Main Menu

১৬ লাখ টাকা রাজস্বের জন্যে ১৩৪ কোটি টাকার ক্ষতি!

Manual1 Ad Code

বিশ্বনাথ প্রতিনিধি: বালু উত্তোলনের জন্য সিলেট সদর ও বিশ্বনাথ উপজেলার মধ্যবর্তী স্থানে সুরমা নদীর ‘তিলকপুর-শিবেরখলা বালু মহাল’ বরাদ্দ দেয় জেলা প্রশাসন। প্রতিবছর ১৬ লাখ টাকা করে ইজারা দিয়ে গত পাঁচ বছরে এই বালু মহাল থেকে সরকারের আয় হয়েছে ৮০ লাখ টাকা। তবে ইজারা নেওয়ার পর ইজারাদাররা নির্ধারিত সীমানার বাইরে থেকেও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন শুরু করে। এতে নদীর দুই তীরে দেখা দিয়েছে তীব্র ভাঙ্গন। ভাঙ্গনে ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। নদী ভাঙ্গন ঠেকাতে সরকার দুই ধাপে বরাদ্দ দিয়েছে প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অবাধে ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলেই নদীতে তীব্র ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এতে নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে নদী তীরবর্তী জনপদ, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। ফলে বালু উত্তোলনের জন্য নদী ইজারা দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

ইজারা নিয়ে এই নদী থেকে গত দু’বছর ধরে ড্রেজিং মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করছেন এডভোকেট নাসিম আহমদ নামের এক ব্যক্তি। সিলেট নগরীর সুবিদবাজারের বাসিন্দা নাসিম তার বড়ভাই মশউদ আহমদের লাইসেন্স দিয়ে জেলা প্রশাসকের নিকট থেকে ইজারা নিয়েছেন। এর আগে আরও তিন বছর বালু উত্তোলন করেছেন নুরুল হুদা নামের অন্য এক ব্যবসায়ী।

এদিকে অবাধে বালু উত্তোলনের কারণে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বিশ্বনাথের পরগনা বাজারের কিছু এলাকা, বাজারের মসজিদ, ২টি মাজার, লামাকাজি-গোবিন্দগঞ্জ সড়ক, লামাকাজি-পরগণাবাজার-আকিলপুর সড়কসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এছাড়া বিশ্বনাথের লামাকাজি ইউনিয়নের মহাতাবপুর, রাজাপুর, আকিলপুর, কলিম উল্লাহপুর, সুবলপুর, রসুলপুর, হাজারীগাঁও, তিলকপুরসহ প্রায় ১৫টি গ্রামের বাসিন্দাদের ঘর-বাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

এই এলাকার নদী ভাঙন রোধে ২০১৮ সালে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের থেকে ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এতেও কাজ না হওয়ায় চলতি বছরের অক্টোবর মাসে একনেকের সভায় দ্বিতীয় ধাপে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে আরও ১২০ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

সূত্র মতে, চলতি বছর ১৬ লাখ টাকায় মশউদ আহমদের লাইসেন্সে সিলেট সদর উপজেলার তিলকপুর-শিবেরখলা বালুমহাল এক বছরের ইজারা দেন সিলেটের জেলা প্রশাসক। সদর উপজেলার ইউএনও’র নির্দেশে সেখানকার সার্ভেয়াররা ইজারাদেরকে বালু উত্তোলনের সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, তিলকপুর-শিবেরখলা মৌজায় (জেএল নং ৪১) ইজারা নিয়ে দিনের বেলা বিশ্বনাথের লামাকাজি ইউনিয়নের আমিরুল্লাহাজ মৌজায় (জেএল নং ২০) আর রাতের বেলা একই ইউনিয়নের গৌরী শংকর (জেএল নং ৮) ও হাজরাই মৌজা (জেএল নং ১৯) থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। দিনেরাতে ১০/১৫টি স্টিলের নৌকা দিয়ে সমান তালে করা হয় বালু উত্তোলন। জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পরও রাতভর মেশিনের বিকট শব্দে ঘুমাতেও পারেন না ওই এলাকার বাসিন্দারা। এতে বাধা দিলে তাদেরকে মিথ্যা মামলা ও পুলিশ দিয়ে হয়রানি করা হয় বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।

