Main Menu

দক্ষিণ সুরমার সম্মুখ যুদ্ধ ও মুক্ত দিবস আজ

Manual6 Ad Code

বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল হক: সুরমা নদীর দক্ষিণ তীর ঘেঁষে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা জনপদের অবস্থান। শহরের কাছের জনপদ হওয়ায় ১৯৭১ সালের তৎকালীন সিলেটের বিভিন্ন জেলা ও থানার গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও সদরের অনেক ইউনিয়ন পরিষদের অবস্থান ছিল এখানে। সড়ক ও রেলপথে মূল শহরে প্রবেশ করতে হয় দক্ষিণ সুরমা দিয়ে। ফলে অবস্থানগত কারণে এ জনপদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই জনপদের মানুষ গৌরবময় ভূমিকা রেখেছেন। একাত্তরের ডিসেম্বর মাস। আজ ১৩ ডিসেম্বর, আজকের এই দিনে দক্ষিণ সুরমার সম্মুখ যুদ্ধ ও পাকহানাদার মুক্ত হয় কদমতলীসহ গোটা দক্ষিণ সুরমা। সারা দেশের মতো সিলেটের মুক্তিযোদ্ধারাও সম্মুখ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই সময় দক্ষিণ সুরমার কদমতলীস্থ পুরাতন বাসস্ট্যান্ড এলাকার বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা চত্বরের বিপরীতে ছিল পাক হানাদার বাহিনীর সেনাদের ক্যাম্প।

Manual8 Ad Code

মেজর সরফরাজ, মেজর বশারত, হাবিলদার মোস্তাকের নেতৃত্বে ২০০-২৫০ জন হানাদার বাহিনী সেখানে অবস্থান করত। তাদের সাথে যোগ হয় ১৫-২০ জন রাজাকার। যাদের সকলের বসত ছিল দক্ষিণ সুরমা এলাকায়। বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে একদিকে সিলেট-ফেঞ্চুগঞ্জ সড়ক, অপরদিকে সিলেট-জকিগঞ্জ ও সুতারকান্দি সড়ক। এ দু’টি সড়কের মধ্যবর্তী স্থানে ছিল বিরাট বটগাছ। বটগাছের নিচেই ছিল হানাদার বাহিনীর চেকপোস্ট। চেকপোস্টে নিয়মিত বাস যাত্রীদের নামিয়ে হয়রানি করা হত। দখলকার বাহিনীর লোকেরা যাত্রীদের অনেককে ধরে নিয়ে যেত সুরমা নদীর তীরে। তারপর গুলি করে হত্যা করে লাশ ভাসিয়ে দিত সুরমার জলে। কেউ তাদের না চেনায় এসব হতভাগাদের নাম শহীদদের তালিকায়ও ঠাঁই পায়নি। সিলেটের কদমতলী বাসস্ট্যান্ড মসজিদের অজুখানার উত্তরদিকে গর্তে গুলি করে প্রায়ই নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করত। প্রায় প্রতিদিনই তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে চোখ বাঁধা অবস্থায় ভ্যানে করে লোকজনকে ধরে নিয়ে আসত ক্যাম্পে। তারপরে এসব বন্দিদের নিয়ে শিববাড়ি লালমাটি এলাকার রেললাইনের পশ্চিম দিকে গুলি করে হত্যা করে মাটি চাপা দিত। এলাকাটি বধ্যভূমিতে পরিণত হয়।

Manual6 Ad Code

৭১-এর ৮ ও ৯ ডিসেম্বর ডুবরি হাওর বর্তমান উপশহর, হাদারপাড়া, তেররতন এলাকায় হেলিকপ্টার যোগে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী অবস্থান নেয় এবং আমি আমার এলাকার আলতু মিয়া পীরকে নিয়ে আমার সাথে ট্রেনিংপ্রাপ্ত ভারতের দেরাদুনের মহল্লাল সম ও সদর উদ্দীন চৌধুরী, মকসুদ ইবনে আজিজ লামা, ছানাওর আলী, আব্দুশ শহিদ বাবুল, বাবুধন মিয়া, সুলেমান এদের সাথে হযরত বুরহান উদ্দিন (রহ.) মাজারে সাক্ষাৎ করি। পরবর্তীতে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে তুমুল যুদ্ধ হয়। আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই এবং আমি আবার দক্ষিণ সুরমায় হামিদ মিয়ার বাড়িতে অবস্থান করি। এখানে আমার সাথে সংযুক্ত হন আমার গ্রামের চাচাত ভাই ম.আ. মুক্তাদির, আব্দুল মতিন (খোজারখলা), আফরাইম আলী (মোল্লারগাঁও), মনির উদ্দিন (মোল্লারগাঁও), ছইল মিয়া (খালেরমুখ), আনোয়ার হোসেন গামা (ছড়ারপার), জলাল উদ্দিন ও শামস উদ্দিন (মাছিমপুর), বেলাওয়াত হোসেন খাঁন (হবিগঞ্জ), আরও ২/৩ জনের নাম মনে পড়ছে না। ঐদিনই পরিকল্পনা হয় রেলস্টেশনে অবস্থানরত মিত্রবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করে কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে (পুরাতন) আর্মি ক্যাম্পে আক্রমণ করা দরকার। সেই অনুযায়ী মিত্র বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করি। ১৩ ডিসেম্বর আমাদের অবস্থান মরহুম হামিদ মিয়ার বাড়িতেই।

