Main Menu

কুরবানী: আত্মশুদ্ধি, মানবিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের মহাশিক্ষা

Manual8 Ad Code

কবি আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু: “কুরবানী শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; কুরবানী হলো মানুষের অন্তরের হিংসা, অহংকার, প্রতিহিংসা, জুলুম, লোভ ও অমানবিকতাকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কুরবানী করার এক মহান শিক্ষা।”

পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জীবনে এমন এক মহিমান্বিত বার্তা নিয়ে আসে, যা কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র জীবনের নৈতিকতা, মানবিকতা, সহমর্মিতা ও ন্যায়বোধকে জাগ্রত করে। কুরবানী আমাদের শেখায় আত্মত্যাগ, আত্মশুদ্ধি, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো এবং শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের মহান শিক্ষা।

আজকের পৃথিবীতে মানুষ উন্নত হয়েছে প্রযুক্তিতে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে মানবিকতায়। সমাজে বাড়ছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সামাজিক বিভেদ, ক্ষমতার অহংকার, দুর্নীতি, হিংসা, জুলুম, নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও মাদকাসক্তির মতো ভয়াবহ অপরাধ। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, সম্মান ও শান্তি আজ নানা সংকটে বিপর্যস্ত। কেউ নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য ক্ষমতা ও প্রভাবের অপব্যবহার করছে, কেউ দুর্বল মানুষের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, কেউ মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নিরপরাধ মানুষকে সামাজিকভাবে হেয় করছে। অথচ ইসলাম কখনো অরাজকতা, সহিংসতা ও অন্যায়কে সমর্থন করে না; ইসলাম মানুষকে শান্তি, ন্যায় ও মানবতার পথে চলতে শেখায়।

হযরত ইবরাহিম (আ.) ও হযরত ইসমাইল (আ.)-এর কুরবানীর ঘটনা মানবজাতির জন্য আত্মত্যাগ, ধৈর্য, আনুগত্য ও সত্যের পথে অবিচল থাকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এই শিক্ষা আমাদের বলে-মানুষ যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়, তবে তাকে নিজের ভেতরের পশুত্ব, লোভ, অহংকার ও অন্যায় প্রবৃত্তিকে কুরবানী করতে হবে।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন- “আল্লাহর কাছে পৌঁছে না কুরবানীর গোশত বা রক্ত; পৌঁছে শুধু তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা হজ্জ: ৩৭)

এই তাকওয়াই মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে। একজন প্রকৃত ঈমানদার মানুষ কখনো খুন, জুলুম, চুরি, ডাকাতি, প্রতারণা কিংবা দুর্নীতিকে আশ্রয় দিতে পারে না। কারণ সে জানে-মানুষের প্রতি অন্যায় করা আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত কাজগুলোর একটি।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন-“যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল; আর যে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।” (সূরা মায়িদা: ৩২)

Manual7 Ad Code

এই আয়াত মানবজীবনের মর্যাদা ও পবিত্রতার এক অসাধারণ ঘোষণা। ইসলাম মানুষের জীবন, সম্মান ও সম্পদের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাই খুন, সন্ত্রাস, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি কিংবা ধর্ষণের মতো অপরাধ শুধু সামাজিক অপরাধ নয়; এটি আল্লাহর বিধানেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

আজ সমাজে আমরা এমন এক বাস্তবতা দেখছি, যেখানে অনেক মানুষ নিজের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাব ব্যবহার করে অন্যকে নির্যাতন করছে। রাজনৈতিক মতভেদ কিংবা সামাজিক বিরোধ অনেক সময় প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষে রূপ নিচ্ছে। কেউ মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে, কেউ অপবাদ ছড়িয়ে চরিত্রহনন করছে, কেউ দুর্বল মানুষের সম্পদ দখল করছে। অথচ ইসলাম কখনো জুলুমকে সমর্থন করে না।

মহান আল্লাহ বলেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।” (সূরা আলে ইমরান: ৫৭)

ইসলাম শুধু অন্যায় থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয় না; বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোরও শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ কুরআনে বলেন- “তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সত্য সাক্ষ্য দাও।” (সূরা নিসা: ১৩৫)

