমাদের কোম্পানির ভবনের পাশেই বোমা মেরেছিল। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। সরকার থেকেও কোনো নির্দেশনা দিচ্ছিল না। ভয়ে নির্ঘুম রাত কেটেছে। ১ মার্চ সকালে দেখি পুরো এলাকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিছু দোকানপাট খোলা ছিল। সেখান থেকে শুকনো খাবার কিনে নিয়েছিলাম।’

Manual8 Ad Code

বাবুল এক পর্যায়ে জানতে পারেন তেহরান থেকে পাশের শহর সাভেহতে বাংলাদেশের দূতাবাস সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দূতাবাস থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশিদের দেশে নিয়ে যাওয়া হবে। যারা অবৈধভাবে আছেন, তারাও আবেদন করতে পারবেন। এতে কিছুটা আশা জাগে তাঁর মনে। কিন্তু ব্যাংক থেকে শুরু করে সব ধরনের লেনদেন ব্যবস্থা অকেজো ছিল। বেতন হয়নি। জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী। পেটে ক্ষুধা আর অজানা ভয় ঘুম কেড়ে নিলেও কাজ করতে হয়েছে। যখন হামলা হতো তখন চারদিকে ছোটাছুটি করতেন। প্রবাসী বাংলাদেশি ছাড়া আপন কেউ ছিল না। শুধু কামনা করতেন একবারের জন্য মা-বাবা এবং স্ত্রী-সন্তানদের যেন দেখতে পান।

বাবুল মিয়া জানান, ৫ মার্চ থেকে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হচ্ছিল। ইন্টারনেট অনেকটা সচল হয়। পাঁচ দিন পর পরিবারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। সে সময় সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা বারবার বলছিলেন, যেন দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু হাতে টাকা ছিল না। পরিবারের সদস্যরা জানতেন না খাওয়ার টাকাও তাঁর কাছে নেই। এই দিন দুপুরে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ এবং দেশে ফেরার জন্য আবেদন করেন। এদিন খাবারের দোকান খোলে। কিছু টাকা ধার করে পেট ভরে খেয়েছিলেন। এরপর কাজ চলছিল। কোম্পানি থেকে কিছু টাকা দেয়। ধারদেনা সব শোধ করেন। তবে যুদ্ধের তীব্রতা আবার বেড়ে যায়। প্রতিদিন হামলা চলছিল। ১০ মার্চ রাত ২টার পর মিসাইল হামলায় তাদের ভবন বারবার কেঁপে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, রাতেই সব শেষ হয়ে যাবে। পরদিন সকালেই দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দূতাবাস থেকে সাবধানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। জানায়, কাগজপত্র প্রায় প্রস্তুত হয়ে গেছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে তাদের দেশে পাঠানো হবে।

Manual1 Ad Code

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কোম্পানির কাছেই একটি পুলিশ ফাঁড়িতে ২৮ মার্চ মিসাইল হামলা হয়। মুহূর্তেই ফাঁড়িটি মাটির সঙ্গে মিশে যায়। শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া। সেখানে কতজন মারা গেছে, তা আজও অজানা। সেদিন সারারাত কান্না করি। তবে ভোরে দূতাবাস থেকে ফোন আসে। জানায়, আমি ট্রাভেল পাস পেয়েছি। ওইদিন রাতেই আমরা আজারবাইজানে প্রবেশ করব। সকাল হওয়ার আগেই সাভেহ শহরের উদ্দেশে রওনা হই। দুপুরের আগেই পৌঁছাই। পরে ৯টি বাসে বাংলাদেশিরা আস্তারা সীমান্তের উদ্দেশে রওনা দিই। রাত ২টার দিকে সীমান্তে পৌঁছাই। তখন তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। কেউ বন্দরের বিশ্রাম কক্ষে, কেউ খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাই।

ঘুমানোর কোনো সুযোগ ছিল না। গায়ে দেওয়ার মতো ছিল না কম্বল। সকাল ৮টার দিকে স্থলবন্দরের কর্মকর্তারা এসে কাজ শুরু করেন। আজারবাইজানে ঢুকে দেখি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আজারবাইজান ও তুরস্কের বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। এরপর আমাদের গন্তব্য বাকু বিমানবন্দর। বাসেই যাত্রা শুরু। দুপুরের মধ্যে বিমানবন্দরে পৌঁছাই। সবাইকে নিয়ে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয় একটি বিশেষ ফ্লাইট। অবশেষে নিরাপদে মাতৃভূমিতে পা রাখি।’

Manual6 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code