সিলেট বিভাগের শিশু-কিশোরদের স্বপ্নপূরণের মঞ্চ হোক ‘নতুন কুঁড়ি’
মো. মামুন অর রশিদ: বিটিভির পর্দায় আবারও ভেসে এলো পরিচিত সুর—‘‘আমরা নতুন, আমরা কুঁড়ি…।’’ প্রায় দুই দশক পর শ্রোতারা শুনল আশাজাগানিয়া সেই সুর। এই সুর শুধু একটি গানের সুর নয়, এক মঞ্চের ডাক। ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা শুরু করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘নতুন কুঁড়ি’তে অংশগ্রহণের স্মৃতি শেয়ার করেছেন। কেউ কেউ এই প্রতিযোগিতা নিয়ে তাঁদের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন। ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা শুধু বিনোদন নয়, এটি আগামী প্রজন্ম গড়ে তোলার এক নির্ভরশীল ভিত্তি। এই প্রতিযোগিতাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ও বিটিভি কর্তৃপক্ষ নিয়েছে নানা উদ্যোগ। সারা দেশের মতো সিলেট বিভাগের চার জেলার সম্ভাবনাময় শিশু-কিশোররাও যেন এই মঞ্চে তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়—তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে কাজ করতে হবে।
১৯৬৬ সালে পাকিস্তান টেলিভিশনে যাত্রা শুরু হয় ‘নতুন কুঁড়ি’র। কবি গোলাম মোস্তফার ‘কিশোর’ কবিতা থেকেই ‘নতুন কুঁড়ি’র নামকরণ। একইসঙ্গে এই কবিতার প্রথম ১৫ লাইনকে করা হয় প্রতিযোগিতার সূচনাসংগীত। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে মোস্তফা মনোয়ারের হাতে পুনর্জন্ম ঘটে এই আয়োজনের, যা দ্রুতই শিশু-কিশোরদের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মঞ্চে পরিণত হয়। এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রতিভা দেখানো অনেকেই পরবর্তী সময় হয়ে উঠেছেন নাটক, সংগীত, চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমের অগ্রগণ্য মুখ। রুমানা রশিদ ঈশিতা, তারিন জাহান, মেহের আফরোজ শাওন, নুসরাত ইমরোজ তিশা, সামিনা চৌধুরী-সহ অনেকের প্রথম মঞ্চ ছিল এই ‘নতুন কুঁড়ি’। ২০০৫ সালে অনুষ্ঠানটি বন্ধ হলেও এর স্মৃতি আজও জীবন্ত।
প্রায় দুই দশক ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা বন্ধ থাকায় মানুষের মাঝে রয়েছে এক ধরনের আক্ষেপ। দেরিতে হলেও সেই আক্ষেপের অবসান হতে যাচ্ছে। আবারও শুরু হচ্ছে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা ৩টি বিভাগে (অভিনয়, নৃত্য ও সংগীত) মোট ৯টি বিষয়ে অনুষ্ঠিত হবে। বিষয়সমূহ হচ্ছে: অভিনয়, আবৃত্তি, গল্পবলা/কৌতুক, সাধারণ নৃত্য/উচ্চাঙ্গ নৃত্য, দেশাত্মবোধক গান/আধুনিক গান, নজরুল সংগীত, রবীন্দ্র সংগীত, লোকসংগীত ও হামদ-নাত।
৬ থেকে ১৫ বছর বয়সি ছেলে-মেয়েরা এবার ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে। বয়সসীমা দুটি শাখায় বিভক্ত। ‘ক’ শাখার বয়সসীমা ৬ থেকে ১১ বছরের নিম্নে এবং ‘খ’ শাখার বয়সসীমা ১১ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত। আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে গত ১৫ই আগস্ট, চলবে আগামী ৫ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
‘নতুন কুঁড়ি’তে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রতিযোগীরা বিটিভির ওয়েবসাইটে (www.btv.gov.bd) প্রবেশ করে ‘নতুন কুঁড়ি’ ব্লকে গিয়ে নির্ধারিত গুগল ফর্ম সঠিকভাবে পূরণ করে বিনামূল্যে অনলাইনে আবেদন করতে পারবে। এছাড়া বিটিভির ওয়েবসাইট থেকে ম্যানুয়াল আবেদন ফর্ম ডাউনলোড করে নির্ধারিত কাগজপত্র সংযুক্ত করে ই-মেইল (notunkuribtv@gmail.com), রেজিস্ট্রি ডাক বা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে—‘নতুন কুঁড়ি’, বাংলাদেশ টেলিভিশন, সদর দপ্তর, রামপুরা, ঢাকা-১২১৯ ঠিকানায়—আবেদন পাঠানো যাবে।
