Main Menu

দক্ষিণ সুরমা উপজেলার শ্রেষ্ঠ অদম্য নারীর সাফল্য অর্জনের গল্প

Manual1 Ad Code

বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পর্যায়ে ২টি ক্যাটাগরিতে সাফল্য অর্জনকারী শ্রেষ্ঠ ২ জন অদম্য নারীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। দক্ষিণ সুরমা উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের উদ্যোগে ‘অদম্য নারী’-২০২৫ শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচিত দু’জন শ্রেষ্ঠ অদম্য নারীকে গত ৯ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে সম্মাননা প্রদান করা হয়।

অনুষ্ঠানের সভাপতি দক্ষিণ সুরমা উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস এম অনীক চৌধুরী ও সঞ্চালক উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা খাদিজা খাতুন শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী চম্পা বেগম ও সফল জননী নারী মোছাঃ শেলী বেগম-কে সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদান করেন।

অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী চম্পা বেগম দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার ইউনিয়নের নৈখাই গ্রামের মৃত ইন্তাজ আলীর স্ত্রী। দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবার অভাব অনটনের সংসার থাকায় লেখাপড়া বেশী করতে পারেননি। অষ্টম শ্রেণিতে লেখাপড়া করাকালীন ২০০৫ সালে তার বিয়ে হয়। স্বামী ছিলেন সৌদি আরব প্রবাসী। সংসার সম্পর্কে ধারণা হওয়ার আগেই চম্পা বেগম এক কন্যা সন্তানের মা হন। পুত্র সন্তানের আশায় পাঁচটি কন্যা সন্তানের মা হন। সংসার ভালই চলছিল কিন্তু স্বামী ইন্তাজ আলী এক্সিডেন্ট করে পা ভেঙে ফেলায় তিনি দেশে চলে আসেন। উপার্জনের অন্য কোন উপায় না থাকায়, সংসারে অভাব দেখা দেয়। ৪ বছর পর ২০১৯ সালে স্বামী ইন্তাজ আলী স্ট্রোক করে মারা যান। স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের ভরণপোষণের দায়িত্ব চম্পা বেগমের কাঁধে পড়ে।

Manual4 Ad Code

উপজেলা তথ্য অফিসের মাধ্যমে চম্পা বেগম জানতে পারেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে মহিলাদেরকে আই.জি.এ প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এই তথ্য জানার পর তিনি আই.জি.এ প্রকল্পের টেইলারিং ট্রেডে প্রশিক্ষণে ভর্তি হন। প্রশিক্ষণ শেষে প্রশিক্ষণ ভাতা পান। এই ভাতার টাকা দিয়ে তিনি সেলাই মেশিন ক্রয় করে বাসায় কাজ শুরু করেন। তার কাজ এলাকার মহিলাদের পছন্দ হওয়ায় কাজের প্রতি তার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। কাজের আগ্রহ দেখে উদ্যোক্তা হতে সহায়তা করার লক্ষ্যে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অফিস থেকে চম্পাকে আরেকটি সেলাই মেশিন প্রদান করা হয়।

উপজেলা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে চম্পা বেগম স্থানীয় বাজারে একটি কাপড়ের দোকান করেন। আস্তে আস্তে তিনি ব্যবসার পরিধি বাড়াতে থাকেন। বর্তমানে ‘পাঁচ কন্যা লেডিস টেইলার্স এন্ড ফেব্রিক্স’ নামে তার ব্যবসা চলমান। যা একটি ব্রান্ড নামে সর্বমহলে পরিচিত। তাঁর সকল কর্মসংস্থানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় স্থানীয়ভাবে ৪ জনের আত্মকর্মসংস্থান হয়েছে। এই দোকানে ব্যবসা করে তিনি সংসার খরচের পাশাপাশি তার মেয়েদেরকে লেখাপড়া করাতে পারছেন। বড় মেয়ে এইচ.এস.সি পাশ করেছে। ২নং মেয়ে দ্বাদশ শ্রেণিতে, ৩নং মেয়ে অষ্টম শ্রেণিতে, ৪নং মেয়ে ৫ম শ্রেণিতে এবং ৫নং মেয়ে ২য় শ্রেণিতে পড়ছে। এখন সংসার চালাতে চম্পা বেগমের কোন সমস্যা হচ্ছে না। বর্তমানে তার মাসিক ইনকাম ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা। তিনি সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে সমাজে উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।