১২ ডিসেম্বর সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে খবর পাই ৫ জন পাকিস্তানি সেনা আলমপুর শিল্পনগরীর দিক হতে হেঁটে কদমতলী ক্যাম্পের দিকে আসছে। তাৎক্ষণিক আমরা বর্তমান বর্তমান পল্লি বিদ্যুৎ অফিসের নিকট ডিফেন্স গ্রহণ করি এবং তারা আসার সাথে সাথেই গুলিবর্ষণ করলে ৩ জন হাওর দিয়ে দৌড়াতে থাকে এবং নদীর পাড়ে চলে যায়। দুইজন কদমতলীস্থ খলকু মিয়ার বাড়িতে অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে সুকৌশলে তাদেরকে আত্মসমর্পণ করাই। তাদের ব্যবহৃত চায়নিজ রাইফেল আয়ত্তে আনি এবং তাদের দুইজনকে মরহুম হামিদ মিয়ার বাড়িতে ধান রাখার গুদামে বন্দি করে রাখি।

১৩ ডিসেম্বর ভোর ৬ ঘটিকায় মিত্র বাহিনীর মেনিখলাস্থ রাস্তায় আসলে আমরা তাদের সাথে যোগ দিই। তাদেরকে নিয়ে বর্তমান আনন্দ বিপণি মার্কেটের সামনে বাঙ্কার সৃষ্টি করে পজিশন নিয়ে ক্যাম্পের দিকে গুলিবর্ষণ করি। পাক সেনারা ক্যাম্প হতে ক্যাম্পের পিছনে গোরস্থান ও ইট ভাটায় আশ্রয় নেয়। অনেক গোলাগুলির পর প্রায় বিকাল ৩ টার দিকে ২১ জন আত্মসমর্পণ করে। এই সময় নদীর উত্তরপাড় হতে একটা মর্টার আমাদের বাঙ্কারের উপর পড়ে। বাঙ্কারে অবস্থানরত সুবেদার রানা ও তার সাথে মিত্র বাহিনীর দুইজন ঘটনাস্থলে মারা যান। পরবর্তীতে আমরা ২১ জন পাকসেনা ও হামিদ মিয়ার বাড়িতে বন্দি থাকা দুইজন এই ২৩ জনকে শহীদ রানাসহ মিত্র বাহিনীর আরও দুইজন শহীদ এদেরকে মিত্র বাহিনীর অবস্থিত ক্যাম্প রেলস্টেশনে নিয়ে যাই। আমরা ও আমাদের গ্রামের যুবক মজম্মিল বক্ত, মকবুল হোসেন, কবির আহমদ ও ইছহাক মিয়া সহ আরও অন্যান্যরা। ঐ দিন রাতে আমরা হামিদ মিয়ার বাড়িতে অবস্থান করি।

Manual2 Ad Code

১৪ ডিসেম্বর মঈন উদ্দিন মিয়ার বাড়ি হতে আত্মগোপন অবস্থায় আরেকজন পাকসেনাকে আটক করি। তাকেও রেলস্টেশনে পৌঁছে দেই। এরপর মোগলাবাজার হতে আসা একটি আর্মি ভ্যান গুলি করে ড্রাইভারকে হত্যা করি ঝালোপাড়া মসজিদের সামনে। এরপর ১৪ ডিসেম্বর বিকালে আমার নেতৃত্বে শুধু মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নিয়ে মোল্লারগাঁও কলাপাড়া ও জিন্দাবাজারে বিভিন্ন অপারেশনে অংশগ্রহণ করি।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল ঢাকা।

Manual8 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code