Main Menu

গ্রীষ্মের লোডশেডিং ও জনজীবন বিপন্ন

Manual1 Ad Code

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: ভয়াবহ লোডশেডিং চলছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। আকস্মিক অস্বাভাবিক লোডশেডিং হওয়ায় গরমের মধ্যে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। অনেক স্থানে দিনে রাতে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশিডিংয়ের খবর পাওয়া গেছে। লোডশেডিংয়ের কারণে বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে। দিনে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি রাতে লোডশেডিং বাড়ায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।

সূত্র বলছে, জ্বালানি সংকটে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। জ্বালানি আমদানিতে জটিলতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল সমস্যার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। জ্বালানি সংকটে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন তাতে বাড়ছে লোডশেডিং।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল কেনার টাকা দিতে পারছে না। এদিকে রামপাল ২ নম্বর ইউনিটও হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। সব মিলে এবার গরম শুরু হতে না হতেই ভয়াবহ লোডশেডিং শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এবং বকেয়া পাওনার কারণে এবার কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের বড় ধরনের মজুতের উদ্যোগ কম। এমন অবস্থায় মে মাসের গরমে লোডশেডিং ২ হাজার মেগাওয়াটও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সূত্র জানায়, ঘনঘন লোডশেডিংয়ের প্রভাবে ভেঙে পড়েছে প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবা। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকায় হাসপাতালগুলোর ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। অন্ধকার, তীব্র গরম ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ায় কষ্ট বেড়েছে রোগী ও তাদের স্বজনদের। কোথাও জেনারেটর থাকলেও জ্বালানির অভাবে তা চালানো যাচ্ছে না। আবার কোথাও সীমিত সোলার ব্যবস্থার কারণে অফিস কক্ষ সচল থাকলেও সাধারণ রোগীদের ওয়ার্ডগুলো থাকছে অন্ধকারে।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ সূত্র জানায় , বৃহস্পতিবার গত দুপুর ১টায় দেশে ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৩২৪ মেগাওয়াট। তখন চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি ছিল দুই হাজার ২৬ মেগাওয়াট। পরে বিকেলে উৎপাদন বাড়ানো হলে লোডশেডিং কিছুটা কমে আসে। বিকেল ৫টার দিকে ১৪ হাজার ১৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন করা হয় ১৩ হাজার ১৪৮ মেগাওয়াট। তখন লোডশেডিং ছিল এক হাজার ৩২ মেগাওয়াটের মতো।

বিপিডিবির তথ্য বলছে, আগামী মাসে বিদ্যুতের চাহিদা উঠতে পারে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে। পর্যাপ্ত জ্বালানির ব্যবস্থা করা না গেলে এই বাড়তি চাহিদার সময় ব্যাপকভাবে লোডশেডিং হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশঙ্কা করছেন।

জানা গেছে, দেশের মোট ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬৬টি কেন্দ্র গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ঘাটতির কারণে উৎপাদন সংকটে রয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের এসএস পাওয়ারের এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র থেকে মাত্র ৬১২ মেগাওয়াট এবং কক্সবাজারের মাতারবাড়ীর এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্র থেকে ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছে। বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে পাঁচ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে চার হাজার ২৮২ মেগাওয়াট এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে দুই হাজার ৫৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে।

তবে পিডিবির গ্রীষ্মকালীন পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে পাঁচ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে পাঁচ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে তিন হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল।

জানা গেছে, গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। কারখানাগুলো নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না। এতে ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে হালকা ও মাঝারি শিল্প খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।

পিডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা ব্যাহত হওয়ায় ঘাটতি দেখা দিলেও এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট চালু হয়েছে। পাশাপাশি এসএস পাওয়ার প্লান্টের একটি ইউনিটও পূর্ণ সক্ষমতায় (ফুল লোডে) উৎপাদনে যাচ্ছে, বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় তাদের উৎপাদন সর্বোচ্চ থাকে। এসব মিলিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। ফলে দুপুরের পর থেকে লোডশেডিং পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

তিনি বলেন, হঠাৎ করে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে এবং এসএস পাওয়ার প্লান্টে কয়লা সরবরাহে সামান্য বিলম্ব হচ্ছে। সব মিলিয়ে আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন আরো বাড়বে এবং পরিস্থিতির আরো উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জানা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান জ্বালানি গ্যাস ও কয়লার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানির মজুদও ফুরিয়ে আসছে। ফলে দেশে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানির অভাবে তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

