Main Menu

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক এখন নতুন দিগন্তে-নতুন ইতিহাসে

এ এইচ এম ফিরোজ আলী: বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব এখন বহুগুন বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কারণে বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর নজর বাংলাদেশের দিকে। গত ১৪ অক্টোবর শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং দু’দিনের সফরে সদলবলে বাংলাদেশে এক সফরে আসেন। এর একদিন পর রোববার বাংলাদেশের দরিদ্র জয়ের অসাধারণ সাফল্য দেখতে তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসেন বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। বিদেশি দুই মেহমানের ঢাকা সফর নিয়ে সারাদেশে সাজ-সাজ রব এবং বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ও অথনৈতিক উন্নয়নের সু-বাতাস এখন বইতে শুরু করেছে। আওয়ামীলীগের কঠোর সমালোচকরা বলছেন, শেখ হাসিনার বৃহস্পতি এখন তুঙ্গে। তাঁর দক্ষতা রাজনীতির কৌশলের প্রশংসা করছে বিশ্ব গণমাধ্যম। গত এক সপ্তাহ যাবত ধরে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে এ বিষয়টি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ মুুহুর্তে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিশালী ৯৫ লক্ষ ৯৭ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তন এবং ১৪০ কোটি মানুষের দেশ চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে সফরে আসার বিষয় বিশ্বে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। চীনের প্রেসিডেন্টের আগমনে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সহযোগিতার সম্পর্কের নতুন জানালা নয় বড় দরজা খুলে দিয়েছে। এ যেন রাজনীতির এক বিষ্ময়কর চমক। চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন দিগন্তে-নতুন ইতিহাস। বিশ্বের গণমাধ্যমে শি জিন পিং এবং শেখ হাসিনার বৈঠক ফলাও করে প্রচার করেছে। অনেক গণমাধ্যমে নিজস্ব মতামত দিয়ে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার ভূয়সী প্রশংসা করেছে। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের তৃতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। ইতিমধ্যে চীন বাংলাদেশের ৮৪টি পণ্যের উপর ট্যারিফ বাধা অপসারণ করেছে। গত ১০ বছরে ভারতের পরিবর্তে চীন হয়েছে বাংলাদেশের এক নম্বর আমদানির উৎস।

চীনা প্রেসিডেন্ট আসার আগে বলা হয়েছিল, ২৫ টির মত চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে। কিন্তু শেখ হাসিনার সাথে চীনা প্রেসিডেন্টের প্রথম একান্ত বৈঠকের পর ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষর এবং ৬টি প্রকল্পের ফলক উদ্বোধন করা হয়। সব মহল থেকে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি এগিয়ে গেছে বেশি। অর্থাৎ উভয় দেশ অনায়াসে এখন নতুন উচ্চতার নীতি কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় বিশেষ অবদান রাখতে পারবে। দুই দেশের বিনিয়োগ ও সম্পর্ক বৃদ্ধির পথ প্রশস্তও হয়েছে। সম্ভবত সে কারণেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক শেষে চীনা প্রেসিডেন্ট বলেছেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার কৌশলগত অংশী দারিত্বের স্তর উন্নত করতে আগ্রহী”। আর চুক্তি স্বাক্ষরে সেটার প্রতিফলন ও ঘটেছে। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ দমন, ব্যবসা-বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, সমুদ্র সহযোগিতা, কর্ণফুলী টানেল নির্মাণ সহ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে মোট ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়। ১৫টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় সরকার টু সরকার এবং ১২টি লোন এগ্রিমেন্ট ও মিউচুয়াল এগ্রিমেন্ট হয়। অর্থনৈতিক ও টেকনিক্যাল সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি ফ্রেম ওয়ার্ক গঠনেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কর্ণফুলী টানেল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চুক্তি, রেল, সড়ক সহ যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্যুয়ারেস্ট টার্মিনালের বিষয়ে একটি এগ্রিমেন্ট, বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে ট্রেডিং এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একমত হয়েছে উভয়পক্ষ।

