সমুদ্রপথ অবরোধ : যতো কথা
মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: ইতিহাসের ধুলো জমা পাতা উল্টালে দেখা যায়, যুদ্ধ মানেই কেবল বারুদ আর অস্ত্রের গর্জন নয়। অনেক সময় একটি দেশের মেরুদন্ড ভেঙে দেয়ার জন্য কোনো কামানের গোলার প্রয়োজন হয় না। শুধু তার সমুদ্রপথ আটকে দেয়াই যথেষ্ট। গ্রিসের সে প্রাচীন নগররাষ্ট্র থেকে শুরু করে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত সবখানেই সমুদ্র অবরোধ বা ‘বøকেড’ ছিল যুদ্ধের অন্যতম মোক্ষম অস্ত্র।
স¤প্রতি হরমুজ প্রণালিতে ইরানকে ঘিরে যে উত্তজনা তৈরি হয়েছে, তা আমাদের সে শত বছরের পুরনো ইতিহাসের কথাই মনে করিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক ক‚টনীতিবিদরা একে বলছেন এক ধরনের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’, যার লক্ষ্য হলো শক্রুকে অনাহারে রেখে বা তার কোষাগার শূন্য করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা।
সমুদ্রপথে বাণিজ্যের ওপর বিশ্বের নির্ভরতা বহু পুরনো। তাই প্রতিপক্ষের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়া মানে তার অর্থনীতির শ্বাসরোধ করা। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের সমুদ্রপথ আটকে দেয়া সরাসরি যুদ্ধের শামিল। কিন্তু মজার ব্যাপার বিশ্বরাজনীতির মারপ্যাঁচে দেশগুলো একে সরাসরি ‘অবরোধ’ না বলে কখনো ‘নিষেধাজ্ঞা’, কখনো ‘এমবারগো’ আবার কখনো ‘কোয়ারেন্টাইন’ বা ‘সঙ্গনিরোধ’ বলে আখ্যায়িত করে। যেমন ১৯৬২ সালে কিউবা ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি যখন সোভিয়েত জাহাজ আটকাতে চাইলেন, তিনি তখন একে ‘আ স্ট্রিক্ট কোয়ারেন্টাইন’ বা ‘কঠোর সঙ্গনিরোধ’ হিসেবে নামকরণ করেছিলেন। বর্তমানে লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষকরা হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিকে ‘ডাবল ব্লকেড’ বা ‘দ্বিমুখী অবরোধ’ হিসেবে দেখছেন।
সমুদ্রপথ আটকে দিয়ে যুদ্ধ জয়ের কৌশল আজ থেকে হাজার বছর আগেও কার্যকর ছিল। প্রাচীন গ্রিসের স্পার্টা যখন এথেন্সের শস্য আমদানির পথ বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন শক্তিশালী এথেন্সও মাথা নত করতে বাধ্য হয়। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়নের দম্ভ চূর্ণ করার পেছনেও ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কঠোর অবরোধের বড় ভূমিকা ছিল। নেপোলিয়ন নিজেও কম যাননি। তিনি ইউরোপের বাজারে ব্রিটিশ পণ্য ঢোকা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন, যাতে ব্রিটেন ব্যবসায়িকভাবে পঙ্গু হয়ে যায়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময়ও উত্তর ও দক্ষিণ উভয় পক্ষই একে অন্যের বাণিজ্যপথ বন্ধ করতে জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্লকেডের ধরন কিছুটা বদলে যায়। তখন জার্মানি ও ব্রিটেন একে অন্যের কেবল বাণিজ্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের পেটের ভাত অর্থাৎ খাদ্য সরবরাহ বন্ধের নেশায় মেতে ওঠে। জার্মানি তার সাবমেরিন দিয়ে ব্রিটেনের খাদ্যবাহী জাহাজ ডোবাতে থাকে। পাল্টা জবাবে ব্রিটেনও জার্মানিকে এমনভাবে কোণঠাসা করে যে খোদ জার্মানি ক্ষুধার্ত হওয়ার উপক্রম হয়। মজার বিষয় জার্মানি কৃষিকাজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সত্তে¡ও কেন অনাহারে পড়ল? এর কারণ ছিল মানুষের চেয়েও বেশি ঘোড়া ও কৃষককে ফসলের মাঠ থেকে ধরে রণক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছিল। এ ভারসাম্যহীনতার সুযোগটাই নিয়েছিল ব্রিটিশ অবরোধ।
আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের সমুদ্রপথে তেল আমদানি বন্ধ করে দেয়। জাপান যে সম্পদসমৃদ্ধ এশীয় অঞ্চল দখল করতে চেয়েছিল, তার অন্যতম কারণই ছিল এ জ্বালানি সংকট। অর্থাৎ নৌ-অবরোধ কখনো কখনো যুদ্ধের কারণও হয়ে উঠেছে।
আমাদের নিজেদের ইতিহাসেও এমন অবরোধের বড় প্রভাব রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ভারত যখন পাকিস্তানের সমুদ্রবন্দরগুলো অবরোধ করে ফেলে, তখন পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল পুরোপুরি ভেঙে যায়। রসদ ও সৈন্য আসার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের বিজয় ত্বরান্বিত হয়। আবার ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র যখন হাইফং বন্দরে মাইন পেতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়, তখনই উত্তর ভিয়েতনাম শান্তি আলোচনায় বসতে নমনীয় হয়েছিল।
ইতিহাসের এ উদাহরণগুলোই প্রমাণ করে সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, যুদ্ধের শেষ হাসি সাধারণত সে রাষ্ট্রই হাসে।
বর্তমান বিশ্বে ব্লকেড বা অবরোধের সংজ্ঞা অনেকটাই বদলে গেছে। তবে বর্তমানের সবচেয়ে বড় ‘অবরোধ’ অস্ত্রটি হলো ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থা থেকে কাউকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া। তাই যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরান, উত্তর কোরিয়া বা রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন তারা কার্যত আধুনিক এক ধরনের অদৃশ্য অবরোধের শিকার হয়।
২০১৭ সালে কাতার যখন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসরের রোষানলে পড়েছিল, তখন তারা জল, স্থল ও আকাশপথ-তিনদিক থেকেই অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। আবার ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের বর্তমান নিয়ন্ত্রণও সে পুরনো পেশিশক্তিরই বহিঃপ্রকাশ।
বর্তমানে এ ‘ব্লকেড’ কৌশল আবারো আলোচনায় এসেছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পদক্ষেপে সেখানে কার্যত ‘দ্বৈত অবরোধ’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ইরান জাহাজে হামলা চালিয়ে পথ অচল করতে চাইছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনৈতিক প্রবাহ থামাতে উদ্যোগী।
অবরোধ যেমন শক্রুকে দুর্বল করে, তেমনি এর নেতিবাচক ঝুঁকিও ব্যাপক। হরমুজ প্রণালিতে যদি ইরানের তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তবে তার প্রভাব চীন ও ভারতের মতো এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলোয় পড়বে। সেক্ষেত্রে চীন সরাসরি এ উত্তেজনায় জড়িয়ে পড়তে পারে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। ঠিক যেমন মার্কিন গৃহযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের তুলা আমদানিতে টান পড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গ্রাহাম অ্যালিসন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ক‚টনীতি এড়িয়ে অবরোধ বা বøকেডকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে, তবে চীনও তাইওয়ানের ক্ষেত্রে একই কৌশল প্রয়োগ করতে পারে।