আবেদনপত্র পূরণের সময় নির্ধারিত স্থানে প্রতিযোগীর নাম ও তারিখ লিখতে হবে এবং জন্মসনদ, সদ্যতোলা ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি ও পিতা অথবা মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের সত্যায়িত কপি সংযুক্ত বা অনলাইনে আপলোড করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন না পৌঁছালে কিংবা মোবাইল ফোনে এসএমএস পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হলে প্রতিযোগীরা সরাসরি অডিশনস্থলে স্পট রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে অংশ নিতে পারবেন।
অডিশনের সময় প্রতিযোগীদের জন্মসনদের কপি এবং একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি সঙ্গে আনতে হবে। একজন প্রতিযোগী সর্বোচ্চ তিনটি বিষয়ে আবেদন করতে পারবে। আবেদনকারীদের গুগল ফর্ম অথবা ম্যানুয়্যাল ফর্মের যেকোনো একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে আবেদন করতে হবে।
দেশের ৬৪ জেলা ১৯টি অঞ্চলে ভাগ করে ১১–২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাথমিক বাছাই হবে। এরপর ২৩–২৮ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় বাছাইয়ে প্রতিটি বিষয়ে প্রতিটি শাখা থেকে সর্বোচ্চ ৫ জন করে মোট ৭২০ জন প্রতিযোগী নির্বাচিত হবে। তারা ২–৩১ অক্টোবর ঢাকা পর্বে অংশ নেবে। ফাইনাল পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ২–৬ নভেম্বর। ফাইনালে প্রতিটি বিষয়ে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী এবং দুই শাখার শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পীকে পুরস্কার, নগদ অর্থ ও সনদ প্রদান করা হবে।
গত ১৭ই আগস্ট রামপুরায় বিটিভি ভবনে ‘নতুন কুঁড়ি’র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মোঃ মাহফুজ আলম বলেন, শহিদ জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিটিভিতে নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা সরকার রাজনৈতিক কারণে এই প্রতিযোগিতা বন্ধ করে দেন। বর্তমান সরকার রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে গিয়ে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা শুরুর উদ্যোগ নিয়েছে। উপদেষ্টা আরও বলেন, যাঁরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের সবারই আকাঙ্ক্ষা ছিল একটা নতুন বাংলাদেশ। আর নতুন বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের জন্য এই ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের শিল্পী, গায়ক ও সংস্কৃতিকর্মী তৈরি হবে বলেও উপদেষ্টা আশাপ্রকাশ করেন।
‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা কেবল একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; এটি আগামী প্রজন্মের স্বপ্ন, সৃজনশীলতা ও মেধা বিকাশের এক উন্মুক্ত মঞ্চ। এই প্রতিযোগিতাকে সত্যিকার অর্থে সফল করে তুলতে হলে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি শিশু-কিশোরের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তবে, প্রতিযোগিতায় শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ কেবল তাদের ব্যক্তিগত আগ্রহের ওপর নির্ভরশীল নয়—এখানে শিক্ষকের উৎসাহ, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং অভিভাবকের সচেতনতা ও সহযোগিতাই হয়ে ওঠে মুখ্য অনুপ্রেরণা।