Manual7 Ad Code

সরেজমিন নদী ভাঙন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদীর একপাড়ে একসঙ্গে ৪টি নৌকা দিয়ে সুরমা নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আর ওপর পাড়ে আরও দু’টি নৌকা থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে হাজরাই গ্রামে মজুদ করছেন ওই গ্রামের বাবুল মিয়া। অন্যদিকে সরকারি বরাদ্দের বালু ভর্তি বড় বড় বস্তা ফেলে নদী পাড়ের ভাঙা জায়গা ভরাট করছেন দায়িত্বে থাকা কর্মীরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লামাকাজি-পরগণাবাজার-আকিলপুর ভাঙা সড়ক দিয়ে কোন উপায়ে অটোরিকশাযোগে যাতায়াত করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

বালু ব্যবসায়ী বাবুল মিয়া নিজেকে বৈধ ব্যবসায়ী দাবি করে বলেন, তার মতো একইভাবে ব্যবসা করছেন সাঙ্গিরাই গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম, দিঘলী গ্রামের কয়েছ মিয়া, জাগিরালা গ্রামের জহির উদ্দিন ও সদর উপজেলার আলীনগর গ্রামের কয়েছ মিয়া।

ওই এলাকায় গিয়ে কথা হয় রাজাপুরের সজ্জাদ চৌধুরী লিলু, আকিলপুরের ইমন আহমদ বিজয়, সালা উদ্দিন ও চয়ন আচার্যের সঙ্গে। তারা বলেন, সরকার একদিকে নদী ভাঙ্গন প্রতিরোধে শত কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে, অন্যদিকে বালুমহাল ইজারা দিয়ে পাঁচ বছরে পেয়েছে মাত্র ৮০ লাখ টাকা।

রাজাপুরের আবদুল লতিফ, নুরুল হক, হাজরাইর আশরাফ আলী, পরগণা বাজারের ব্যবসায়ী সাদ উদ্দিন বলেন, শিবেরখলা মৌজায় নয় আমিরুল্লাহাজ মৌজায় বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আর রাতের বেলা ১০/১৫টি নৌকা দিয়ে হাজরাই ও গৌরী শংকর মৌজা থেকে বালু উত্তোলন করা হয়।

Manual2 Ad Code

তবে রাতে নয়, দিনে নিজ সীমানায় বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন ইজারাদার এডভোকেট নাসিম আহমদ। পুলিশ দিয়ে কাউকে হয়রানি কিংবা হুমকি ধমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি জানান, বড়ভাই মশউদ আহমদের নামে তিলকপুর-শিবেরখলা মৌজার বালুমহাল ১৬ লাখ টাকায় এবছর তিনি ইজারা নিয়ে বালু উত্তোলন করছেন।

বিশ্বনাথ উপজেলার রাজাপুর গ্রামের নুরুল হক, হাজরাই গ্রামের আশরাফ আলী, ছাদ উদ্দিন, পরগণা বাজারের সিতারা বেগম বলেন, ইজারা অনুযায়ী শিবেরখলা মৌজা থেকে বালু-মাটি উত্তোলনের কথা থাকলে ইজারাদার গভীর রাত থেকে ১৫/২০টি নৌকা নিয়ে এসে আমিরুল্লাহাজ-গৌরী শংকর-হাজরাই মৌজার অংশে বালু-মাটি উত্তোলন করেন। আমিরুল্লাহাজ-গৌরী শংকর-হাজরাই ও শিবেরখলা মৌজার সীমানা নির্ধারণ করা হলেই আমাদের সম্পদ নদী ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পাবে। তাছাড়া ইজারাবিহীন অংশে অবৈধভাবে বালু-মাটি উত্তোলনে বাঁধা দিলে এলাকাবাসীকে মিথ্যা চাঁদাবাজি-ছিনতাইয়ের মামলা করার হুমকি দেয় ইজারাদাররা। ফলে ইজারার অংশ (শিবেরখলা মৌজা) ভালো থাকলেও আমিরুল্লাহাজ-গৌরী শংকর-হাজরাই মৌজার অংশে থাকা জনসাধারণের বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট, মাজার-কবর, কৃষি জমি ভেঙ্গে নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে, এছাড়া হুমকির মুখে রয়েছে একাধিক স্কুল-কলেজ-বাজার, ইউনিয়ন পরিষদের ভবন, বিশ্বনাথ-রামপাশা-লামাকাজী ও লামাকাজী-পরগণাবাজার-আকিলপুর সড়ক।

