Main Menu

দেশের লবণে প্লাস্টিকের উদ্বেগজনক উপস্থিতি

বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: দেশের লবণে প্লাস্টিকের উদ্বেগজনক উপস্থিতিতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। প্রতি কেজি লবণে ২ হাজার ৬৭৬ টি মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি উদ্বেগকে ক্রমশই বাড়িয়ে তুলছে। দ্রুত এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে লবণের প্লাস্টিকের কারণে নানা রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানা গেছে, লবণ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। কয়েক বছর ধরেই দেশে বছরে ১৬-১৯ লাখ টন লবণ উৎপাদন হয়। যার সিংহভাগই আসে সমুদ্র উপকূলের জমি থেকে। তবে বাংলাদেশে উৎপাদিত লবণে পাওয়া গেছে মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা যায়, এ লবণের প্রতি কেজিতে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৬৭৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। সেখানে বলা হয়, দেশের মানুষ যে হারে লবণ গ্রহণ করে তাতে প্রতি বছর একজন মানুষ গড়ে প্রায় ১৩ হাজার ৮৮টি মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করে।

‘প্রোলিফারেশন অব মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন কমার্শিয়াল সি সল্টস ফ্রম দি ওয়ার্ল্ড লংগেস সি বিচ অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে। এ গবেষণায় দেশে বাণিজ্যিকভাবে বিপণন হয় এমন ১৩টি ব্র্যান্ডের লবণের বিভিন্ন পরিমাণ নিয়ে পরীক্ষাগারে যাচাই-বাছাই করা হয়। এর মধ্যে ১০টি হলো দেশের স্বনামধন্য কোম্পানির ও তিনটি স্থানীয় পর্যায়ের রিফাইনারির।

২০২১ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে গবেষণার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণা শেষে দেখা যায়, দেশের উৎপাদিত লবণে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এত বেশি যে, বাছাইকৃত দেশগুলোর মধ্যে বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ দেশ বাংলাদেশ। গড়ে প্রতি কেজি লবণে ২ হাজার ৬৭৬ মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলেও বেশকিছু লবণে এর চেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত প্লাস্টিকেরই ক্ষুদ্র অংশ, যেটি আকারে দুই থেকে পাঁচ মাইক্রোমিটার হয়ে থাকে। সাধারণত নিত্যব্যবহার্য প্লাস্টিক বর্জ্য তাপমাত্রা, অণুজীব ও অন্যান্য কারণে ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতিসংঘ পরিবেশ সম্মেলনে সামুদ্রিক প্লাস্টিক বর্জ্য দূষণে শীর্ষ ১০ জরুরি পরিবেশগত সমস্যাগুলোর একটি হিসেবে প্লাস্টিককে তালিকাভুক্ত করা হয়। ২০১৫ সালে দ্বিতীয় জাতিসংঘ পরিবেশ সম্মেলনে পরিবেশ দূষণ ও পরিবেশবিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয় মাইক্রোপ্লাস্টিককে।

বাংলাদেশে পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত নমুনায় সর্বনিম্ন ৩৯০ ও সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৪০০ মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। দেশের ভালো ব্র্যান্ডের লবণেও উচ্চমাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এ উচ্চ উপস্থিতির মূল কারণ সমুদ্রে অতিমাত্রায় প্লাস্টিকের দূষণ ও দেশে প্লাস্টিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার। এছাড়া লবণ উৎপাদনকারী অঞ্চলে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহারও লবণে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। সমুদ্র উপকূলে পর্যটকদের ব্যবহৃত প্লাস্টিক সামগ্রীও লবণের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এ বিষয়ে গবেষণা দলের প্রধান ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. শফি এম তারেক বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এখন ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। লবণ থেকে শুরু করে মাছের পেটেও এর উপস্থিতি মিলছে। মানুষ যেখানেই প্লাস্টিকের দূষণ করুক না কেন, তা এক পর্যায়ে সাগরে গিয়ে পৌঁছায়। এটি পানির স্রোত ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অনেকদিন ধরে ভাঙে। ভাঙা অংশগুলো আবার সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ভেঙে আরো ক্ষুদ্র হয়। তখন এগুলো ন্যানো, ম্যাক্রো ও মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। এ ভাঙা অংশ থেকে বিসফিনলে নামের রাসায়নিক দ্রব্য নির্গত হয়, যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

স্বল্প সময়ের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক দেশের স্বাস্থ্য সমস্যার অন্যতম ক্ষতির কারণ হবে বলে মনে করেন পরিবেশবিজ্ঞানের এ অধ্যাপক। তাই দ্রুত প্লাস্টিক দূষণের হার শূন্যে নামিয়ে আনার ওপর জোর দেন তিনি। পাশাপাশি লবণ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণ করতে পারে এমন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানো ও নীতি কার্যক্রম প্রণয়ন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গবেষণাটির তথ্য নিয়ে লবণ মিল মালিক সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দিতে রাজি হননি কেউ। সমিতির সদস্যরা বলেছেন, কোম্পানিগুলো বিএসটিআইয়ের মানদণ্ড অনুসারে লবণ উৎপাদন ও বিপণন করছে। তবে বিএসটিআইয়ের মানদণ্ডে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সহনীয় মাত্রার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। যদি কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়, তাহলে তারা সেগুলো পরিপালন করবেন।

