Main Menu

গানের নজরুল

সুকান্ত গুপ্ত: কবি নজরুল ইসলাম সত্য সুন্দরের কষ্ঠস্বর বা তাঁর সৃষ্টির প্রতিনিধি। কারণ জীবনের অপ্রকাশিত ভাবনাগুলো প্রকাশ পায় তার মধ্যে। তাঁকে বলা যায় মান জাতির বিবেকের কণ্ঠস্বর। ‘বিদ্রোহী’ এবং ‘কবি’ নজরুলের আড়ালে নজরুলের অন্যান্য পরিচয় ঢাকা পড়ে গেছে। তিনি লিখেছেন বেশ কিছু ছোট গল্প, উপন্যাস, করেছেন নাটক রচনা প্রবন্ধের সংখ্যাও কম নয়। তার জীবনের একটি মূল্যবান সময় কেটেছে সাংবাদিকতায়। পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন বেশ কয়টি। তিনি অনুবাদক ও অন্য আরেকটি পরিচয় আছে যা আজও বহুল আলোচিত- তা হল তিনি বাংলা সংগীত জগতের একজন মহানপূর্ণ সংগীত ব্যক্তিত্ব। তিনি একাধারে গীতিকার, গীতিনাট্য রচয়িতা, গায়ক, সুরকার, সুরস্রষ্টা, সংগীত শিক্ষক, সংঙ্গীত পরিচালক।
সংগীতজ্ঞ নজরুলের পূর্ণ উপলব্ধি ছাড়া নজরুল প্রতিভার মূল্যায়ন কোন অবস্থাতেই সম্পূর্ণ হতে পারে না। নজরুলের সৃষ্টিশীল জীবনের (১৯২০ সালের মার্চ মাস হতে ১৯৪২ সালের ৯ জুলাই মোট বাইশ বছর তিন মাস) অর্ধেকেরও বেশী সময় কেটেছে সংগীত জগতে। প্রাণের বাঁধভাঙ্গা এক জোয়ার নিয়ে এসেছিলেন নজরুল আমাদের বাংলা গানে। সে সময় ছিল বাংলা গানের স্বর্ণযুগ। কল্পনার যত রং রূপের সব সমৃদ্ধ অলঙ্কারই পরিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর গানের অঙ্গশোভা বাড়াতে। তাঁর গান আমাদের দৃষ্টিকে প্রসারিত করে, চোখ খুলে দেয়, চিন্তাকে চালিত করে, সুন্দরকে করে লালন, মনকে দেয় নাড়া। এ শুধু গানের গুণের কথা নয় আছে তাঁর সুন্দরের প্রকাশ, জীবনের উল­াস আর শক্তির প্রাচুর্য। তিনি লিখেছেন নানা অঙ্গের গান।
কবি নজরুল এবং গীতিকার নজরুল এ প্রসঙ্গে কবিতাও গানের মধ্যকার সম্পর্কের কথা এসে যায়। আমরা অনেকে ভাবি গান ও কবিতা দুই বিপরীত মেরুর। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কবিতা ও গানের মধ্যে কোন ব্যবধান নেই। কেননা ভাবাবেগ থেকে উভয়ের জন্ম। কবির অন্তরস্থ সৃষ্টিশীল আবেগের বাণীমূর্তি প্রকাশ পায় কাব্যে আর সুরমূর্তি জাগে সংগীতে। আবার কাব্য ও সংগীতের মৌলিক উপাদান একই ধ্বনি। কাব্যে এই ধ্বনি বর্ণাশ্রিত আর সংগীতে সুরাশ্রিত। কাব্যে ধ্বনি লালিত্য প্রকাশিত হয় শব্দে আর সংগীতে ধ্বনিমাধুর্য অপসারিত হয় সুরে।
নজরুলের ক্ষেত্রে কবিতা ও গানের মহামিলন সবিস্ময়ে লক্ষ্য করা যায়। একই চাঁদের এপিঠ ওপিঠ অথচ দুই পিঠেই সমান আলোর রশ্মি।
নজরুলের গানের কথা বলেই প্রথমে আসে কাব্যগীতির প্রসঙ্গ। এর মূল ভাব প্রেম। সেই বিবেচনায় এর আকার ও প্রকৃতি অনেক বিস্তৃত। কাব্যগীতিতে নজরুল নর-নারীর প্রেম ভালবাসা, মিলন বিরহের প্রাপ্তি ও প্রত্যাশাকে আশা দিয়ে জাগরিত করেছেন। একটি গান ‘বুলবুল নীরব লাগিল বনে’ সম্পর্কে জানা যায় মিসরের নর্তকী ফরিদা ১৩৩৩ সালে কোলকাতার থালফ্রেড রঙ্গমঞ্চে নাচ দেখাতে এসে উর্দু গান ‘কিসকু খায়রো মে নাজানে’ এর সুরে যে নৃত্য পরিবেশন করেন কবি মনে তা সৃষ্টি করেছিল নব উদ্দীপনা সেই গানের সুরে সে সময়ে নজরুল রচনা করেন-
বুলবুল নীরব লাগিল বনে
ঝরা বন গোলাপের বিলাপশুনে
শিরাজের নওরোজ ফাল্গুন মাসে
যেন তার প্রিয়াও সমাধির পাশে
তরুণ ইরান কবি কাঁদে নিরজনে।।

