Main Menu

লাফার্জের বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ


ছাতক প্রতিনিধি : ছাতকের লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট কারখানা বিরুদ্ধে পরিবেশ দূষণসহ আনিত বিভিন্ন অভিযোগ ১০ বছরেও প্রতিকার বা আমলে নেয়নি কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বায়ূ ও শব্দ দূষণসহ একাধিক অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগীরা। লাফার্জ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পরিবেশ দূষণ ও ফসলি জমি ধ্বংসের বিষয়ে একাধিক অভিযোগ লাফার্জসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে দেয়া হলেও অজ্ঞাত কারণে কোনো প্রতিকার বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে ক্ষতিগ্রস্ত ভুমি মালিকরা জানিয়েছেন।
বায়ূ দূষণ, শব্দ দূষণ, ফসলি জমি নষ্ট, নদী শাসনসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে লাফার্জের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া স্থানীয় ফসলি জমি থেকে সংগ্রহ করা মাটি প¬ান্ট অভ্যন্তরে পাহাড়সম করে ডাম্পিংয়ের ফলে আশপাশের বসতবাড়িতে ফাটল, গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ ও সবুজ পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে যাচ্ছে লাফার্জ। ভুক্তভোগী মানুষের এসব অভিযোগ সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছার আগেই লাফার্জের কতিপয় উপকারভোগীরা কৌশলে দমিয়ে রাখছে বলে তারা সুবিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমন অভিযোগই করলেন এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন। এসব অভিযোগ ১০ বছরেও কোনো প্রতিকার করার উদ্যোগ নেয়নি লাফার্জ কর্তৃপক্ষ।
এশিয়ার সর্ববৃহৎ সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট কারখানা ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ছাতকের সুরমা নদীর তীরে নোয়রাই-টেংগারগাঁও এলাকায়। ২শ‘ ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে ফ্রান্সের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক বার্ষিক ১.২ মিলিয়ন টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এ কারখানাটি শহরের সুরমা নদীর উত্তর পাড় টেংগারগাঁও ও নোয়ারাই গ্রামের মাঝামাঝি এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এসময় কারখানার প্রধান কাঁচামাল চুনাপাথর সংগ্রহের জন্য ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসিয়া বনভূমি এলাকার ১শ‘ ১৬ হেক্টর খনি আর্ন্তজাতিক চুক্তির মাধ্যমে লিজ গ্রহন করে লাফার্জ। ভারতের খনি প্রকল্প থেকে লাফার্জের অভ্যন্তর পর্যন্ত চুনাপাথর পরিবহনের জন্য স্থাপন করা হয় ১৭ কিলোমিটার সংক্রিয় উচ্চ শব্দ বিশিষ্ট কনভেয়ার বেল্ট। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাস থেকে লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট কারখানা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে। কিন্তু কারখানাটি উৎপাদনে যাওয়ার ৬ মাসের মাথায় পরিবেশ বিনষ্টের কারণে একটি বড় ধরনের হোঁচট খেতে হয়েছে। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে ভারত থেকে চুনাপাথর আমদানিতে ভারতের উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করলে কারখানাটির ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ভারতের পরিবেশ মন্ত্রনালয় চুনাপাথর আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলে কাঁচামালের অভাবে কারখানার উৎপাদন চলে আসে সর্বনিম্নে।
জানা যায়, পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসিয়া এলাকার বাসিন্দারা কয়েকটি এনজিও সংস্থার পরামর্শে আদালতে মামলা দায়ের করলে ঝুঁকিপূর্ন পরিবেশ সৃষ্টির কারণে পরিবেশ মন্ত্রণালয় মেঘালয় রাজ্যের ননগোট্রাই খনি থেকে চুনাপাথর উত্তোলনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন ভারতের হাইকোর্ট। ফলে ২০০৭ সালের ১২ এপ্রিল থেকে লাফার্জ তাদের খনি প্রকল্প থেকে চুনাপাথর উত্তোলন করতে না পারায় কারখানার ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দেয় অনিশ্চয়তা। এতে ছাতকের লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট কারখানায় ক্লিংকার উৎপাদন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে পড়ে। এ সময় দেড় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে স্বেচ্ছায় ছুটি প্রদান করা হয় এবং কারখানা থেকে কয়েক‘শ শ্রমিকও করা হয়েছিল ছাঁটাই। ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতীয় আদালতের একটি রায় লাফার্জের অনুকূলে হওয়ায় লাফার্জ খনি প্রকল্প থেকে আবারো চুনা পাথর উত্তোলন করে উৎপাদন শুরু করে। কিন্তু একই অভিযোগে ২০১০ সালের ৫ ফেব্রয়ারী ভারতীয় সুপ্রিমকোর্ট খনি থেকে চুনা পাথর উত্তোলনের উপর আবারো নিষেধাজ্ঞা জারি করলে কারখানার ভবিষ্যত নিয়ে আবারো অশ্চিয়তা দেখা দেয়। দীর্ঘ শুনানির পর ভারতীয় শীর্ষ আদালত ২০১১ সালের ৬ জুলাই দেশের পরিবেশ ও বন মন্ত্রনালয় লাফার্জকে দেয়া সংশোধিত পরিবেশ বিষয়ক অনুমোদন দিলে, আর্ন্তজাতিক চুক্তির গুরুত্বের কথা বিবেচনায় এনে দীর্ঘ প্রায় ১৫ মাস পর ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এসএইচ কাপাদিয়া লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট কারখানার পক্ষে রায় প্রধান করেন।
