সিলেটে বৃৃষ্টি নেই, তবু বাড়ছে কুশিয়ারার পানি, দূর্ভোগে লাখো মানুষ
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: এক সপ্তাহ ধরে সিলেটে চলমান বন্যা পরিস্থিতি একদিকে উন্নতি ঘটলেও অন্যদিকে অবনতি ঘটছে। সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানি কিছুটা কমেছে। নগরীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত সুরমা নদীর পানি কমলেও কুশিয়ারা সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বাড়ছে পানি।
সিলেট ও সুনামগঞ্জবাসী এবার দেখেছে বন্যার ভয়াল রূপ। যা বিগত একশ বছরেও হয়নি বলে মনা করা হচ্ছে। গত ১৫ জুন থেকে একে একে প্লাবিত হয়েছে গ্রামীণ জনপদ, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও নগর। ভারত থেকে প্রবাহিত নদনদীর প্রবাহ ও মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি ও সিলেটে অতি ভারী বৃষ্টির কারণে এ অঞ্চলে বন্যার ভয়াল রূপ। বন্যায় ৫০ লাখ মানুষ পানিবন্দী ছিলেন। এক হাজারের বেশি আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়াও যে যেখানে সম্ভব আশ্রয় নিয়েছে। বহু মানুষ পানিতে ভেসে গেছে। এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ৪৮ জনের প্রাণহানির হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
গত চারদিন ধরে ধীরে পানি কমতে শুরু করেছে। সুরমা নদীর পানি কমলেও এখনও বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, গত ৩দিন বৃৃষ্টি না হলেও কুশিয়ারা অববাহিকতায় পানি বাড়ছে। শুক্রবার সকালে এ নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। কুশিয়ারার পানি বাড়ায় জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গােলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, ওসমানীনগর, বিশ্বনাথ, দক্ষিণ সুরমা, মৌলভীবাজারের বড়লেখা, কুলাউড়া, রাজনগর, জুড়ি, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরসহ নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
সুরমা নদীর পানি কমতে থাকায় সিলেট-সুনামগঞ্জ ও সিলেট-ভােলাগঞ্জ মহাসড়ক থেকে পানি নেমেছে। শুরু হয়েছে যান চলাচল। কিন্তু, সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে যান চলাচল। কিছু উপজেলার সড়কেও পানি কমেছে।
এদিকে, বৃহস্পতিবার (২৩ জুন) বিকেলে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বন্যাকবলিত পাড়া-মহল্লাগুলোর বেশিরভাগ এলাকায় পানি কমেছে। তবে এখনো বাসাবাড়িতে ময়লা ও কালো পানি জমে আছে। তাই স্থানীয়রা এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
অপরদিকে নগরীর মির্জাজাঙ্গাল, মণিপুরি রাজবাড়ি, তালতলা, ঘাসিটুলা, শাহজালাল উপশহর, তেররতন, সোবহানীঘাট, ছড়ার পাড়, মেন্দিবাগ, মাছিমপুরসহ বেশ কিছু এলাকায় পানি কমলেও এখনো পানি পুরোপুরি কমেনি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোয় বিশুদ্ধ খাবার পানি, শুকনো খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়া সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়া ত্রাণসামগ্রী বিভিন্ন ওয়ার্ডে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডের জনপ্রতিনিধিরাই সেগুলো সমন্বয় করে বণ্টন করছেন।
এদিকে টানা কয়েকদিন ভারী বর্ষণের পর গত বুধবার সকাল থেকে শুক্রবার সকাল ১১টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়নি সিলেটে। তবুও কুশিয়ারার তীরবর্তী গোলাপগঞ্জে পানি ক্রমাগত বাড়িছে। সুরমা নদীর পানি তুলনামূলকভাবে কমলেও ক্রমেই বাড়ছে কুশিয়ারা নদীর পানি। এতে করে প্লাবিত হচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের নতুন নতুন বিভিন্ন এলাকা। এছাড়াও পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে গ্রামীণ বিভিন্ন রাস্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক প্লাবিত হয়েছে।