বাংলার রাগ সংঙ্গীতের সুমহান সাধক নজরুল। তিনি অনুসরণ করেছেন শুরু ভারতীয় খেয়াল ও ধুমরির বিশুদ্ধ ধারা। রবীন্দ্র সংগীতের উৎসমূলে যেমন ধ্র“পদ তেমনি নজরুল সংগীতে সহজাত বিকাশ খেয়ালে লক্ষ্য কারা যায় খোয়াল ঠুমরির সুর বিস্তারের অবাধ স্বাধীনতা নজরুলকে এর প্রতি অধিকতর আগ্রহী করে তুলেছিল কারণ শিল্পীর সৃজনীশক্তি তাঁর বিকাশের পথ খুঁজে বেড়ায়, এ হচ্ছে তার স্বভাব ধর্ম, তাঁর নতুন রাগ সৃষ্টিতে নজরুল ছিলেন, নির্সরিণী, রূপমাধুরী, বেণুকা, দোলন চাঁপা, বনকুন্তলা সহ নানা রাগ।
নজরুল সংগীতের গীত উৎস সম্পর্কে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে আমাদের সবার অতি পরিচিত চল চল চল, উর্ধ্বে গগনে বাজে মাদল কবি মুসলিম সাহিত্য সমাজকে দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন উপলক্ষে ঢাকায় আসেন ১৯২৮ সালের মার্চে। এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে রচনা করেন তাঁর এই বিখ্যাত গানটি। শিখা (চৈত্র ১৩৩৪), সওগাত (ফাল্গুন ১৩৩৫) প্রভৃতি পত্র পত্রিকায় যা প্রকাশিত হয়।
‘এই শিকল পরা দল মোদের শিকল পরা দল’ গানটি হুগলি জেলে লিখিত। জেলের সকল রকম অত্যাচারের প্রতিবাদে এ গানটি কবি লেখেছিলেন। যা কবির ‘বিষের বাঁশী’ (শ্রাবণ ১৩৩১ বাংলা)-তে স্থান পেয়েছে।
১৩৪৮ সালের ২২ শে শ্রাবণে রবীন্দ্রনাথ মারা গেলে মৃত্যুর কিছুদিন পর কবি রচনা করেন-‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে জাগায়ো না’। কবি কণ্ঠে যা পরবর্তীতে প্রকাশিত হয়। এই সময়েই নজরুল রচনা করেন দীর্ঘ কবিতা ‘রবিহারা’। একবার কবি ও আরো কয়েকজন শিল্পী গ্রামোফোনে কোম্পানীতে বসে গল্প করেছিলেন- এমন সময় প্রশ্ন উঠলো লটারীতে হঠাৎ যদি কেউ এক লাখ টাকা পেয়ে যায় তবে কে কেমন ভাবে তাঁর প্রিয়াকে সাজাবে। কেউ কমলালয় স্টোর্সে যেতে চাইলেন, কেউ ওয়াসেল মোল­ায়, কেউ আবার সুইজারল্যান্ডে পর্যন্ত যেতে চাইলেন, খাতা কলম নিয়ে কবি সাজালেন তাঁর প্রিয়াকে এই ভাবে-