বর্তমানে সরকারি হিসাবে বিদ্যুতের ঘাটতি দুই হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমছে। ব্যয়বহুল হওয়ায় তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। জ্বালানি সরবরাহে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল অঙ্কের বকেয়া, ভর্তুকির ঘাটতি, জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের শর্তসব মিলিয়ে দেশের বিদ্যুৎখাত এখন গভীর আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। ফলে সামনে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া ৪৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। সাত-আট মাস ধরে বিল পরিশোধ না হওয়ায় এসব কেন্দ্রের উদ্যোক্তারা চরম সংকটে পড়েছেন। একই সঙ্গে আমদানি করা বিদ্যুতের বিলও বকেয়া পড়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসানাত জানান, ‘জ্বালানি তেলের সংকটে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে গেছে। আমাদের প্রায় পাঁচ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে মাত্র প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে। পর্যাপ্ত তেল থাকলে বেসরকারি খাত থেকে আরো অতিরিক্ত দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট সরবরাহ সম্ভব ছিল। তেলসংকটের কারণে উৎপাদনে রেশনিং করা হচ্ছে এবং মোট সক্ষমতার মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে, যা শিগগিরই ২০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে লোডশেডিং আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া বিল ও ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় তেল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, আর আমদানি করতেও প্রায় ৪০ দিন সময় লাগে। ফলে দ্রæত সংকট কাটানো সম্ভব নয়। গ্যাস ও কয়লার সরবরাহও কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হচ্ছে। মে মাসে সংকট তীব্র আকার নিতে পারে, যখন বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছতে পারে এবং বড় ধরনের ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়ছে কৃষি খাতে। বিদ্যুৎচালিত সেচব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বোরো ধানের চাষ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় সেচের অভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে ফসলের জমি। মাছের হ্যাচারিগুলোতেও বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন কমে গেছে। কৃষকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকায় সময়মতো পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, ফলে ধানের ফলন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
সূত্র জানায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় শহর থেকে গ্রাম সবখানেই দিন-রাত মিলিয়ে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এতে জনজীবন যেমন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, তেমনি ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্প উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বরিশাল নগরী ও আশপাশের এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে, পরের ঘণ্টা নেই -এমন অনিয়মিত সরবরাহে ব্যবসা-বাণিজ্য, পানি সরবরাহ ও মোবাইল নেটওয়ার্কে বড় ধরনের ভোগান্তি দেখা দিয়েছে।

খোজ নিয়ে জানা গেছে উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। সেখানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে ময়মনসিংহে। নগর ও গ্রামে পালাক্রমে লোডশেডিং চলছে। কোথাও কোথাও চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া সিলেট ও চট্রগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলায় চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং। একইভাবে নেত্রকোনা, মেহেরপুর ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরেও চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।

খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলায় প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। জ্বালানিসংকটের কারণে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে দিন-রাত লোডশেডিং বেড়ে গেছে এবং জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। ঢাকার ধামরাইয়ে এবং নারায়ণগঞ্জের বন্দর, সোনারগাও উপজেলায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের পর দেড় ঘণ্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে, যা শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

এদিকে বিভিন্ন উপজেলায় বিদ্যুতের চাহিদার অর্ধেকেরও কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। এতে ভেঙে পড়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা। দিনরাত মিলে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ না থাকায় বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও মুমূর্ষু রোগীদের ভোগান্তির শেষ নেই। বিদ্যুৎ চলে গেলেই পুরো হাসপাতাল অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে এবং সৃষ্টি হচ্ছে প্রচন্ড গুমোট গরমের। এমন পরিস্থিতিতে রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। আড়াইজারের হাইজাদী ইউনিয়নের এক নারী জানান, তাঁর মায়ের হঠাৎ পেটে ব্যথা ও জ্বর দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের কারণে হাতপাখা দিয়েই বাতাস করে মাকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।

বর্তমানে পিক আওয়ারে (সন্ধ্যা) বিদ্যুতের চাহিদা পৌঁছাচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াটে।

তবে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন না থাকায় প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যার ফলে বাড়ছে লোডশেডিং।