জানা গেছে, সারা বিশ্বে গড়ে ৩৬ কোটি টন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও বাড়ছে প্লাস্টিকের ব্যবহার। বিশ্বব্যাংকের ‘টুয়ার্ডস এ মাল্টিসেক্টরাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর সাসটেইনেবল প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে শহরাঞ্চলে বার্ষিক মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার ২০০৫ সালে ছিল ৩ দশমিক শূন্য ১ কেজি, যা ২০২০ সালে ৩ গুণ বেড়ে ৯ কেজিতে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ঢাকা শহরে জনপ্রতি প্লাস্টিকের ব্যবহার ২২ কেজি ৫০০ গ্রাম, যা ২০০৫ সালে ছিল ৯ কেজি ২০০ গ্রাম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্লাস্টিক মাটিতে মিশতে সময় লাগে প্রায় ৪০০ বছর। ফলে এতে একদিকে যেমন মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়, অন্যদিকে এটি ভূগর্ভস্থ ও ভূপৃষ্ঠের পানির সঙ্গে মিশে পানিকে দূষিত করছে। এর মাধ্যমে এসব প্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। পরিবেশের প্রতিটি উপাদানের সঙ্গে ধীরে ধীরে মিশছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে গোটা প্রাণিজগতে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের কারণে ক্যান্সার, হরমোনের তারতম্য, প্রজনন প্রক্রিয়ায় বাধাসহ মারাত্মক সব ক্ষতি হচ্ছে। এ ভয়াবহ দূষণের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে সরকারি-বেসরকারি সব পর্যায় থেকেই বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, যে কয়টি উপাদান মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টি করে, তার মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্যতম। বাতাস ও পানির মাধ্যমেও মানবদেহে এ প্লাস্টিক প্রবেশ করে। মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণ হয়েছে। দেশের সব লবণে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়াকে ইচ্ছাকৃত বলে মনে করছেন না এ বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, এটা অতিক্ষুদ্র একটি পরিমাণ। এতে লবণের ওজনে তেমন তারতম্য হবে না। এ ধরনের প্লাস্টিক মানুষের পরিপাকতন্ত্রের মাধ্যমে প্রবেশ করে যকৃৎ, ফুসফুসসহ অন্যান্য অঙ্গে বৈকল্য তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি হজমে প্রতিবন্ধকতা, নারী ও পুরুষের বন্ধ্যত্বও তৈরি করতে পারে। কারণ প্লাস্টিক মানবদেহে হরমোনের ভারসাম্যকে বাধাগ্রস্ত করে। দূষিত বাতাসের মাধ্যমেও প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা আমাদের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে দেশে লবণের উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৬-১৯ লাখ টন। লবণ চাষে জড়িত ২৮-৩০ হাজার কৃষক। করোনাকালে কিছুটা ভাটা পড়লেও সম্প্রতি গড়ে প্রতি বছর ৫৭-৬৫ হাজার একর জমিতে লবণ চাষ হয়। গত বছর ৬০ হাজার ৭৯৬ একর জমিতে লবণ চাষ হয়েছে। এ বিপুল পরিমাণ লবণেই রয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি।

জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে লবণের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় কয়েক বছর আগে বিএসটিআই ২৭ ধরনের ৪০৬টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ৩১৩টি পণ্যের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। যেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৫২টি পণ্য নিম্নমানের পাওয়া যায়। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এ ৫২টি খাদ্যপণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এসব পণ্যের মধ্যে নয়টি লবণ কোম্পানিও ছিল।

আবার বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের একটি যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগর থেকে আহরিত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও অণুজীবের পেটে ক্ষুদ্র আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। শুধু রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টন বর্জ্য হচ্ছে, যার ১০ শতাংশই প্লাস্টিক। এসবের মাত্র ৪৮ শতাংশ ল্যান্ডফিল্ডে যাচ্ছে, ৩৭ শতাংশ পুনর্ব্যবহার হচ্ছে, ১২ শতাংশ প্লাস্টিক খাল ও নদীতে এবং ৩ শতাংশ ড্রেন ও খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে। ফলে অবারিতভাবে প্লাস্টিক মিশছে পরিবেশে, যা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে অনেক মাত্রায়।

বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বুশরা নিশাত বলেন, দেশের শহরাঞ্চলে প্লাস্টিকের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। বিশেষ বিশেষ এলাকায় এর ব্যবহার বেশি হচ্ছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে এ বৃদ্ধি উদ্বেগের কোনো কারণ হতো না। ইউরোপের দেশগুলোতে গড় মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার অনেক বেশি হলেও সেগুলো সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহার ও যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে পরিবেশের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্লাস্টিক।

বাংলাদেশ প্লাস্টিক দূষণের শিকার হওয়া দেশগুলোর তালিকায় সবচেয়ে উপরে থাকা দেশের অন্যতম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্লাস্টিক বর্জ্যের অব্যবস্থাপনাই এর জন্য দায়ী। প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হলে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে বলেও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে। সে অনুযায়ী সরকারকে পদক্ষেপ নিতে পরামর্শ ও তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

0Shares





Related News

Comments are Closed