মোর প্রিয়া হবে এস রাণী দেব খোঁপায় তারার ফুল।
কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল।।
কণ্ঠে তোমার পরাব বালিকা
হংস সারির দুলানো মালিকা।
বিজলী জরীন্ ফিতায় বাঁধিব মেঘ রং এলোচুল।।

তারপর গান শেষে বললেন ক’টাকা লাগলো প্রিয়াকে সাজাতে? গানটি ‘বুলবুল’ ২য় খণ্ডে স্থান পায়।
‘আমরা শক্তি, আমরা বল, আমরা ছাত্রদল’ গানটি কবি কৃষ্ণনগর প্রাদেশিক সম্মেলনে (২২ মে ১৯২৬ খ্রী:) উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে রচনা করেন। যার সুর বাউল লোফা কীর্তন অঙ্গ। গানটি ‘সর্বহারা’ ও ‘সঞ্চিতাতে’ আছে।
রাগ, গজলের মত ইসলামী গানেও একটি স্বত:স্ফূর্ত বেগবান ধারা। নজরুল নির্মাণ করলেন বাংলা সংগীতে। তিনি মূলত ইসলামী গান লিখতে শুরু করলেন অন্তরের তাগিদে এবং ঘুমন্ত মুসলিম সমাজকে জাগানোর জন্য এরপর একে একে লিখে চললেন ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ’ কিংবা ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এল নবীন সওদাগর’ প্রভৃতি তেজদীপ্ত, প্রেরণাদায়ী ইসলামী গান। তাঁর গানে আছে অন্ধকার থেকে আলোর পথে বেরিয়ে আসার স্বপ্ন আছে, আকাঙ্খা আছে। আছে প্রেমিক হৃদয়ের চিত্ত চাঞ্চল্য, স্রষ্টার কাছে আছে বিনম্র প্রার্থনা, আছে জেগে উঠার বিপুল ইচ্ছা ও আকাঙ্খা। যারা বৈখবর, ঘুমে অচেতন নজরুল ডাক দিয়েছেন এই বলে-

দিকে দিকে পুন: জ্বলিয়া উঠেছে
দীন-ই-ইসলামী লাল মশাল।
ওরে বে-খবর, তুই ও উঠ জেগে
তুই ও তোর প্রাণ প্রদীপ জ্বাল।

নজরুল যেমন ইসলামী সংঙ্গীত লিখেছেন তেমনি লেখেছেন ভক্তিগীতি ও তাঁর ভক্তিগীতি অসামান্য পারঙ্গমতার শিখর চূড়া স্পর্শ করেছে। বলতে গেলে এ ক্ষেত্রে তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। যেখানে প্রচলিত সুরে গানে প্রাণ জাগে না। স্বতঃস্ফূর্ততায় সেখানে তিনি একাধিক সুরের সমাজে ঘটিয়েছেন তাঁর নিজস্ব সৃষ্টিশীলতায়। কবির কাছে হিন্দু-মুসিলম কোন ভেদাভেদ নেই। তাই দেখা যায় কবির ইসলামী সংগীত কিংবা ভক্তিগীতিতে (শ্যামা সংঙ্গীত) অতুলনীয় মোহময়তা। কবির কণ্ঠে সর্বদা ধ্বনিত হয়- স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি তার অন্তরাত্মার ক্রিয়াশীল নানা জিজ্ঞাসা। এই সব গান এক অনাবিল অপার্থিব স্বপ্নও সৌন্দর্যের জগৎ রচনা করে চলে। প্রেমের পথে তিনি আবিষ্কার করেছেন মানব হৃদয়ের অতিন্দ্রীয় ভক্তি ভাব-

আমার আপনার চেয়ে আপন যেজন
খুঁজি তারে আমি আপনায়
আমি শুনি যেন তার চরণের ধ্বনি
আমার এ তিয়াসী বাসনায়।

Share





Related News

Comments are Closed