এ পরিস্থিতিতে শহরাঞ্চলে লোডশেডিং তুলনামূলক কম হলেও মফস্বল এলাকাগুলোয় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিচ্ছে। বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোথাও কোথাও দিনে ৭-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। তীব্র গরমের মধ্যে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।

দেশে চলতি মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এ চাহিদা পূরণে গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন প্রয়োজন। কিন্তু এসব জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

পল্লী বিদ্যুতের সংশ্লিষ্ট, কর্মকর্তারা লোডশেডিংয়ের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাদের মতে, বিভিন্ন এলাকায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের বরাদ্দ না পাওয়ায় বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। গত কয়েকদিন লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার কারণ মূলত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সংকট এবং কিছু কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম। যদিও এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুনরায় উৎপাদনে ফিরেছে। ফলে পরিস্থিতি আগের চেয়ে কিছুটা স্বাভাবিক পর্যায়ে আসার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহরুল ইসলাম বলেন, ‘লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার কারণ মূলত কয়লাভিত্তিক দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট (মেশিন) রক্ষণাবেক্ষণে ছিল। এর মধ্যে আদানির একটি ও রামপালের দুটি। বর্তমানে তিনটি ইউনিটই উৎপাদনে এসেছে। তবে এসএস পাওয়ার ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা সংকট রয়েছে। এর বাইরে যুদ্ধের কারণে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোয় পর্যাপ্ত জ্বালানির সংস্থান নেই। পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোও উৎপাদন সংকটে রয়েছে। এসব কারণ মূলত বিদ্যুতের সংকট। তবে পরিস্থিতি আগামী দুই-একদিনের মধ্যে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করছি।’

দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি অব্যাহত থাকায় লোডশেডিং পরিস্থিতি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদার প্রাক্কলন ছিল ১৪ হাজার মেগাওয়াট। আর সন্ধ্যায় পিক আওয়ারে সাড়ে ১৫ হাজার মেগাওয়াট। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত ১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১২ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে ১২ হাজার ৪৬২ মেগাওয়াট উৎপাদন হয়। চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি থাকায় ৪১৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। আর গতকাল সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত ঘণ্টাভিত্তিক বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধানে সর্বনিন্ম ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করা হয়েছে।

এ সময় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে, যা সামগ্রিক সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়। ওইদিন ঘণ্টাপ্রতি বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধানে সর্বনিন্ম সাড়ে ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করা হয়েছিল।

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, রক্ষণাবেক্ষণে থাকা কয়লাভিত্তিক তিন ইউনিট পুনরায় উৎপাদনে ফিরেছে। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় আদানি পাওয়ার থেকে ১ হাজার ৪৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে। অন্যদিকে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদনের বিপরীতে প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট গ্রিডে যোগ হওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এদিকে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এসএস পাওয়ার প্লান্ট এবং কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কয়লা সংকটে পড়েছে। যদিও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়লাবাহী একটি জাহাজ এরই মধ্যে পৌঁছেছে এবং খুব শিগগিরই বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে।

ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোও দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি সংকটে রয়েছে। সরকারের কাছে কেন্দ্রগুলোর প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া। কয়েক দফা সংবাদ সম্মেলন করে বকেয়া পরিশোধের দাবিও জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তারা বলে আসছেন, অর্থ সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারছেন না, ফলে উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

Manual1 Ad Code

এ বিষয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ) সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানান, বকেয়ার কারণে মালিকরা ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে পারেননি। বর্তমান মজুদ জ্বালানি দিয়ে রেশনিংয়ের মাধ্যমে আগামী মে মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন চালিয়ে নেয়া হবে।

এই সঙ্কটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরকারকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কয়লা ও তেলের বকেয়া বিল পরিশোধ করে কেন্দ্রগুলো সচল করা উচিত। ডলার সঙ্কটের দোহাই দিয়ে উৎপাদন সীমিত রাখা কোনো সমাধান নয়। একই সাথে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে আরো জোর দিতে হবে। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে বিদ্যুতের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি। অন্তত সেচ ও উৎপাদনশীল খাতের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। খেয়াল রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি যেন দুর্বিষহ হয়ে না পড়ে।