সব মিলিয়ে সমুদ্রপথ অবরোধ এক পুরনো কৌশল হলেও আজও তার কার্যকারিতা অক্ষুণ্ন। এটি কখনো যুদ্ধ জিতিয়েছে, কখনো বিশ্ব অর্থনীতিকে কাঁপিয়েছে, আবার কখনোবা নতুন সংঘাতেরও জন্ম দিয়েছে। ইতিহাস বলছে, নৌ-অবরোধ শুধু সমুদ্রের পানিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি থামিয়ে দিতে পারে একটি দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, এমনকি বৈশ্বিক ভারসাম্যও। তাই সমুদ্রের জলরেখায় যে অবরোধ তৈরি হয়, তার ঢেউ আছড়ে পড়বে সারা বিশ্বেই।
যুদ্ধকৌশলের মধ্যে ‘নৌ-অবরোধ’ বেশ কার্যকর। ঐতিহাসিকভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তথাকথিত ‘স্টারভেশন বøকেড’ স্মরণ করা যায়। তবে নৌ-অবরোধ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না।
কয়েকটি জনপ্রিয় অবরোধ নিয়ে ইতিহাস, যুদ্ধ ইতিহাসে আলাপ হলেও অনেক নৌ-অবরোধ খুব কম প্রচার-প্রচারণা পেয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে এগুলো অকার্যকর ছিল; বরং সামরিক কৌশল হিসেবে নৌ-অবরোধ বারবার প্রমাণ করেছে এটি প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করার অন্যতম কার্যকর উপায়। ইতিহাসের এমন কিছু অবরোধ নিয়ে গবেষকরা সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৌ-প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছেন। বর্তমান লেখাটিতে এসবের কিছু বিষয়ে আলোকপাত করা হবে।
যুদ্ধ ও অযুদ্ধকালীন সংঘাতে নৌ-অবরোধ গ্রহণ এবং পরিচালনা করা হয়। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ কিছু নৌ-অবরোধ পুনর্বিবেচনা করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, নৌ-অবরোধ সাধারণত সমুদ্রশক্তি দ্বারা স্থলশক্তির বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। যেমন প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটেনের অবরোধ প্রচেষ্টা। তবে এমন ঘটনাও ঘটেছে যখন কোনো মহাদেশীয় দেশ একটি দ্বীপরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেছে, যেমন ১৮০৩-১৫ সালের মধ্যে নেপোলিয়নের ইউরোপের সঙ্গে ব্রিটেনের বাণিজ্য বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টা, অথবা ১৯৯৬ সালে চীনের তাইওয়ানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ।
দ্বিতীয়ত, অবরোধ দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ হতে পারে, বিশেষ করে যখন অবরুদ্ধ দেশ-বিশেষত স্থলশক্তি-তার সমুদ্রপথের যোগাযোগ (ঝখঙঈং) থেকে সরে গিয়ে স্থলপথের নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা (খঙঈং) তৈরি করতে পারে। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে ইতিবাচকভাবে এবং পঞ্চাশের দশকে চীনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদীদের অবরোধে নেতিবাচকভাবে দেখা গেছে দ্রুততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ যত বেশি সময় একটি স্থলশক্তি নতুন যোগাযোগ ও বাণিজ্য পথ তৈরি করতে পারে, অবরোধ তত কম কার্যকর হয়।