দরিদ্র পরিবার থেকে নিজের চেষ্টায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করায় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরিতে চম্পা বেগম দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ অদ্যম নারী।

Manual3 Ad Code

সফল জননী নারী মোছাঃ শেলী বেগম দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলাবাজার ইউনিয়নের কাজিরগাঁও গ্রামের আব্দুল খালিক এর স্ত্রী। তিনি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার অভাব অনটনের সংসার থাকায় লেখাপড়া বেশী করতে পারেননি। অঁজপাড়া গ্রামে বেড়ে ওঠা, পারিবারিক অস্বচ্ছলতা ও দূরবর্তী স্কুল হওয়ায় পড়াশোনা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল। তাঁর স্বামী একজন মৎস্যজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

শেলী বেগমের পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকার কারণে স্বামীর সংসারে এসে অসচ্ছলতার মধ্যেও বাচ্চাদের পড়াশোনাটা চালিয়ে যাওয়ার অদম্য স্পৃহা জন্মে। তাঁর প্রথম তিন সন্তান কন্যা জন্ম হওয়ায় তাঁকে সমাজের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষদের দ্বারা অনেক হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়েছে। পরিবার, সমাজ বুঝিয়েছে মেয়েদেরকে সংসারই করতে হবে; বেশি পড়াশোনার দরকার নেই। কিন্তু শেলী বেগম থেমে থাকেননি। নিজ মেয়েদের সংসারের কাজে না লাগিয়ে পড়াশোনায় মনোযোগী করেছেন। মেয়েদের প্রবল আগ্রহ ও তার অদম্য ইচ্ছায় আজ তাঁর তিন মেয়েই কর্মক্ষেত্র ও সাংসারিক জীবনে সফল। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিনজনই অনার্স, মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন।

Manual2 Ad Code

শেলী বেগমের বড়মেয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোপাইটার, ২য় মেয়ে বাংলাদেশ পুলিশে এ্যাসিট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর ও ৩য় মেয়ে ৪০ তম বিসিএস নন ক্যাডার থেকে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক পদে কর্মরত রয়েছেন, ৪র্থ মেয়ে পড়াশোনা করছে নার্সিং ২য় বর্ষে। একমাত্র ছেলে অনার্সে পড়াশোনাকালীন বিদেশ গমন করে। সে এখন দেশের একজন সফল রেমিটেন্স যোদ্ধা। বর্তমানে তাঁর সন্তানেরা এলাকায় অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়।

সন্তানদের সাফল্যে সমাজে তাঁদের মান মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতাও ফিরে এসেছে। তাই নিজেকে তিনি একজন সফল জননী হিসেবে মনে করেন। হুমায়ুন আজাদের ভাষায় “নারী শুধু মায়ের নাম নয়; সে সাহস, শক্তি ও আত্মত্যাগের প্রতীক”।

জীবন সংগ্রাম শেষে তিনি একজন সফল মা হতে পেরেছেন। জীবনের সব শখ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের শিক্ষিত করায় মোছাঃ শেলী বেগম সফল জননী ক্যাটাগরিতে দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ অদম্য সফল জননী নারী।

দক্ষিণ সুরমা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা খাদিজা খাতুন বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়াধীন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে তৃণমূলের সংগ্রামী নারীদের উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে জীবনযুদ্ধে জয়ী নারীদের স্বীকৃতি প্রদানের জন্য ‘অদম্য নারী অন্বেষণে বাংলাদেশ’ শীর্ষক কার্যক্রমের ধরাবাহিকতায় ২টি ক্যাটাগরিতে দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পর্যায়ে ২ জনকে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে। আগামীতেও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী সম্মাননা প্রদান অব্যাহত থাকবে।

Manual7 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code