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন- “তোমাদের কেউ যদি অন্যায় কাজ হতে দেখে, তবে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে; যদি তা না পারে তবে মুখ দিয়ে প্রতিবাদ করে; আর তাও না পারলে অন্তরে ঘৃণা করে। আর এটাই ঈমানের দুর্বলতম স্তর।” (সহিহ মুসলিম)

এই হাদিস আমাদের শেখায়-অন্যায় দেখে নীরব থাকা মুমিনের কাজ নয়। তবে প্রতিবাদ হতে হবে শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক। ইসলাম কখনো প্রতিহিংসা, অরাজকতা বা ঘৃণার রাজনীতিকে সমর্থন করে না। কারণ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরেকটি অন্যায় সৃষ্টি করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

Manual5 Ad Code

মহানবী (সা.) তাঁর জীবনের মাধ্যমে ক্ষমা, সহমর্মিতা ও মানবতার সর্বোচ্চ উদাহরণ স্থাপন করেছেন। তায়েফের মানুষ তাঁকে রক্তাক্ত করেছিল, কিন্তু তিনি তাদের জন্য অভিশাপ নয়, হেদায়েত কামনা করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। এটাই ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য-ক্ষমা, ন্যায়, সহমর্মিতা ও মানবতার সৌন্দর্য।

আজ কুরবানীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত- নিজের ভেতরের অহংকার কুরবানী করা, হিংসা ও প্রতিহিংসা কুরবানী করা, লোভ ও স্বার্থপরতা কুরবানী করা, মিথ্যা অপবাদ ও জুলুম থেকে বিরত থাকা, খুন, সন্ত্রাস, চুরি, ছিনতাই ও অন্যায় থেকে সমাজকে রক্ষা করা, এবং অন্যায়, অত্যাচার, জুলুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলা।

যদি আমরা নিজেদের ভেতরের ঘৃণাকে কুরবানী করতে পারি, তবে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। যদি ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করতে পারি, তবে মানুষের নিরাপত্তা ফিরবে। যদি দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখি, তবে মানবতা জাগ্রত হবে। আর যদি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সাহসী অবস্থান নিতে পারি, তবে অন্যায় ও অত্যাচার দুর্বল হয়ে পড়বে।

একটি সুন্দর সমাজ কখনো জুলুম, ঘৃণা, সহিংসতা বা প্রতিহিংসার ওপর দাঁড়াতে পারে না। একটি সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে ন্যায়বিচার, ভালোবাসা, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতার ভিত্তিতে। তাই কুরবানীর শিক্ষা শুধু একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সারা জীবনের জন্য একটি নৈতিক ও মানবিক দর্শন।

Manual1 Ad Code

আসুন, এই কুরবানীর ঈদে আমরা অন্যায়, জুলুম, মিথ্যা অপবাদ, খুন, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, ছিনতাই ও মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে তীব্র নৈতিক প্রতিবাদ গড়ে তুলি। আমরা এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করি, যেখানে ক্ষমতার অহংকার নয়-মানবতা হবে সবচেয়ে বড় পরিচয়; প্রতিহিংসা নয়-ন্যায়বিচার হবে সবচেয়ে বড় শক্তি; আর ঘৃণা নয়-ভালোবাসা ও সহমর্মিতাই হবে মানুষের প্রকৃত ভাষা।

কারণ একটি জাতির প্রকৃত শক্তি অস্ত্রে নয়, মানবিকতায়; ক্ষমতায় নয়, ন্যায়বিচারে; প্রতিহিংসায় নয়, ক্ষমা ও ভালোবাসায়।

Manual1 Ad Code

কুরবানী হোক আত্মার পরিশুদ্ধির দীপ্ত শপথ,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের সাহসী উচ্চারণ,
মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার সেতুবন্ধন,
এবং শান্তি, ন্যায় ও মানবিকতায় আলোকিত
একটি সুন্দর, নিরাপদ ও কল্যাণময় বাংলাদেশের অনন্ত প্রত্যয়।

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code