চীনের ১৩টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের ১১টি বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ২টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে ১৩শ ৬০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। মূলত চীন বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে সমপরিমাণের অর্থ ১ লাখ ৭ হাজার ৪৪০ কোটি বাংলাদেশি টাকা চীনা কোম্পানীগুলো প্রদান করবে। ব্যবসায়ীদের সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে উভয় দেশ ২০১৭ সালকে বিনিয়োগ ও বন্ধুত্বের সাল হিসেবে অভিহিত করেছেন। এক্ষেত্রে চীন কি পরিমাণ অর্থ দেবে, তা এ মুহুর্তে জানা না গেলেও চীনা প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘এক অঞ্চল, এক পথ, তথ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত হওয়ার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সফরের কথা স্মরণ করে শি জিন পিং বলেন, ‘আমি খুব খুশি, ছয় বছর পর বাংলাদেশের মতো একটি সুন্দর দেশ সফর করতে পেরেছি। চীন ও বাংলাদেশ ভাল প্রতিবেশী, ভাল বন্ধু এবং ভালো অংশীদার। আমি মনে করি এই সফর সামগ্রিকভাবে দুই দেশের অগ্রযাত্রার বিশেষ ভূমিকা রাখবে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক একটি ঐতিহাসিক টানিং পয়েন্টে এসে দাড়িয়েছে। একে অপরের নিবিড় সহযোগিতার এ সম্পর্ক দুই দেশের উন্নয়নেই ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। সোনার বাংলার স্বপ্ন পূরণে বাংলাদেশের সাফল্য কামনা করেন শি জিন পিং’। ২০১২-১৩ অর্থ বছরে চীনের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ঘাটতি ছিল ৫,৮৬৫ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে চীন থেকে আমাদের আমদানির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে আমরা রপ্তানি করেছি মাত্র ৮০৮ মিলিয়ন ডলার।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং কে দেয়া নৈশভোজে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ চীন বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে চীনা বাজারে বাংলাদেশের সব ধরনের পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের যে সুবিধা চেয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট ইতিবাচক হিসেবে তা মেনে নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের প্রস্তাব যদি অদূর ভবিষ্যতে কার্যকর হয় তাহলে বাংলাদেশ নিজেদের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা অর্জনের বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। চীন বর্তমানে যে গতিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে শক্তি বৃদ্ধির কৌশলপত্র উদ্ভাবন ও বাস্তবায়ন করে অগ্রসর হচ্ছে তাতে বাংলাদেশ এর কৌশলগত অংশীদার হলে আমাদের উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশের গত কয়েক বছরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ দমনে কার্যকর ভূমিকা দেখে, বিশেষ করে পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ কেলেংকারীর ঘটনা- এসব বিবেচনায় এনেই চীন হয়তো বাংলাদেশকে তার অংশীদার হতে আগ্রহী হয়েছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে, পাট ও পাটজাত পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন চীনা পক্ষ। নারীর ক্ষমতায়ন বাংলাদেশের অগ্রগতি থেকে চীন শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফল নের্তৃত্ব ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জনের কথা অন্তত তিন বার উচ্চারণ করেছেন শি জিন পিং। চীনা প্রেসিডেন্ট তার ভাঁষনে, আর ও বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে অনেক বিষয় শিখার রয়েছে চীনের’। চীন-বাংলাদেশ উভয়ই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০৩০ সালের এজেন্ডা অর্জনে একত্রে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।

