Main Menu

ফ্যামিলি কার্ড: সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড

Manual7 Ad Code

মো. মেহেদী হাসান শুভ: বর্তমান সরকারের অন্যতম যুগান্তকারী সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হলো “ফ্যামিলি কার্ড”। এটি মূলত সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের একটি অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি যা এখন আংশিক বাস্তবায়িত। ফ্যামিলি কার্ড বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির একটি ঐতিহাসিক সনদ হিসেবে বিবেচিত, যা প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করবে। এই কার্ডের মাধ্যমে একটি পরিবার প্রতি মাসে ২৫০০ টাকা নগদ সহায়তা ও নিত্যপণ্যের বিশেষ সুবিধা পাবে। সুবিধাভোগীদের মোবাইল ওয়ালেটে/ব্যাংক হিসাবে জিটুপি (গভর্নমেন্ট টু পার্সন) মাধ্যমে প্রতি মাসের নগদ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কার্ডের মালিক পরিবারের মা বা নারী প্রধান।

Manual2 Ad Code

হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মায়েরা এই সুবিধা পাচ্ছেন। একটি কার্ডের মাধ্যমেই পুরো পরিবারের খাদ্য ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। সরকার মনে করছে, একটি পরিবারকে কার্ডের আওতায় আনা হলে সেই পরিবারের সকল সদস্যের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার কাজও হবে। ফ্যামিলি কার্ড মূলত দেশের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করবে।

Manual1 Ad Code

তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীদের হাতে এই সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। একটি পরিবারের একজন সদস্যই পাচ্ছেন এই কার্ড। এই কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদী রূপকল্প হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’-এ রূপান্তর করা। এই কর্মসূচির মূল দর্শন হলো ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন ২০২৬ প্রণয়ন করেছে। একটি ফ্যামিলি কার্ডে প্রতি পরিবারে পাঁচজন সদস্য বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। একান্নবর্তী পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি হলে প্রতি পাঁচজনের জন্য পৃথক কার্ডের ব্যবস্থা থাকবে। প্রাথমিকভাবে সবচেয়ে হতদরিদ্র পরিবার, নিম্ন আয়ের মানুষ, উপার্জনে অক্ষম সদস্য রয়েছে এমন পরিবার, নারী প্রধান পরিবার, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা, স্বামী পরিত্যক্তা ও অসচ্ছল নারী প্রধান পরিবার, অটিজম আক্রান্ত সদস্য রয়েছে এমন পরিবার, গৃহহীন, হিজড়া, বেদে, ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর পরিবার, দিনমজুর এবং ভূমিহীন পরিবার অগ্রাধিকার পাবে। এছাড়া টিসিবির স্বল্প আয়ের পরিবার ভিত্তিক কার্ডধারী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালিত ভালনারেভল উইমেন কর্মসূচির উপকারভোগী, খাদ্য মন্ত্রণালয় পরিচালিত খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত পরিবারকেও সমন্বয়ের মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে। অর্থাৎ যিনি বর্তমানে যে কর্মসূচি থেকে সুবিধা নিচ্ছেন তা থেকে বের হয়ে শুধু ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধাই নিবেন। ফ্যামিলি কার্ডের আর্থিক সহায়তা বর্তমানে প্রচলিত সব সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। তবে বিদ্যমান কার্ড ও অন্যান্য ভাতা কর্মসূচি আগের মতোই চলমান থাকবে। নতুন ফ্যামিলি কার্ড হবে সর্বজনীন, যা দেশের প্রায় ৪ কোটি পরিবারের কাছে পর্যায়ক্রমে পৌঁছে দেওয়া হবে।

টিসিবি কার্ডকে ফ্যামিলি কার্ডের ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিম্মি’ এ স্থানান্তর করা হবে। সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ভবিষ্যতে একই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে এপিআই স্থাপন কিংবা ওটিপি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সহায়তা এবং শিক্ষা উপবৃত্তি ও কৃষি ভর্তুকির মতো সুবিধাগুলোও প্রদান করতে পারবে।

এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো আনুষঙ্গিক খরচ বহন করবে, তবে ডাটা সংরক্ষণের মূল দায়িত্ব পালন করবে সমাজসেবা অধিদপ্তর। ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটকে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার একটি লক্ষ্যমাত্রা এই গাইডলাইনে নির্ধারণ করা হয়েছে। সুবিধাভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ স্কোরিং ব্যবহার করা হবে। পাইলটিং পর্যায়ে ০-১০০০ স্কোরের মধ্যে ১ম, ২য় ও ৩য় কোয়ান্টাইলের অন্তর্ভুক্ত অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করে দারিদ্র্যের এ ধাপ পুনঃনির্ধারণ করা যাবে। গ্রামীণ এলাকায় বসতভিটাসহ আবাদি জমির পরিমাণ ০.৫০ একর বা তার কম এবং পরিবারের মাসিক আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে এই যোগ্যতা নির্ধারিত হবে।

সরকার আগামী ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে দেশের ৫০ শতাংশের বেশি যোগ্য পরিবারকে এই প্রকল্পের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্পের আওতায় ১৪টি উপজেলা থেকে একটি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডকে বাছাই করা হয়েছে এবং সেই ওয়ার্ডে যতজন এই কার্ড পাওয়ার উপযুক্ত তাদের সবাইকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। পাইলটিং কর্মসূচিতে প্রথম পর্যায়ে ১৪ টি ইউনিটে ১০ হাজার পরিবারকে এ কার্ড দেওয়া হয়েছে। পরে প্রতি ধাপে ১০ হাজার করে বৃদ্ধি করে চলতি বছরের জুনের মধ্যে বিভিন্ন ইউনিটে ৪০ হাজার পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতাভুক্ত করা হবে। এজন্য মাঠপর্যায় থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আগামী তিন মাসে পাইলটিং কাজ শেষ হবে। এরপর প্রতিটি উপজেলা এর আওতায় আসবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ মার্চ রাজধানীর কড়াইল বস্তি এলাকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন। উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে সুবিধাভোগীদের মোবাইল ওয়ালেটে/ব্যাংক হিসাবে প্রথম মাসের নগদ সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাইলটিং প্রকল্পের আওতায় ফ্যামিলি কার্ডের জন্য নির্বাচিত হয়েছে বনানীর কড়াইল বস্তি, পাংশা, পতেঙ্গা, বাঞ্ছারামপুর, লামা, খালিশপুর, চরফ্যাশন, দিরাই, ভৈরব, বগুড়া সদর, লালপুর, ঠাকুরগাঁও ও নবাবগঞ্জ।

Manual6 Ad Code

পাইলট প্রকল্প শেষে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা কাউন্সিলর কার্যালয় থেকে সরাসরি আবেদন ফরম সংগ্রহ করা যাবে। এ ছাড়া ঘরে বসে দ্রুত আবেদনের জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল চালুর প্রস্তুতিও নিচ্ছে সরকার। আবেদনের জন্য জাতীয় পরিচয় পত্র, ছবি ও একটি সচল মোবাইল নম্বর প্রয়োজন হবে। উপকারভোগী নির্বাচনে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য ব্যবহার করা হলেও আর্থিক তথ্য না থাকায় নির্বাচিত ওয়ার্ডগুলোতে সরেজমিন যাচাই-বাছাই করে সুবিধাভোগী নির্ধারণ করা হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নেতৃত্বে উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হবে। প্রতি পরিবারে শুধু একটি কার্ড ইস্যু করা হবে, যার মাধ্যমে মাসিক নগদ টাকা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়া যাবে। ফ্যামিলি কার্ড মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি, খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র বিমোচন, মৌলিক চাহিদা পূরণ ও স্বনির্ভরতা অর্জনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।

লেখক: আলোকচিত্রগ্রাহক, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, পিআইডি, সিলেট।

Manual2 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code