সারা দেশে বিদ্যুতের ভোগান্তি বেড়েছে। বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থদের ভোগান্তির শেষ নেই। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষুদ্রশিল্প, বাণিজ্য। সহযোগী একটি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীতে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও গ্রামের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিভীষিকাময়। বিভিন্ন জনপদে দিন-রাত মিলিয়ে আট থেকে ১২ ঘণ্টা, এমনকি কোনো কোনো এলাকায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এক দিকে তাপদাহ, অন্য দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন অন্ধকার- এই দুই যন্ত্রণায় গ্রামের মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। বিদ্যুতের আসা-যাওয়ার খেলায় কৃষি ও ক্ষুদ্রশিল্পকেও ঠেলে দিয়েছে অনিশ্চয়তায়।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, বর্তমানে লোডশেডিং দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। জ্বালানি সঙ্কট, বিশেষ করে গ্যাস ও কয়লা স্বল্পতার কারণে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে কাক্সিক্ষত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। কয়লা সঙ্কটে মাতারবাড়ী ও এসএস পাওয়ারের মতো বড় কেন্দ্রগুলো থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম আসছে এবং রামপাল কেন্দ্রের কারিগরি ক্রুটি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। তবে আপত্তিকর বিষয়টি হলো- লোড ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য। সরকারের নীতি অনুযায়ী, শহর অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে পরিকল্পিতভাবে গ্রামকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। পিরোজপুর, নাটোর, কুড়িগ্রাম কিংবা ময়মনসিংহের গ্রামাঞ্চলে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ দেয়া হচ্ছে। এর মানে-আমাদের উন্নয়ন দর্শনে গ্রাম এখনো অবহেলিত। এটি সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।

বিদ্যুতের এই ভয়াবহ সঙ্কটের প্রভাব বহুমুখী। লোডশেডিংয়ের কারণে গভীর নলক‚পগুলো সচল রাখা যাচ্ছে না, এতে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। ময়মনসিংহের মাছচাষিদের মাছের পোনা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, পোলট্রি খামারে মুরগি মারা যাচ্ছে। ক্ষুদ্রশিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ মালিকদের শ্রমিকের মজুরি গুনতে হচ্ছে ঠিকই। এর বাইরে প্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সার বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সময়মতো কাজ জমা দিতে না পেরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বিদ্যুতের অভাবে অনেক জায়গায় পানি সঙ্কটও তীব্র হচ্ছে। শিক্ষা ও সাধারণ জনজীবনের ক্ষতি কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। আইপিএস বা জেনারেটর চালিয়ে যে সঙ্কট সামাল দেয়া হবে, সেই সুযোগও জ্বালানি তেল ও গ্যাসের অভাবে সীমিত হয়ে পড়েছে।

Manual6 Ad Code

এই সঙ্কটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরকারকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কয়লা ও তেলের বকেয়া বিল পরিশোধ করে কেন্দ্রগুলো সচল করা উচিত। ডলার সঙ্কটের দোহাই দিয়ে উৎপাদন সীমিত রাখা কোনো সমাধান নয়। একই সাথে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে আরো জোর দিতে হবে। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ হিসেবে বিদ্যুতের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি। অন্তত সেচ ও উৎপাদনশীল খাতের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। খেয়াল রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের জন্য পরিস্থিতি যেন দুর্বিষহ হয়ে না পড়ে।

শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও গ্রামে ব্যাপক হারে লোডশেডিং হচ্ছে। গ্রীষ্মের দাবদাহ বাড়ার সঙ্গে দেশে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন রাতের বেলায় ১৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

গত সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদার প্রাক্কলনে তা ১৫ হাজার ৯০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এরই মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনে ঘাটতি থাকায় এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বর্তমানে জ্বালানি তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। তবে সামনে দাবদাহ বাড়লে পিক ডিমান্ড মেটাতে তেলভিত্তিক কেন্দ্র সচল রাখতে জ্বালানি মজুদ বাড়ানোর প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা। বর্তমানে যে হারে জ্বালানি তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নেয়া হচ্ছে, তাতে চলতি মাসের ১৫-২০ তারিখের মধ্যে মজুদ সংকটে পড়তে পারে বেশির ভাগ কেন্দ্র। যদিও বেসরকারি উদ্যোক্তারা বলছেন, মে পর্যন্ত ফার্নেস অয়েল কেন্দ্রগুলো চালিয়ে নেয়ার জন্য তারা রেশনিংয়ের পরিকল্পনা করছেন।

বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়া ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ বকেয়া পেতে তারা বিগত সরকারের সময় থেকে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ পাননি। বেসরকারি মালিকেরা নিজ উদ্যোগে জ্বালানি তেল আমদানি করে কেন্দ্র চালিয়েছেন। তবে সেই পরিস্থিতিও এখন আর নেই বলে জানান তারা। পাইপলাইনে কোনো ফার্নেস অয়েল আমদানির এলসিও নেই বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে সরকার দ্রæত অর্থ ছাড়লেও দেশে ফার্নেস অয়েল আসতে মে মাসের মাঝামাঝি সময় ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ওপর ফার্নেস অয়েলের দাম বিশ্ববাজারে ৭০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো প্রকট হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বলেন, ‘তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিপিডিবির চাহিদা অনুযায়ী এখনো বিদ্যুৎ সরবরাহ দিয়ে যাচ্ছি। তবে যে হারে উৎপাদন হচ্ছে, তাতে এ পরিস্থিতি সামনে হয়তো আর থাকবে না। যে পরিমাণ ফার্নেস অয়েল মজুদ রয়েছে, তা এ ১৫-২০ এপ্রিলের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। ফলে তেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন রেশনিং করে আগামী মে পর্যন্ত চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি। সেক্ষেত্রে হয়তো ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমাতে হবে। আমরা চেষ্টা করব পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপিডিবিকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেয়ার।’

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে আরেকজন আইপিপি উদ্যোক্তা বলেন, ‘বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে আমরা বিপিডিবিকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। তবে কয়েক মাস ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে না পারায় অনেক কেন্দ্র মজুদ সংকটে পড়েছে। বর্তমান ফার্নেস অয়েলের দাম চিন্তা করলে আমদানি করতে হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন। এর বাইরে এলসি সেটলমেন্ট জটিলতা রয়েছেই। এ পরিস্থিতির মধ্যে আমরা সরকারের বিদ্যুৎ চাহিদায় উৎপাদন করে যাচ্ছি।’

বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, গত সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদার প্রাক্কলন ছিল ১৫ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট, আর দিনের বেলায় তা ছিল ১০ হাজার ৪৬০ মেগাওয়াট। তবে ঘণ্টাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, দিবাগত রাত ১টায় সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট, বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ৬৭৪ মেগাওয়াট। এতে অন্তত ১ হাজার ৭৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। গতকাল বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ চাহিদা ও উৎপাদনে অন্তত ৬৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং ছিল।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ এপ্রিল বিদ্যুতের মেক্সিমাম জেনারেশন ছিল ১৪ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট। ওই দিন জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ২ হাজার ৯৬৯ মেগাওয়াট। বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়েও ওইদিন সর্বোচ্চ ১ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনে ঘাটতি হওয়ায় লোডশেডিং করে সামাল দিতে হচ্ছে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে। তবে শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও গ্রামে ব্যাপক হারে লোডশেডিং হচ্ছে। দিনের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। প্রতি ঘণ্টায় কয়েকবার করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কথা জানান বেশ কয়েকটি জেলার বিদ্যুতের গ্রাহকেরা।

দেশে গ্যাস, কয়লা, জ্বালানি তেল, আমদানি ও নবায়নযোগ্য উৎস মিলিয়ে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। চলতি বছরে সর্বোচ্চ চাহিদার প্রাক্কলন ১৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানির সংস্থান না থাকায় কয়লা, গ্যাস ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রের সক্ষমতার বড় অংশই বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। তবে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে বড় সংকট তৈরি হয়েছে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ঘাটতিতে। বিদ্যমান সক্ষমতার মধ্যে অর্ধেকের কিছু বেশি চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে, বাকি অংশ কয়লার অভাব ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ রয়েছে।

Manual1 Ad Code

ভারতের ঝাড়খন্ডের গড্ডায় নির্মিত আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন সাড়ে ৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এর মধ্যে এপ্রিলে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ৭ হাজার ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করতে চায় পিডিবি। তবে কয়লার সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে। এর মধ্যে আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার মধ্যে একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কেন্দ্রটি থেকে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিপিডিবির শীর্ষ এক কর্মকর্ত বলেন, ‘বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়তে শুরু করেছে। সব ধরনের কেন্দ্র ব্যবহার করে চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা চলছে। তবু কিছুটা লোডশেডিং হচ্ছে। এটার প্রধান কারণ মূলত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন কম হওয়া।’

আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকায়, শিল্প খাতের মালিকরা পূর্ববর্তী দুই-তিন বছরের মতো ২০২৫ সালেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ক্রমেই জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সংকট প্রকট হচ্ছে। আমদানিনির্ভরতা বাড়ায় ব্যাহত হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা। পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না থাকায়, শিল্প খাতের মালিকরা পূর্ববর্তী দুই-তিন বছরের মতো ২০২৫ সালেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আবার ভর্তুকির চাপ সামলানো সরকারের জন্য অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও প্রতি বছরের শুরুতে এবং বাজেট ঘোষণার আগে জ্বালানি রূপান্তরে, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে এবং খরচ কমাতে নানা উদ্যোগের কথা আলোচনায় আসে, গতানুগতিকের বাইরে খুব বেশি পরিবর্তন চোখে পড়ে না। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রণোদনার পরিবর্তে আমদানি শুল্ক, জ্বালানি রূপান্তরকে বাধাগ্রস্ত করছে। সংকট উত্তরণে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করেই জ্বালানি রূপান্তরের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

জানুয়ারি এলেই আশঙ্কা তৈরি হয় গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ থাকবে কিনা। প্রতি বছরই সরকার প্রথমে পর্যাপ্ত ডলার ছাড়ে উদ্যোগ নেয়, যাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির বকেয়া শোধ করে কোনোভাবে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি সামাল দেয়া যায়। তথাপি পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ অনেকাংশেই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আবার যেহেতু দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে, প্রতি বছর বাজেট-পূর্ববর্তী সময়ে গ্যাস উত্তোলনে বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন অংশীজন জোরেশোরে দাবি তোলেন। কিন্তু বাজেটে তার প্রতিফলন খুব একটা হয় না। ফলে খরুচে এলএনজিতে নির্ভরশীলতা বেড়েছে, যা সরকারকে বাধ্য করেছে শিল্প খাতে জ্বালানির মূল্য বাড়াতে।

জ্বালানি খাতে প্রত্যাশিত নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা তৈরিতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেয়া হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা একটি মারাত্মক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে গত দেড় বছরে নতুন কোনো ইউটিলিটি-স্কেল নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প পাইপলাইনে সংযুক্ত হয়নি বলা চলে। তবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ যেখানে দ্রæততার সঙ্গে জ্বালানি রূপান্তরে ভূমিকা রাখতে পারত, সেখানেও অস্বাভাবিক রকমের ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের অনেকেই বহুদিন ধরে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের যন্ত্রাংশে আমদানি শুল্ক মওকুফ করতে দাবি জানিয়ে আসছেন। বাস্তবতা হলো, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ও ইনভার্টার আমদানি করতে এখনো ২৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ শুল্ক প্রদান করতে হয়। রফতানিমুখী শিল্প-কারখানা ১ শতাংশ শুল্ক দিয়ে এ ধরনের প্রকল্পে যন্ত্রাংশ আমদানি করতে পারলেও অন্যান্য শিল্প-কারখানা কিংবা ভবন এ ধরনের সুবিধা পায় না। বাড়তি এ খরচ খাতটিতে যথেষ্ট প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

আবার জ্বালানি সাশ্রয়ী এলইডি বাতির যন্ত্রাংশ এবং ইনভার্টার যুক্ত ক¤েপ্রসরের ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক, জ্বালানি দক্ষ বাতি ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