বাংলাদেশের সামরিক ক্ষেত্রেও চীনা সহযোগিতার কথা বিশেষভাবে উলে­খযোগ্য। ২০১২ সালে চীন একটি সামরিক সহযোগিতামূলক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। চীনা ট্যাঙ্ক, ফাইটার জেট, মিসাইল, সাব মেরিন ও অন্যান্য সমরাস্ত্র বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সমৃদ্ধ করেছে। চীন যেমন বাংলাদেশের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে- বাংলাদেশও খালি হাতে দিতে চায়নি। রাষ্ট্রপতি শি জিন পিং ঘোষিত বহুল আলোচিত ২১ শতকের ম্যারিটাইম সিল্ক রুটকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ। চীন থেকে শুরু হয়ে বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে এ রাস্তা আফ্রিকায় গিয়ে শেষ হবে। এ যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হলে পশ্চিমাদের বাণিজ্য আধিপত্যের বিপরীতে এক বিকল্প আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। যা থেকে এশিয়ার দেশগুলো লাভবান হবে এবং এর নের্তৃত্ব দেবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের ব্যাপারে চীনের আগ্রহের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে চীনের “ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড” মহাপরিকল্পনার প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন লাভ করা। এই মহাপরিকল্পনায় চীনের মূল ভূখন্ডের সাথে ৬০টি দেশকে সংযুক্ত করা। মহাপরিকল্পনার মূলত দুটি অংশ ১) সড়কপথে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের সাথে সংযুক্ত হবে চীন। সড়ক ও রেলপথের সাথে সংযুক্ত থাকবে তেলের পাইপ লাইন। একই সঙ্গে সমুদ্র পথেও বিশেষ করে দক্ষিণ- দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রাচীন সিল্ক রুটের আধুনিক সংস্করণ এটি। সরকারিভাবে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডের’ যে, মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে তাতে দেখা যায় চীনের সিয়ান থেকে উরুমকি, তুরস্কের ইস্তাম্বুল এবং ইউরোপের স্পেনের মাদিদ পর্যন্ত সড়ক পথ তৈরি হবে যা কিনা মধ্য এশিয়ার কিরখিজস্তান, কাজাখস্তান হয়ে মস্কো, পোল্যান্ড, জার্মানির হামবুর্গ, হল্যান্ডের রটারডাম হয়ে মাদিদে গিয়ে শেষ হবে। ২) একই সঙ্গে চীন একটি ম্যারিটাইম তথ্য সামুদ্রিক সিল্ক রুটের মহাপরিকল্পনা ও প্রণয়ন করেছে। এই সামুদ্রিক সিল্ক রুটের মাধ্যমে একদিকে আফ্রিকার জিবুতি, কেনিয়ার মোমবাসা বন্দরের সাথে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার শ্রীলংকা, সিঙ্গাপুর ও মিয়ানমারকেও একটি অংশের সাথে সংযুক্ত করতে চায়। মধ্য এশিয়া রাশিয়া সহ “ম্যারিটাইম সিল্ক রুট” ভুক্ত অনেক দেশ সংযুক্ত হলেও ভারত-বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট নয়। তবে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার আলোকে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়কপথ নির্মাণে, যে প্রস্তাব রয়েছে তাতে আগ্রহ রয়েছে। বস্তুত ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড এবং ম্যারিটাইম সিল্ক রুটের আওতায় চীন দুটি ইকোনমিক করিডোর সৃষ্টি করছে। একটি কুনামিং থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথ। দ্বিতীয়টি চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের খাসগর থেকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সমুদ্রবন্দর গাওদার পর্যন্ত রেল ও সড়কপথ। এই অর্থনৈতিক করিডোরের ব্যাপারে ভারতের আপত্তি রয়েছে।