তৃতীয়ত, প্রযুক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ছিল কাঠের জাহাজ। সে সময়ই জাহাজ তৈরি হয় নতুন করে। কাঠ থেকে আসে তামা-আবৃত জাহাজ। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কয়লা থেকে তেলচালিত ইঞ্জিনে পরিবর্তন হয়। এরপর আসে বিমান ও সাবমেরিন। অবরোধকে এগুলো আরো কার্যকর করেছে। সামরিক কর্মকান্ডের অন্য কোনো ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এত দ্রæত ও স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হয় না। উদাহরণ হিসেবে স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর নির্ভরযোগ্য কয়লা সরবরাহ, কিংবা নব্বইয়ের দশকে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন জাহাজের মাধ্যমে ইরাকে তেল পাচার বন্ধ করার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক আইন ও নৌ-অবরোধের সম্পর্ক। ভল্ফ এইচ ভন হাইনেগ দেখিয়েছেন অবরোধের আইনি অর্থ নিয়ে বিভ্রান্তি সাধারণ বিষয়। জটিল আন্তর্জাতিক আইন থাকায় অনেক দেশ অবরোধকে সরাসরি ‘অবরোধ’ বলতে চায় না। যুদ্ধ ঘোষণা না করলে তারা অনেক বিধিনিষেধ এড়াতে পারে। সংঘাতকে ‘আন্তর্জাতিক যুদ্ধ’ না বলে ‘গৃহযুদ্ধ’ বলা বা অবরোধকে ‘কোয়ারেন্টাইন’, ‘এমবার্গো’ বা ‘নিষেধাজ্ঞা’ বলা এসবই আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে।
যদিও আইনি সংজ্ঞাগুলো বিষয়টিকে গন্ডবিদ্ধ করার চেষ্টা করে, বাস্তবে নৌ-অবরোধের আওতায় পড়া কার্যক্রমের পরিসর অত্যন্ত বিস্তৃত। সাধারণভাবে নৌ-অবরোধ বলতে শত্রুর উপক‚লের সামনে জাহাজের সারি কল্পনা করা হয়, যেখানে অবরোধ ভেঙে প্রবেশের চেষ্টা চলে। তবে নৌ-অবরোধ এর চেয়ে ভিন্নও হতে পারে। অবরোধ সবসময় নির্দিষ্ট বন্দর বা উপক‚লকে লক্ষ্য করে হয় না। এমনকি সমুদ্রেই হতে হবে এমনো নয়। তবে মূল উদ্দেশ্য সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যাহত করা বা কোনো রাষ্ট্রের সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীলতার জায়গায় ব্যাঘাত ঘটানো।
আলোচনা শুরু করা যাক একটি অ-নৌ-অবরোধের বিখ্যাত উদাহরণ দিয়ে-গ্রেট ব্রিটেনের বিরুদ্ধে নেপোলিয়নের ‘কন্টিনেন্টাল’ অবরোধ। ১৮০৫ সালে ট্রাফালগারের নৌযুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয়ের পর সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ ইংল্যান্ডের হাতে চলে যায়। ১৮০৬ সারে শুরু হয় অবরোধ। ১৮১৫ সালে নেপোলিয়নের পতন পর্যন্ত চলতে থাকে। এর লক্ষ্য ছিল ইউরোপে ব্রিটিশ পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করা। তবে সিলভিয়া মারজাগাল্লি দেখিয়েছেন যে লোভী কাস্টমস কর্মকর্তা, মরিয়া চোরাচালানকারী ও ব্রিটিশ পণ্য কিনতে আগ্রহী ব্যবসায়ীদের কারণে এ অবরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।
এরপর ১৮১২ সালের যুদ্ধে আমেরিকার উপক‚লে ব্রিটিশ নৌ-অবরোধের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে ওয়েড ডাডলি দেখিয়েছেন এ অবরোধ খুব কার্যকর ছিল না। বরং যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষে আগের তুলনায় বড় বাণিজ্যিক নৌবহর ও বেশি রফতানি নিয়ে বের হয়। ব্রিটিশদের দুর্বল বাধা দেয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র নতুন জাহাজ নির্মাণের সুযোগ পায়, যা পরে একটি আধুনিক নৌবাহিনীর ভিত্তি গড়ে তোলে।
ক্রিমিয়ার যুদ্ধে অবরোধও ছিল একটি নৌ-অভিযান, তবে এটি পরিচালিত হয়েছিল দুটি ভিন্ন অঞ্চলে-বাল্টিক ও কৃষ্ণ সাগরে। অ্যান্ড্রæ ডি ল্যাম্বার্ট দেখিয়েছেন এটি তুলনামূলকভাবে স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধ ছিল এবং অবরোধকারী পক্ষগুলোর লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা। এছাড়া রাষ্ট্রের সম্পদ ক্ষয় করা এবং জারকে শান্তি আলোচনায় বাধ্য করাও এর উদ্দেশ্য ছিল।
