বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের কালনী নদীর তীরে ছোট্ট গ্রাম উজানধল। চারদিকে হাওর, বর্ষায় অথৈ জল আর শীতে বিস্তীর্ণ ধানের মাঠ। এই প্রকৃতি ও মানুষের জীবন থেকেই উঠে এসেছিলেন বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম, যার কণ্ঠে ভাটির মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, বঞ্চনা ও মানবতার কথা ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়।
২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিলেটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন কিংবদন্তি এ লোকশিল্পী। আজ তার ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। এ উপলক্ষে শাহ আবদুল করিম পরিষদের উদ্যোগে তার নিজ বাড়িতে দোয়া মাহফিল ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্ত, শিল্পী ও শুভানুধ্যায়ীদের উজানধলে সমবেত হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে মৃত্যু তাকে থামাতে পারেনি। মৃত্যুর প্রায় দুই দশক পরও তার গান মানুষের মুখে মুখে। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরাও গাইছেন তার গান। শহরের মঞ্চ থেকে গ্রামের উঠান—সবখানেই বাজছে তার সুর। কারণ তিনি শুধু গান লেখেননি, তুলে ধরেছেন মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও স্বপ্নের কথা।
১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ধলআশ্রম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শাহ আবদুল করিম। পরবর্তীতে উজানধল হয়ে ওঠে তার জীবন ও সংগীত সাধনার কেন্দ্র। দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। অল্প বয়সে নৈশবিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করলেও পরবর্তীতে নিজের চেষ্টায় জ্ঞান অর্জন করেন।
শৈশবের দারিদ্র্য তাকে থামাতে পারেনি; বরং মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়। গরু চরানো, মুদির দোকানে কাজ করা, হাওরের জীবন—সবই পরবর্তীতে তার গানের উপাদান হয়ে ওঠে।
কৈশোর থেকেই একতারা হাতে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে মানুষের কথা শুনেছেন তিনি, আর সেই কথাই গানে তুলে ধরেছেন। ফলে তার গান হয়ে ওঠে ভাটি বাংলার মানুষের জীবনের এক জীবন্ত দলিল।
শাহ আবদুল করিমকে শুধু বাউল হিসেবে সীমাবদ্ধ করলে তার সৃষ্টির পরিধি বোঝা যায় না। তিনি ছিলেন গণমানুষের শিল্পী। জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাকে গণসংগীত রচনায় উদ্বুদ্ধ করে।
বাউল, ভক্তিমূলক, আখড়া, সারি ও পালাগানের পাশাপাশি পরিণত বয়সে গণচেতনার গানেও তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় বিভিন্ন জনসভায় গণসংগীত পরিবেশন করেন তিনি। তার গানে প্রেমের পাশাপাশি উঠে এসেছে ক্ষুধা, শোষণ, বঞ্চনা ও মানুষের অধিকার আদায়ের কথা।
তার অসংখ্য গান আজ জনপ্রিয়তার গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে। ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’, ‘গাড়ি চলে না’, ‘কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু’, ‘বসন্ত বাতাসে’-এসব গান এখনও সমানভাবে জনপ্রিয়।
তার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষ। ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের পরিচয়কে বড় করে দেখেছেন তিনি। তার গানে হিন্দু-মুসলমানের মিলন, মানবিকতা ও সম্প্রীতির বার্তা বারবার উঠে এসেছে।
মৃত্যুর পর উজানধল আর শুধু একটি গ্রাম নয়; এটি হয়ে উঠেছে বাংলা লোকসংগীতের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিতীর্থ। প্রতি বছর তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে ভক্ত, শিল্পী ও গবেষকরা এখানে সমবেত হন।
তবে তার মতো বিশ্বমানের লোকশিল্পীর স্মৃতি সংরক্ষণে আরও পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
শাহ আবদুল করিমের ছেলে শাহ নূর জালাল বলেন, তার জন্ম ও মৃত্যুদিন সরকারিভাবে পালনের দাবি রয়েছে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি সরকারি কর্মসূচি না হলেও পরিষদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।
Related News
বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
Manual6 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের কালনী নদীর তীরে ছোট্ট গ্রাম উজানধল। চারদিকে হাওর,Read More
জাতীয় কবি কাজী নজরুলের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
Manual1 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৩৮৩Read More



Comments are Closed