স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় চীন বাংলাদেশকে সমর্থন দেয়নি। বরং পশ্চিম পাকিস্তানকে সব রকমের সাহায্য দিয়েছে। যার মধ্যে সামরিক সাহায্য ছিল সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় চীন স্বীকৃতিও দেয়নি। জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভে ভেটোও দিয়েছিল। বাংলাদেশের প্রতি চীনের এই বৈরী মনোভাব ভূ-রাজনৈতিক কারণে ছিল। এসব সুদূর অতীতের কথা। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এখন বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং এগিয়ে যাবে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই মূলত পূর্বমুখী কুটনীতির একটি নতুন ধারার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। ২০১০ সালে ও শি জিন পিং বাংলাদেশে এসেছিলেন। সে সময় দ্বি-পক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের মূলক্ষেত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৪ সালের জুন মাসে শেখ হাসিনা চীন সফর করেন। এক্ষেত্রে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিস্পত্তির মাধ্যমে বিশাল সমুদ্র এলাকা জয় হওয়ায় বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের প্রভাব সমুদ্র অর্থনীতি তথা সামুদ্রিক ও পণ্য পরিবহণে বাংলাদেশকে এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্কের ইতিহাস কিন্তু নতুন নয়। চীনের সাথে রয়েছে বাংলাদেশের হাজার বছরের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্ক। চীনের সঙ্গে তৎকালীন বঙ্গ ভূ-খন্ডের সু-সম্পর্ক কয়েক হাজার বছরের। সেই অবিচ্ছিন্ন সম্পর্কের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। দুই ভূ-খন্ডের শিক্ষা-দীক্ষা, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড বিনিময় ছিল সৌহার্দপূর্ণ। চীন-বাংলার সম্পর্কের সূত্রপাত করেছিলেন, চীনা পর্যটক ফা-হিয়েন। তিনি চীনের পূর্বাঞ্চলের চীন রাজবংশের ভিক্ষু ছিলেন। ৩৯৯ সালে ৬৩ বছর বয়সে তিনি দক্ষিণাঞ্চলীয় সিল্ক রোড ধরে চীনের ছাং আন প্রদেশ থেকে রওয়ানা হয়ে আজকের বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলংকা ও ইন্দোনেশিয়া ভ্রমন করে বাংলায় এসে দু’বছর অবস্থান করেন। এসময় বঙ্গ অঞ্চলে ৩০টি বৌদ্ধ মঠ এবং প্রায় দুই হাজার ভিক্ষু ছিলেন। চীনের থাং রাজবংশের ধর্মগুরু হিউয়ান সাং ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় আসেন বৌদ্ধ ধর্মের পাঠ গ্রহণ করতে। বাংলায় ৫ বছর অবস্থান করে কুমিল­ার চান্দিনা উপজেলার বাসিন্দা বৌদ্ধ ধর্মের মহাপন্ডিত শীলভদের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। চীনা ভিক্ষুকের কাছে তৎকালীন বাংলা ছিল “ওয়েস্টার্ন হেভেন”। যার টানেই জিং নামে আরেক জন পর্যটক ৬১৭ সালে বাংলায় এসে ৩০ বছর বাংলা সহ ভারত বর্ষ পরিভ্রমন করেন। এসময় তিনি ভারত বর্ষের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। ৯৮২ সালে বিক্রমপুরের বজ্রজোগিনা গ্রামে জন্ম গ্রহণকারী অতীশ দীপঙ্কর ১১০০ শতাব্দীতে চীন বাংলার সংস্কৃতি বিনিময়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তিব্বতের গুগ্ররাজ্যের রাজার আমন্ত্রনে তিনি ১০৩৮ সালে সেখানে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম কার্যক্রম শুরু করেন। সেখানে তিনি ১৬ বছর অবস্থান করে বৌদ্ধ ধর্মের ওপর দুই শতাধিক বই রচনা করেন। অতীশ দীপঙ্কর প্রথম বাঙালী ছিলেন যিনি চীনে প্রথম চা পান করেছিলেন। চা ও তিলের উৎপত্তি চীনের ইউনান ও কায়েচী প্রদেশে। সেটাও পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে স্থানান্তর হয়। ১৪১৪ সালে তৎকালীন বাংলার সুলতান গিয়াস উদ্দিনের ছেলে সুলতান সাইফুদ্দিন শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ ‘ছিলিন’ নামে আফ্রিকার একটি জিরাফ চীনকে উপহার দেন। এ ধরনের প্রাণীর বিষয়ে চীনের কোন ধারণা ছিল না। সুলতানি আমলে চৈনিক পর্যটক জেং হো দুই বার বাংলায় এসেছিলেন। চীন সম্রাটের দূত হিসাবে হৌ শিয়েন নামের আরেক জন তিন বার বাংলাদেশ ভ্রমন করেন। ৫০ দশকে চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ে পূর্ব বাংলায় সফরের মাধ্যমে চীনের সাথে সু-গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন পূর্ব বাংলার জাতীয় নেতা। চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রনে বঙ্গবন্ধু দুই বার চীন সফর করেন। সে সুবাধে তার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে চীনের জাতীয় নেতা মাও জে দং, চৌ এন লাই, জুদে ও লিউ সাউছি প্রমুখের সঙ্গে। ১৯৭৮ সালে বৌদ্ধ ধর্মের মহাপন্ডিত অতীশ দীপঙ্করের দেহাবসেষের অংশ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। সেই ঐতিহাসিক দেহাবসেষটি ঢাকার ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মন্দিরে সংরক্ষিত আছে।
লেখক: কলামিস্ট

Share





Related News

Comments are Closed