প্রথমবারের মতো বাষ্পশক্তি ব্রিটিশ ও ফরাসি যুদ্ধজাহাজকে এমন গতি প্রদান করেছিল, ফলে তারা কার্যকরভাবে একটি শক্ত অবরোধ বজায় রাখতে সক্ষম হয়। একই সঙ্গে আরো শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্র নৌবহরকে সুরক্ষিত বন্দর আক্রমণ ও ধ্বংস করার ক্ষমতা দেয়। শেষ পর্যন্ত ১৮৫৬ সালের প্যারিস ঘোষণায় নতুন আন্তর্জাতিক আইন সংহত হয়। এটি সীমিত যুদ্ধের সময় নৌ-অবরোধ নিয়ন্ত্রণে পরবর্তী ৬০ বছর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ক্রিমিয়ার সংক্ষিপ্ত ও সীমিত যুদ্ধের কয়েক বছরের মধ্যেই দীর্ঘস্থায়ী আমেরিকান গৃহযুদ্ধ নৌ-অবরোধের ভিন্ন ব্যবহার দেখায়। ডেভিড জি সুরডাম দেখিয়েছেন, দক্ষিণের বিরুদ্ধে ইউনিয়নের অবরোধ তুলা রফতানি কমিয়ে দেয়, কনফেডারেসির ক্রয়ক্ষমতা দুর্বল করে এবং দক্ষিণী রাজ্যগুলোর প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম যেমন রেলপথ নির্মাণে ব্রিটিশ লোহা বিশেষ করে যুদ্ধজাহাজ আমদানি করার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। যেহেতু গৃহযুদ্ধ ছিল একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ এবং এর লক্ষ্য ছিল সম্পূর্ণ বিজয়, তাই ইউনিয়নের এ অবরোধ পদ্ধতি অনেক দিক থেকে দুই বিশ্বযুদ্ধের অবরোধ কৌশলের পূর্বাভাস দেয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে জাপান ও চীন উভয়ই তাদের সামরিক বাহিনী আধুনিকায়ন ও উন্নত নৌসরঞ্জাম অর্জন করে। তবে জাপান একই সঙ্গে রাজনৈতিক, আইনি, অর্থনৈতিক ও শিক্ষা ব্যবস্থাও পশ্চিমা ধাঁচে সংস্কার করে। কিন্তু চীন তা করেনি। এ সংস্কারের ফল ১৮৯৪-৯৫ সালের সিনো–জাপান যুদ্ধে প্রকাশ পায়। সে সময় জাপান পূর্ব এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়ে চীনকে সরিয়ে আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। একটি শক্ত নৌ-অবরোধ এবং সফল স্থল অভিযান চীনের বেইইয়াং নৌবহরকে ওয়েইহাইওয়েই বন্দরে আটকে ফেলে। ফলে নতুন সামুদ্রিক শক্তির ভারসাম্য স্থায়ী হয়ে যায়।
তিন বছর পর স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধে আমেরিকান নৌ ও স্থলবাহিনী সান্তিয়াগো দে কিউবার কাছে অ্যাডমিরাল সেরভেরার স্প্যানিশ নৌবহরকে ঘিরে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত পরাজিত করে। মার্ক এল হেইসের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি মূলত ছিল সরবরাহ ব্যবস্থার যুদ্ধ। কারণ যে নৌবহরের জ্বালানি সরবরাহ বেশি নির্ভরযোগ্য এবং উন্নতমানের কয়লা ছিল, তারাই সমুদ্রে আধিপত্য বিস্তার করতে পেরেছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির বিরুদ্ধে ব্রিটিশ অবরোধ ছিল একটি অঘোষিত অর্থনৈতিক অবরোধ, যা ‘স্টারভেশন বøকেড’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এ অবরোধের প্রভাব জার্মানিতে পড়তে অনেক বছর সময় লাগে এবং ১৯১৬ সালের শেষ ও ১৯১৭ সালের শুরুতে খাদ্যের দামে প্রভাব স্পষ্ট হয়। এ বিলম্বের সময় সার্বিয়া, রোমানিয়া ও রাশিয়া হয় পরাজিত হয়, নয়তো ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে। তবু যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ের সঙ্গে মিলিত হয়ে এ অবরোধ জার্মানির পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৩৭ সালে চীনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের মাধ্যমে জাপানের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। কেন-ইচি আরাকাওয়া তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, চীনের উপক‚লে জাপানের ‘শান্তিপূর্ণ’ অবরোধ নিরপেক্ষ বাণিজ্য থামাতে ব্যর্থ হয়। জাতীয়তাবাদীরা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে স্থলপথে বাণিজ্য এবং হ্যানয় ও বার্মা রুট ব্যবহার করে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়। পরবর্তী সময়ে জাপানের এ পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা অবরোধ হিসেবে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপে প্ররোচিত করে। এ পদক্ষেপ যুদ্ধকে আরো বিস্তৃত করে। ১৯৪৫ সালের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যায় জাপানের চীনের বিরুদ্ধে অবরোধের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের জাপানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক নৌ-অবরোধই বেশি কার্যকর ছিল।
ইউরোপে এ সময় ব্রিটেনকে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ বজায় রাখতে হয়। জিওফ্রি টিলের মতে, নিরপেক্ষ দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এ কাজকে কঠিন করে তোলে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবরোধ শক্তিশালী হয় এবং ১৯৪০ সালের জুলাইয়ে নেভিসার্ট ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে প্রবেশ করার পর জার্মান অবরোধ ভঙ্গকারীদের আটক করা সহজ হয় এবং ১৯৪৩ সালে জার্মানির সমুদ্রপথে আমদানির ৬০ শতাংশের বেশি আটক করা হয়। যদিও এককভাবে এর অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন, তবে মিত্রবাহিনীর বোমাবর্ষণ ও যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ের সঙ্গে মিলিত হয়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
চার বছর পরে চীনে জাতীয়তাবাদীরা দীর্ঘ উপক‚লজুড়ে অবরোধ আরোপ করে একই ধরনের প্রভাব সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। মূলত তাইওয়ান ভিত্তিক জাতীয়তাবাদীরা উপক‚লবর্তী দ্বীপগুলো ব্যবহার করে সমুদ্র ও পরে আকাশপথে টহল দিয়ে অবরোধ চালায়। কিন্তু ব্যাপক দুর্নীতি ও চোরাচালানের কারণে এ অবরোধ সীমিত সফলতা পায়। তবে এটি কমিউনিস্টদের সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে বাধ্য করে।
শীতল যুদ্ধের প্রথম ‘উত্তপ্ত’ সংঘর্ষ ছিল কোরিয়া যুদ্ধ। এটি ছিল একটি সীমিত পরিসরের যুদ্ধ। লড়াই হয়েছিল দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে। রাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন নৌ ও আকাশ অবরোধ খুব বেশি সফল হয়নি। ওনসান শহর ধ্বংস হলেও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ চলাচল বন্ধ করা যায়নি। শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার সরল পরিবহন ব্যবস্থা ও বিপুল সস্তা শ্রমশক্তি এ অবরোধকে অকার্যকর করে তোলে।
কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কোয়ারেন্টাইন’ অভিযান তুলনামূলকভাবে বেশি সফল হয়। কারণ এটি সোভিয়েত ইউনিয়নকে পিছিয়ে যেতে এবং অতিরিক্ত ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে বাধ্য করে। তবে জেফ্রি জি বার্লো দেখিয়েছেন, মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তিশালী উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আসল কারণ ছিল কিউবায় সম্ভাব্য মার্কিন স্থল আক্রমণের ভয়, যা সোভিয়েত নেতৃত্বকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধে কার্যত দুটি মার্কিন অবরোধ ছিল-১৯৬৫ সালে দক্ষিণে অনুপ্রবেশকারী নৌযানের বিরুদ্ধে এবং ১৯৭২ সালে উত্তর ভিয়েতনামের প্রধান বন্দরগুলোয় মাইন পাতা। উভয় ক্ষেত্রেই সাফল্য এসেছিল। স্পেন্সার সি টাকার দেখিয়েছেন, প্রথমটিতে ৫০টির বেশি জাহাজ ধ্বংস করা হয় এবং দ্বিতীয়টিতে হাইফং বন্দরের মাধ্যমে বিদেশী আমদানি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তবু কম্বোডিয়া ও হো চি মিন ট্রেইলের মাধ্যমে সরবরাহ চলতে থাকে এবং চীনের স্থলপথ উত্তর ভিয়েতনামকে সহায়তা দেয়। রাজনৈতিকভাবে এটি ১৯৭৩ সালের প্যারিস শান্তি চুক্তিতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু দুই বছরের মধ্যে দক্ষিণ ভিয়েতনাম পরাজিত হয়।
১৯৬৬-৭৫ সাল পর্যন্ত রোডেশিয়ার বিরুদ্ধে ব্রিটেনের অবরোধ ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের নৌ ও মাইন অবরোধের থেকে ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।
রিচার্ড এ মোবলি একটি আলোচনা তুলেছেন। মোজাম্বিকের বেইরা বন্দরের মাধ্যমে তেল প্রবাহ বন্ধ করা দ্রুতই লন্ডনের জন্য জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে ওঠে, যা দক্ষিণ রোডেশিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী সরকারের (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) বিরুদ্ধে আরোপিত ছিল। তবে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের কারণে হোয়াইটহল শিগগিরই বুঝতে পারে এত দৃশ্যমান এ অবরোধ বন্ধ করলে ঠিক উল্টো বার্তা যাবে। ফলে তারা কার্যত নিজেদেরই জাতিসংঘে উপস্থাপিত নিরাপত্তা পরিষদের ২২১ নম্বর প্রস্তাবের কঠোর ভাষার কাছে বন্দি হয়ে পড়ে। অবরোধ বন্ধ করা সম্ভব নয় মনে করে ব্রিটেন, ফলে ক্রমে অকার্যকর হয়ে ওঠা বেইরা অবরোধটি প্রায় ১০ বছর ধরে চলতে থাকে এবং এর আনুমানিক ব্যয় দাঁড়ায় ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড। ব্রিটিশদের এ অভিজ্ঞতা ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কাজে লেগেছিল।
অবরোধ ও নৌ-অবরোধের এমন বহু দৃষ্টান্তই আলোচনায় আনা যায়। আর সেই সবকিছুর নিরিখে একটি সফল নৌ-অবরোধকে এমন একটি সামরিক অভিযান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়, যা সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে নির্দিষ্ট সময় ও স্থানের মধ্যে শত্রুর সক্ষমতা কমিয়ে দেয় বা একেবারেই অক্ষম করে ফেলে। অতিরিক্ত সম্পদ ব্যবহার করলে অবরোধ শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু অন্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য উপেক্ষিত হতে পারে। আবার উপরিভাগে দুর্বল মনে হলেও যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান শত্রুর হাতে পৌঁছতে বাধা দেয়া যায়, তবে সেটিও অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, পাঠানপাড়া (খানবাড়ি), কদমতলী, সদর-সিলেট।
Related News
সমুদ্রপথ অবরোধ : যতো কথা
Manual4 Ad Code মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: ইতিহাসের ধুলো জমা পাতা উল্টালে দেখা যায়, যুদ্ধRead More
শ্রমিকের অধিকার প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
Manual6 Ad Code মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: পহেলা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বা শ্রমিক অধিকারRead More



Comments are Closed