জানা যায়, সুরমা তীরবর্তী উপজেলার বাঘা ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এ ইউনিয়নের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সুরমার পানি কিছুটা কমলেও ক্রমেই দুর্ভোগ বাড়ছে এসব এলাকার মানুষের। উপজেলার সদর ইউনিয়ন, ফুলবাড়ি, আমুড়া ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা ইতিমধ্যে প্লাবিত হয়েছে। কুশিয়ারার পানি বাড়ায় নতুন করে প্লাবিত হয়েছে উপজেলার ভাদেশ্বর, ঢাকাদক্ষিণ, লক্ষনাবন্দ, লক্ষ্মিপাশা, প্রত্যন্ত অঞ্চল শরীফগঞ্জ, বাদেপাশা ও বুধবারীবাজার ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা। এতে দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন প্রায় লক্ষাধিক মানুষ।
এদিকে তথ্য অনুসারে, উপজেলায় এখন পর্যন্ত ৫০টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এরমধ্যে ৪৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে বানবাসি মানুষকে আশ্রয় প্রদান করা হয়েছে। গোলাপগঞ্জ পৌরসভা ও ১১ ইউনিয়নের ৫৪৬টি পরিবার এসব আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় গ্রহণ করছেন। এরমধ্যে আড়াই হাজারের অধিক বানবাসি মানুষ রয়েছেন। উল্লেখযোগ্য, পৌর এলাকার হাজী জছির আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪৭টি পরিবারের ৪১০জন বানবাসি আশ্রয় নিয়েছেন। এছাড়াও পৌর এলাকার সরকারি এমসি একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজে ৫৩টি পরিবারের ১৫০জন ও হাকালুকি হাওর তীরবর্তী শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের কালিকৃষ্ণপুর এস.ই.এস জিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে ৩৫টি পরিবারের ১৪০জন রয়েছেন।
এগুলোর মধ্যে কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্র কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধিতে প্লাবিত হয়ে পড়ায় লোকজনকে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত প্রায় শতাধিক ঘরে নতুন করে পানি ঢুকে পড়ায় লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
ইতিমধ্যে এসব আশ্রয়কেন্দ্রসহ ১১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় ক্রমান্বয়ে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। গত সোমবার থেকে স্থানীয় সাংসদ ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি নির্বাচনী এলাকায় পর্যায়ক্রমে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করছেন। এছাড়াও স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকেও বানবাসিদের মধ্যে শুকনো খাবার, খাদ্য সামগ্রী প্রদান করা হচ্ছে।
পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার ১৮০টি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৭৮টিতে পাঠদান বন্ধ রয়েছে বলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দেওয়ান নাজমুল আবেদীন জানিয়েছেন। এতে করে ব্যহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম।
অন্যদিকে, উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক প্লাবিত হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের গোলাপগঞ্জ অংশের বিভিন্ন, গোলাপগঞ্জ-ভাদেশ্বর সড়কের নালীউরি এলাকা, ঢাকাদক্ষিণ পাহাড় লাইন সড়কের লক্ষিপাশা এলাকায় বিভিন্ন জায়গা রাস্তা প্লাবিত হয়েছে। কোন কোন জায়গায় যান চলাচল বন্দ রয়েছে। এতে মানুষ ব্যাপক দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন।
গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. গোলাম কবির জানান, আমরা সার্বক্ষণিক উপজেলার প্লাবিত এলাকার খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। এসব এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে হচ্ছে।
Related News
জৈন্তাপুরে সারী-গোয়াইন এফসিডিআই পানি ব্যবস্থাপনা এসোসিয়েশনের নির্বাচন সম্পন্ন
Manual4 Ad Code জৈন্তাপুর প্রতিনিধি: সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সারী-গোয়াইন এফসিডিআই পানি ব্যবস্থাপনা এসোসিয়েশন ত্রি-বার্ষিক নির্বাচন-২০২৬Read More
সিলেট সীমান্তে ৮৪ লাখ টাকার ভারতীয় চোরাই পণ্য জব্দ
Manual2 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেট সীমান্তে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় চোরাচালানী মালামালRead More



Comments are Closed