উপজেলার আকিলপুর গ্রামের এলাইছ মিয়া, রাজাপুর গ্রামের আবদুল লতিফ, সত্তোরর্ধ্ব আলহাজ্ব সজ্জাদ চৌধুরী লিলু বলেন, নদীর বর্তমান অবস্থান আমাদের পূর্বপুরুষদের পৈত্রিক সম্পত্তির উপর রয়েছে। নদী ভাঙ্গনের ফলে তা আজ নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আর আমাদের ভূমিটুকু পড়েছে আমিরুল্লাহাজ মৌজায়। নদীর উত্তর পাড়েও আমিরুল্লাহাজ মৌজার বিশাল এরিয়া রয়েছে। সীমানা নিধারণ করা হলে তা বেরিয়ে আসবে। তাই শিবেরখলা মৌজার ইজারার কথা বলে যেখানে বালু-মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে তা প্রকৃত পক্ষে আমিরুল্লাহাজ-হাজরাই-গৌরী শংকর মৌজার জায়গা। নদী ভাঙ্গন রোধ, আমাদের জায়গা-জমি ও মামলার হুমকি-ধামকি থেকে এলাকাবাসীকে রক্ষা করার জন্য দ্রুতই আমিরুল্লাহাজ-হাজরাই-গৌরী শংকর মৌজা ও শিবেরখলা মৌজার সীমানা নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবী। এজন্য প্রশাসনসহ সরকারের সু-দৃষ্টি কামনা করছি আমরা।

বালু-মাটি ব্যবসায়ী হাজরাই গ্রামের বাবুল মিয়া বলেন, আমি ছাতকের গোবিন্দনগর গ্রামের আবদুস ছত্তার, সদরের লালারগাঁও সাহাব উদ্দিন ও সুহেল আহমদের কাজ থেকে ফুট হিসেবে বালু ও মাটি ক্রয় করে স্টক করে বিক্রি করি। আমার কাছে ক্রয়ের রিসিটও আছে।

এব্যাপারে সদর উপজেলার লালারগাঁও সাহাব উদ্দিন বলেন, আমি ইজারাদার সুবিদ বাজারের নাসিম আহমদ ও সাঙ্গিরাই গ্রামের রফিকুল ইসলামের কাছ থেকে ফুট হিসেবে বালু-মাটি ক্রয় করি এবং নদী থেকে উত্তোলন করে তা আবার অন্যদের কাছে বিক্রি করি।

Manual3 Ad Code

লামাকাজী ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ডের মেম্বার মোঃ নুরুজ্জামান বলেন, নদী ভাঙ্গনের ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছেন বিশ্বনাথবাসী। ভাঙ্গনের ফলে সুরমা নদী নিজের পূর্বের অবস্থান থেকে সরে আমিরুল্লাহাজ-হাজরাই-গৌরী শকর মৌজায় অবস্থান করছে। নদীর ওপারে ভরাট হওয়া অংশে ওই মৌজাগুলোর বিশাল এরিয়া রয়েছে। কিন্তু নদী আমাদের অংশের দিকে সরে আসার কারণে ওপাড়ের অংশে থাকা আমাদের ভূমি সীমানা নিধারণ না করা পর্যন্ত দাবী করা যাচ্ছে না। তাই বিশ্বনাথের আমিরুল্লাহাজ-হাজরাই-গৌরী শকর মৌজা ও সদরের শিবেরখলা মৌজার সঠিক সীমানা নির্ধারণ করা এখন সময়ের দাবী।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বনাথ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বর্ণালী পাল বলেন, বালু উত্তোলনের সীমানা নির্ধারণসহ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে এ বিষয়টি জানিয়েছি।

সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহুয়া মমতাজ বলেন, সার্ভেয়ার পাঠিয়ে ইজারাদারদেরকে বালু-মাটি উত্তোলনের জন্য ইজারাকৃত অংশের সীমানা ও দাগ দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে গিয়ে বালু-মাটি উত্তোলনের অভিযোগে পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। আর মৌজার সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি জটিল, তাই এব্যাপারে জেলা প্রশাসক বরাবরে আবেদন করতে হবে।

এব্যাপারে সিলেটের সহকারী জেলা প্রশাসক (রেভিনিং) মোহাম্মদ নাসির উল্লাহ খান বলেন, ইজারা নির্দিস্ট সীমানার বাইরে গিয়ে বালু-মাটি উত্তোলন করার অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। মৌজাগুলোর সীমানা নির্ধারণ করতে চাইলে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবরে আবেদন করতে হবে।

Manual6 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code