একটি উপযুক্ত রূপান্তরের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সফল না হওয়ায় মাত্রাতিরিক্তভাবে আমদানিনির্ভরতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ঝুঁকি বেড়েছে। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ খাতে আমদানিনির্ভরতা ৪০-৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একইভাবে ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রাথমিক জ্বালানির (বাণিজ্যিক) আমদানি প্রায় ৪৫ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে ৫৭ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজারে সামান্য অস্থিরতা দেখা দিলে তার প্রভাব বিভিন্ন খাতের ওপর পড়ে। শুধু এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায় জানুয়ারি ২০২৩ থেকে এপ্রিল ২০২৫ পর্যন্ত শিল্পে গ্যাসের মূল্য ২৩৪-২৭১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে হয়েছে। আর ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্য বেড়েছে প্রায় ১৬২ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্যাসের মূল্য প্রতি ঘনমিটার ১৪ টাকা ৭৫ পয়সা হওয়ায় আগামী দিনে যে এর মূল্য সমন্বয় করা হবে—এমনটি ধারণা করা যায়। এর প্রভাব গিয়ে পড়বে বিদ্যুৎ খাতে। মূল্য সমন্বয় না করা হলে বিদ্যুৎ খাতের রাজস্ব ঘাটতি বাড়বে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে পর্যাপ্ত জ্বালানি আমদানি করতে আমাদের কোনো সমস্যা হবে না—এমন অনুমান বেশ কয়েক বছর আগেই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতের যে ভর্তুকি ছিল ৭ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা তা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকায়। তার পরও গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আর্থিক লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। লক্ষণীয় এ সময়ে বেশ কয়েকবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও রাজস্ব ঘাটতি আরো দ্রæত বেড়েছে। কাজেই শুধু মূল্য সমন্বয় আমাদের সমাধান দেবে না। বরং জ্বালানি রূপান্তরে দিতে হবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। দেশের বিভিন্ন খাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারের প্যাটার্ন বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবায়নযোগ্য টেকসই ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ-জ্বালানির পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

এ রূপান্তরে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন—নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে গ্রিডের আধুনিকায়ন, গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর শিল্প খাতের নির্ভরশীলতা বাড়ানো, খরুচে এলএনজিতে নির্ভরশীলতা নিয়ন্ত্রণে নিজস্ব গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণে লস কমাতে হবে। সর্বোপরি জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যেতে হবে। যদিও আইইইএফএর গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে, এখনো জ্বালানি সাশ্রয়ের অনেক সুযোগ রয়ে গেছে। মনে রাখা প্রয়োজন, যে দেশগুলো শূন্য কার্বন নির্গমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তারা সবাই জ্বালানি দক্ষতায় বেশ গুরুত্ব দিয়েছে।

জ্বালানি রূপান্তরে পরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে তা বাস্তবায়নে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দূর করতে হবে। শুধু বিদ্যুৎ খাতে যখন ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভর্তুকি ও লোকসানসহ ৫৫ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে, তখন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ থেকে বার্ষিক অল্প কয়েক কোটি টাকা আমদানি শুল্ক নেয়া খুব বেশি লাভজনক নয়। বরং শুল্ক অব্যাহতি দিয়ে দ্রুত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা গেলে জ্বালানি তেল আমদানির খরচ কমানো যাবে। উদাহরণস্বরূপ এক মেগাওয়াট সক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত আমদানি শুল্কের চেয়ে বার্ষিক সাশ্রয়কৃত জ্বালানি তেলের আর্থিক মূল্য বেশি। লক্ষণীয় হলো সরকার আমদানি শুল্ক একবার পেলেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ জ্বালানি তেল সাশ্রয় করবে ২০-২৫ বছর। তেমনি জ্বালানি দক্ষ যন্ত্রপাতি থেকে জ্বালানি সাশ্রয়ের সুবিধা তাদের জীবদ্দশাজুড়েই পাওয়া যাবে। কাজেই জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে হলে জ্বালানি দক্ষ যন্ত্রপাতিতে জ্বালানি অদক্ষ যন্ত্রপাতির তুলনায় আমদানি শুল্ক কমানো উচিত। একইভাবে গ্রিড আধুনিকায়নে এবং এলএনজি আমদানি কমাতে নিজস্ব গ্যাস উৎপাদনে সরকারি বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সরকার আগ্রহী হলে আগামী বাজেটে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারে। পাশাপাশি স¤প্রতি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাছাইকৃত সৌরবিদ্যুতের যে প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেয়া হলো, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কিছুটা আস্থা ফিরে আসতে পারে।

সময় এখন প্রমাণভিত্তিক এবং প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক এমন একটি জ্বালানি রূপান্তরের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়ার। এক্ষেত্রে স্থানীয় বিশেষজ্ঞ এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনা প্রয়োজন। তবে এ রূপান্তরে সময়ক্ষেপণ করলে আগামী বছরগুলোয় ব্যয়বহুল জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে আরো বেশি ভোগাবে।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, পাঠানপাড়া (খানবাড়ি), কদমতলী, সদর-সিলেট।

 

 

Manual6 Ad Code

 

 

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code