‘নতুন কুড়ি’ প্রতিযোগিতার সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক বাছাই সিলেট শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হবে৷ এখানে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার প্রতিযোগীরা অংশগ্রহণ করবে। সিলেট শিল্পকলা একাডেমিতেই ‘নতুন কুঁড়ি’র বিভাগীয় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে।
‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতার পূর্ববর্তী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিলেট বিভাগের চার জেলার শিশু-কিশোররা প্রতিযোগিতায় তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। অথচ এই অঞ্চল শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ, সম্ভাবনাময় প্রতিভায় ভরপুর। তাই এবারের ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতায় সিলেট বিভাগের শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য দুটিই বাড়ানো জরুরি। এজন্য শিক্ষক, অভিভাবক, সংস্কৃতিকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের এগিয়ে আসতে হবে অগ্রণী ভূমিকায়। কোনো সম্ভাবনাময় মেধাবী শিশু-কিশোর যেন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, জেলা শিক্ষা অফিস, জেলা তথ্য অফিস, উপজেলা প্রশাসন এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল হতে হবে। তাদের সমন্বিত উদ্যোগেই সিলেট বিভাগের সম্ভাবনাময় প্রতিটি প্রতিভা আলোকিত হয়ে উঠতে পারে।
‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুদের অন্তর্নিহিত প্রতিভাকে খুঁজে বের করা এবং সযত্নে বিকশিত করা। এই উদ্দেশ্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন শিক্ষক হবেন সহমর্মী পথপ্রদর্শক, অভিভাবক হবেন সাহসের অবলম্বন, আর চারপাশের পরিবেশ হয়ে উঠবে অনুপ্রেরণার উর্বর ক্ষেত্র। বিশ্বাস ও ভালোবাসার আবরণে যখন শিশু-কিশোরদের হাতে তুলে দেওয়া হয় উপযুক্ত বিষয়, তখনই তাদের ভেতরের সুপ্ত সম্ভাবনা ফুলের মতো প্রস্ফুটিত হয়।
শিশু-কিশোরদের কাছে ‘নতুন কুঁড়ি’ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং শিল্পযাত্রার প্রথম পাঠশালা। অল্প বয়সে মঞ্চে গান গাওয়া, কবিতা আবৃত্তি কিংবা নাটকের সংলাপ উচ্চারণের অভিজ্ঞতা তাদের সারাজীবনের আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি রচনা করে।
আজকের দিনে, যখন ইউটিউব, ফেসবুক কিংবা টিকটক শিশু-কিশোরদের বিনোদনের প্রধান সঙ্গী, তখন ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো একটি আয়োজন ফিরে আসা নিঃসন্দেহে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন এক সজীবতা যোগ করবে। এই মঞ্চে শিশুরা শিখবে—শিল্পের ভাষায় কীভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে হয়। এখানে প্রতিযোগিতা কেবল জয়-পরাজয়ের সীমায় আবদ্ধ নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে শেখার আনন্দ, সহযোগিতার বোধ এবং আত্মবিশ্বাস সঞ্চয়ের সুযোগ। প্রায় দুই দশক পর শুরু হওয়া এ প্রতিযোগিতা হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক, এমনটাই প্রত্যাশা। (পিআইডি ফিচার)
লেখক: বিসিএস তথ্য ক্যাডারের সদস্য এবং জনসংযোগ কর্মকর্তা পদে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে কর্মরত।
Related News
পবিত্র আশুরার রোজা রাখার ফজিলত
Manual3 Ad Code হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী: নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ”Read More
পোশাকে ধর্মীয় ও জাতিগত প্রভাব
Manual4 Ad Code মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: পোশাক মানব সভ্যতার এক অপরিহার্য উপকরণ। সৃষ্টির শুরুRead More



Comments are Closed