Main Menu

ইউরোপের পথে প্রবাসীদের স্বপ্ন ও সংগ্রামের ব্যবচ্ছেদ

Manual8 Ad Code

শামসুল ইসলাম: ইউরোপ, এক মায়াবী হাতছানির নাম। উন্নত জীবন-যাপন আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় প্রতি বছর হাজারো বাংলাদেশি তরুণ এই মহাদেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু এই স্বপ্নযাত্রার পথ সবার জন্য সমান মসৃণ হয় না। কেউ বৈধ পথে মেধার স্বাক্ষর নিয়ে যান, আবার কেউ জীবনকে তুচ্ছ করে দুর্গম পথ কিংবা উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে চান স্বপ্নের বন্দরে। এই অনিশ্চিত যাত্রায় দু:খজনকভাবে অনেক তরুণকে অকালে প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয়, যা আমাদের সমাজব্যবস্থার এক করুণ বাস্তবতাকে তুলে ধরে।

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যারা শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন, তাদের জন্যও সাফল্যের পথ খুব একটা সহজ হয় না। নতুন দেশে পা রাখতেই প্রথম বড় যে ধাক্কাটি আসে, তা হলো ভাষা। ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশেরই রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও স্বতন্ত্র সংস্কৃতি। ফলে ভাষাগত দুর্বলতা কাটাতে এবং ভিন্নধর্মী সামাজিক নিয়ম-কানুনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায়। এর সাথে যোগ হয় বিরূপ আবহাওয়া। বাংলাদেশের নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুতে বেড়ে ওঠা মানুষের জন্য ইউরোপের হাড়কাঁপানো শীত এবং ধূসর আকাশ মানিয়ে নেওয়া এক বড় চ্যালেঞ্জ। এই নতুন পরিবেশে খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে জীবনযাপনের প্রতিটি স্তরেই লড়তে হয় একাকীত্বের সঙ্গে।

ইউরোপে পৌঁছানোর পর প্রবাসীদের সামনে সবচেয়ে বড় যে পাহাড়সম বাধা এসে দাঁড়ায়, তা হলো বৈধভাবে স্থায়ী হওয়া। দেশ ত্যাগের আগে অনেকেই এই জটিলতার কথা আঁচ করতে পারেন না। দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে একজন প্রবাসীকে সেখানে থিতু হতে হয়। যাদের ভাগ্য সহায় হয় না, তাদের দিনের পর দিন মানসিক যন্ত্রণা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়। এই আইনি লড়াইয়ের সমান্তরালে চলে টিকে থাকার কঠোর পরিশ্রম।

Manual8 Ad Code

কর্মজীবনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা সাধারণত ইউরোপের সবখানেই তাদের একনিষ্ঠ শ্রম ও সততার জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত। ইউরোপের রেস্টুরেন্ট, হোটেল-মোটেল, নির্মাণ খাত থেকে শুরু করে আইটি কিংবা স্বাস্থ্যসেবার মতো সম্মানজনক পেশায় আজ বাংলাদেশিদের সরব উপস্থিতি রয়েছে। প্রবাসীদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটে দেশে ফেলে আসা স্বজনদের মুখে হাসি ফোটানোর চিন্তায়। নিজের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে অনেকেই একাধিক কাজ করেন এবং উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠান। এই রেমিট্যান্স আজ আমাদের জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, যা দেশের উন্নয়নের চাকাকে সচল রাখতে অনবদ্য ভূমিকা রাখছে।

Manual8 Ad Code

তবে ইউরোপের এই জীবনগাথা কেবলই সংগ্রামের নয়, বরং অদম্য অর্জনেরও। নতুন প্রজন্মের প্রবাসী বাংলাদেশিরা এখন শুধু কায়িক শ্রমেই সীমাবদ্ধ নেই; তারা ইউরোপের নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে মূলধারার সমাজে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে যেমন পরিচিতি পাচ্ছেন, তেমনি যুক্ত হচ্ছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মূলধারার রাজনীতির সাথে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারা আজ জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাকে গর্বের সাথে তুলে ধরছেন। ইউরোপের ব্রিটেনে বহু আগে থেকেই এমপি, স্থানীয় পৌর মেয়র, কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে আসছেন। অনেকে মন্ত্রীও হয়েছেন। এছাড়া সম্প্রতি ফ্রান্সের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বেশ কিছু বাংলাদেশী নির্বাচিত হয়েছেন।

ব্যস্ত ও যান্ত্রিক জীবনের মাঝেও প্রবাসীরা তাদের সাংস্কৃতিক শেকড়কে আঁকড়ে ধরে রাখেন পরম মমতায়। ঈদ, পূজা, পহেলা বৈশাখ কিংবা বিজয় দিবস,অমর একুশের মতো জাতীয় ও ধর্মীয় উৎসবগুলো তারা প্রবাসের মাটিতে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উদযাপন করেন। এই মেলবন্ধন তাদের বিদেশের মাটিতেও এক টুকরো বাংলাদেশ উপহার দেয়। প্রবাসীরা ইউরোপে স্থায়ী হলেও এবং পরিবার নিয়ে বসবাস করলেও মন পড়ে থাকে জন্মভূমিতেই। দেশের প্রতিটি ক্ষুদ্র অর্জন তাদের যেমন আবেগাপ্লুত করে, তেমনি দেশের সংকটে তারা ব্যথিত হন।

ইউরোপ প্রবাসীরা ক্রমাগতভাবে তাদের কিছু দাবি তুলে ধরেন বাংলাদেশ সরকারের কাছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো,পাসপোর্ট সমস্যা, জাতীয় পতাকাবাহী বিমানের ফ্লাইট চালু, লাশ বিনা খরচে দেশে নেয়া ইত্যাদি। পাসপোর্ট জটিলতা অনেকসময় একজন প্রবাসীর জীবন বিষিয়ে তুলে। সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোর আরো মানবিক ও করিৎকর্মা হওয়া আবশ্যক। একটি পাসপোর্ট সমস্যা একজন প্রবাসীর বৈধতার জন্য অনেক সময় মহাগুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। তারা চান পাসপোর্ট নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার অবসান।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, প্রবাসীদের অর্জিত বিশাল অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছে। ইউরোপের মাটিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সাথে প্রতিযোগিতা করে তারা যে সক্ষমতা অর্জন করেন, তা দেশের উন্নয়নে বিনিয়োগ করার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনুকূল পরিবেশের অভাবে থমকে যায়। প্রতিটি সরকার প্রবাসীদের কল্যাণে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নিয়ে প্রবাসীদের মাঝে আক্ষেপ রয়েছে। তাই দেশের সমৃদ্ধির স্বার্থে প্রবাসীদের বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং তাদের অভিজ্ঞতাকে দেশ গঠনে কাজে লাগানোর কার্যকর সুযোগ তৈরি করে দেওয়া রাষ্ট্রের জন্য এখন সময়ের দাবি। সব মিলিয়ে, ইউরোপে বাংলাদেশি প্রবাসীদের জীবন একটি চলমান যুদ্ধ—যেখানে ত্যাগ আর সংগ্রাম আছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে টিকে আছে স্বপ্ন পূরণের অবিনাশী প্রেরণা।

Manual6 Ad Code

 

 

 

 

 

Manual6 Ad Code

লেখক : সম্পাদক, ফ্রান্স দর্পণ, ইউকে প্রবাসী

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code