এরপর থেকে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদন করতে শুরু করলেও সিমেন্ট তৈরির আরো একটি অন্যতম উপাদান মাটি সংগ্রহে নতুন জটিলতায় পড়ে কারখানাটি। কারখানা কর্তৃপক্ষ কৃষি জমি থেকে স্থানীয়ভাবে মাটি সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করলে এ সময় কৃষি জমি থেকে মাটি না দেয়ার পক্ষে স্থানীয় লোকজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানায়। কৃষি জমি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় স্থানীয় কৃষকরা তৎকালীন জেলা প্রশাসক জহির উদ্দিন আহমদ বরাবরে স্মারকলিপিও প্রদান করেন। এসময় লাফার্জ কর্তৃপক্ষ স্থানীয় কৃষিজমির মালিকদের বিভিন্ন আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে কৃষি জমি থেকে মাটি সংগ্রহ করতে শুরু করে।
এদিকে লাফার্জ সিমেন্ট কারখানায় ডাষ্ট ডিভাইডার ব্যবহার না করায় আশপাশের সবুজ পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। সেই সাথে মাটি সংগ্রহের কারণে এলাকার কৃষি জমি পরিণত হচ্ছে জলাশয়ে। ১৭ কিলোমিটার কনভেয়ার বেল্টের উচ্চ শব্দের কারণে আশপাশের অর্ধশতাধিক গ্রামের মানুষ মারাত্মক শব্দ দূষনে ভোগছেন। একাধিকবার পরিবেশ, শব্দ দূষণ, সুরমা নদী ভরাট ও স্থানিয়দের চাকুরি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও লাফার্জ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি কখনোই আমলে নেয়নি। স্থানীয় ফসলি ভূমির ক্ষতির বিষয়ে ২০১৩ সালের ৩ জুলাই বোরো ল্যান্ড রিভাইটালাইজেশন প্রকল্পের আওতাধিন কৃষকদের সাফল্য মুল্যায়ন সভা করে লাফার্জ কর্তৃপক্ষ। সভায় প্রধান অতিথি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন সংস্থার চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব জহির উদ্দিন আহমদ ও সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক ইয়ামিন চৌধুরী মাটি সংগ্রহের বিষয়টি বিজ্ঞান সম্মত নয় বলে সভায় কঠুর সমালোচনা করেন। সবুজ পরিবেশ, কৃষি জমি রক্ষা ও শব্দ দূষনের বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হলে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের পূনর্বাসন করতে পারলেই লাফার্জ ছাতক তথা দেশের জন্য আর্শিবাদ হবে বলে তখন তারা মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট কারখানা এ অঞ্চলের মানুষের জন্য আসলেই আশির্বাদ না অভিশাপ বিষয়টি এখনই খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীতা দেখা দিয়েছে।
পাহাড়সম মাটি ডাম্পিংয়ের ফলে বসতঘরে ফাটল ও ফাটলের কারণে প্রাণহানির অভিযোগ এনে ক্ষতিপূরণ দাবি করে ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল লাফার্জের প্ল্যান্ট ম্যানেজার বরাবরে ও মাটি ডাম্পিং ফসলি জমি অনাবাদি জমিতে পরিণত করার অভিযোগে নোয়ারাই এলাকার শুকুর মিয়া চৌধুরী ইউএনও বরাবরে পৃথক অভিযোগ দায়ের করেন।
এদিকে ১০ লক্ষাধিক টন মাটি ডাম্পিংয়ের কারণে ২০১২ সালের ২০ ফেব্রয়ারি ডাম্পিং সাইড সংলগ্ন এলাকায় ছাতক সিমেন্ট কারখানার ৬ ব্যারেল গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ ঘটলে ছাতক সিমেন্ট কারখানার উপাদন ১ সপ্তাহ বন্ধ থাকে।
এদিকে কনভেয়ার বেল্টের উচ্চ শব্দের কারণে ছাতক-দোয়ারার অন্তত অর্ধ-শতাধিক গ্রামের মানুষ শব্দজনিত নানা রোগে ভুগছেন। লাফার্জের মুল প¬ান্টের আশপাশের কয়েকটি গ্রামের সবুজ পরিবেশ সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে ধূষর বর্ণ ধারণ করেছে। অতিরিক্ত ডাষ্টের কারণে লাফার্জ সংলগ্ন সুরমা নদী হারাচ্ছে নাব্যতা। চুক্তি অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের সুযোগ-সুবিধা থেকে করা হয়েছে বঞ্চিত। লাফার্জের আশপাশের এলাকার শ’ শ’ একর ফসলি জমি ক্রমান্বয়ে চলে যাচ্ছে লাফার্জের পেটে। এক সময় এসব ফসলি জমি বিরান ভুমিতে পরিণত হওয়ার আশংকাও করছেন স্থানীয়রা। লাফার্জের এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দেখার যেন কেউ নেই। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই লাফার্জের এসব অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছচারিতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবাদ সভা, স্বারকলিপি প্রদান, মানববন্ধনসহ অধিকার আদায়ের আন্দোলন করেও প্রতিকার হয়নি।
লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট কারখানার কমিউনিটি রিলেশন কর্মকর্তা সাব্বির হোসেন স্থানীয় অভিযোগ-আপত্তির ব্যপারে জানান, বিশাল কারখানার বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ-আপত্তি থাকা স্বাভাবিক। আমরা যেকোন ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় এনে তা সমাধানের চেষ্টা করে যাচিছ।
প¬ান্ট ম্যানেজার ই আর কিম স্থানীয় সমস্যার বিষয়ে বলেছিলেন, লাফার্জের প্রতিষ্ঠাকালীন স্থানীয়দের সাথে দেয়া সকল প্রতিশ্রতি তারা ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের ভুমির মূল্যসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছে।

Share





Related News

Comments are Closed