জারিগানে মুখরিত বিশ্বনাথের গ্রামাঞ্চল
মোঃ আবুল কাশেম, বিশ্বনাথ (সিলেট) প্রতিনিধি: প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার গ্রামাঞ্চল এখন জারিগানে মুখরিত। বাংলাদেশের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বিলুপ্তপ্রায় এই জারিগানকে নতুন করে জাগিয়ে তুলছেন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের সাধারণ মানুষজন। মহরম মাসের শুরু থেকে মাসের শেষ দিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকে এ গান। উৎসব ঘিরে যুবসমাজ আনন্দ নিয়ে পালন করে জারিগান। পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে জারিগান। মহরম মাসের শেষের দিকে জমে উঠেছে ওই গান। রাতে তারা বিভিন্ন গ্রামে, বিভিন্ন বাড়িতে জারি গানের আসর বসাচ্ছেন। কারবালার বিয়োগাত্মক ঘটনাকে স্মরণ করে সেই ঘটনার ধারাবাহিক বিবরণ সম্বলিত গান গেয়ে আসর মাতিয়ে রাখছেন গায়করা। গানের ফাকে ফাকে চলে চা পান, মাঝে মধ্যে পূতি পাঠ এবং সকালে যথারীতি শিরনী বিতরণ।
বাড়ির উঠানের চারদিকে মাদুর পেতে গোল হয়ে বসেছেন দর্শক-শ্রোতা। গান ধরলেন একজন যুবক। প্রথমে একক কণ্ঠে বললেন ‘হাতে কর হাতের কাম, মুখে লও আল্লার নাম। বলো মুমিন আল্লাহ.. আল্লাহ..আল্লাহ..’। এই আল্লাহ আল্লাহ শব্দটি গায়ক দলসহ দর্শক শ্রোতাও সমস্বরে গেয়ে উঠলেন।
এবার মূল গানে প্রবেশ। “প্রথমে সালাম করি আল্লাহ নবীজী/ সালাম মা ফাতিমার নামো ধরি/ সালাম আলী আসকর তওয়াসা নবী…। হুকুম আল্লার না আছে খবর/ না পাইলাম পানি/ ইমাম সক্কল/ সালাম জানাই আমরা আল্লাজির চরণ।”
“ইমাম হুছন কোলে লইয়া কান্দইন ফাতিমায়/ কে তারে মারিল বাচা ধস্তে করবলায়/ মাত্তম হায় আল্লাহ হায়…। হায় হায় আছকরের লাশ লইয়া হুছন/ মুসলিমও আক্কলের বেটা বড় ফয়লওয়ান…।
এরকম হাজারো কথা নিয়ে কোনো ধরণের বাদ্য বাজানো ছাড়াই সুরের মুর্চনায় আসর মাতোয়ারা করে রাখছেন জারির গায়ক দল। বেশির ভাগ গানের কথা সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত। গায়করাও সেই ভাষাতেই গান গেয়ে থাকেন।
উপজেলার ভোগশাইল গ্রামের আজাদ মিয়ার বাড়িতে গত বুধবার রাত ১১টায় শুরু হওয়া জারির আসর চলে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত। যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রাচীন এ প্রথাটি ধরে রেখেছেন এলাকার মানুষ।
উপজেলার বিশ্বনাথের গাঁও গ্রামের আবদুল সালাম বলেন, মহরম মাসের প্রথম থেকে জারি শুরু হয় এবং চলে মাস শেষ হওয়া পর্যন্ত। প্রতি রাতেই কোনো না কোনো গ্রামে বা বাড়িতে জারির আসর বসছে। দূর দূরান্ত থেকেও অনেকে জারি শুনতে আসেন। কারণ বিশ্বনাথ ছাড়া অন্যে কোন স্থানে জারির প্রচলন তেমন নেই।
ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বলেন, কালের পরিবর্তনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় জারি গান হারিয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বনাথের বিভিন্ন গ্রামে এখনও শুনা যায় জারি গানের আওয়াজ। জারির আসরের জন্য আগে থেকে কোন প্রচার চালানো হয়না। কোন ধরণের মাইকিং, পোস্টারিংয়ের ব্যবস্থা নেই। একজন থেকে আরেকজন শুনে আসরে এসে উপস্থিত হন দর্শকরা। বৃদ্ধ যুবক বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে জারি গানের আসরে দেখা যায়।
যুক্তরাজ্য প্রবাসী আমির আলী বলেন, ছোট বেলায় জারি গান শুনেছি। প্রবাসে থাকাকালে জারির কথা মনে পড়ত। এবার অনেক দিন পর এসে জারি শুনলাম, মনে হল সেই পুরনো দিনে ফিরে গেছি।
জারি গানের বয়াতি আনোয়ার আলী বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে জারী গান করে আসছি। পুরনো প্রথা চালু রাখতে প্রতি রাত জারি গানের আসর বসে আমাদের এলাকায়। আমাদের আশপাশ গ্রাম ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে জারি গান করে থাকি।
Related News
পাখির কলকাকলিতে মুখর নাজিরপাড়া, ১৫ বছর ধরে অতিথিদের মিলনমেলা
মো. সফিকুল আলম দোলন, জেলা প্রতিনিধি,পঞ্চগড়: ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হয় পাখিদের কিচিরমিচির। গাছের ডালেRead More
ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন ৮শ বছরের পুরাতন সেতু
শাহ মনসুর আলী নোমান, লন্ডন থেকে: ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ইংল্যান্ডের ল্যাঙ্কাশায়ার কাউন্টির উইকলার (Wycoller )গ্রামেRead More



Comments are Closed