পোশাকে ধর্মীয় ও জাতিগত প্রভাব
মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: পোশাক মানব সভ্যতার এক অপরিহার্য উপকরণ। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সকল সভ্য মানুষ পোশাক ব্যবহার করে আসছে। পোশাক মানুষের আভিজাত্যের প্রতীক হওয়ার সাথে সাথে আকীদা বিশ্বাস ও মূল্যবোধেরও পরিচয় বহন করে। ‘Islam is a complete and balanced code of life.’ তাই পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও রয়েছে ইসলামের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভংগি। তবে এ দৃষ্টিভংগিতে বাড়াবাড়ি বা উগ্রতা নেই। জীবনের অন্যান্য দিকের মত এক্ষেত্রেও ইসলামের দৃষ্টি সুদূরপ্রসারী এবং মানব কল্যাণের চিরন্তন লক্ষাভিসারী। ইসলামী শরীয়ত মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট কোন মাপের বা ডিজাইনের পোশাক আবশ্যিক করে দেয়নি, তবে এমন কিছু শর্ত ও মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে যা কিয়ামত পর্যন্ত সকল মানুষের পক্ষেই পালন করা সম্ভব। এ মূলনীতিগুলো অনুসরণ করে স্থান, কাল, পরিবেশ ও আবহাওয়া অনুযায়ী যে কোন পোশাকই ইসলামে জায়েয। তাই পোশাকের প্রশ্নে বল্গাহীনতা ও অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়ি কোনটাই কাম্য নয়।
মানব সভ্যতার জনক হযরত আদম আ. থেকেই পোশাকের ব্যবহার ছিল। আদি মানবরা পোশাক হিসেবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পশুচর্ম ব্যবহার করতো। তাদের সম্পর্কে নগ্নতা ও অসভ্যতার যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে তা সম্পূর্ণ অমূলক। এর অন্তরালে হযরত আদম আ. থেকে শুরু করে পূর্বেকার সব নবী-রসূল ও তাঁদের উম্মতদেরকে অসভ্য ও বর্বর প্রমাণের হীন উদ্দেশ্য নিহিত থাকতে পারে। উল্লেখ্য, মানব জাতির ক্রমাবিবর্তন সম্পর্কে ডারউইনসহ অন্যান্য নাস্তিকদের মতবাদ বাস্তবতা বিবর্জিত, অন্তসারশুন্য ও বর্তমানে অনেকাংশেই বিজ্ঞানীদের দ্বারা পরিত্যক্ত। পোশাক হিসাবে কাপড়ের বুনন ও ব্যবহার শুরু হয়েছে হযরত ইদরীস আ. এর যুগ হতে। বর্ণিত রয়েছে, ‘হুওয়া (ইদরীস) আওয়ালু মান খাতাস-ছিয়াবা ওয়া লাবিসাহ’ অর্থাৎ সর্বপ্রথম হযরত ইদরীস আ.ই কাপড় সেলাই করেন এবং পরিধান করেন। বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের পোশাক সম্পর্কে প্রথম ও বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যায় দুই চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন (পঞ্চম শতক) ও হিউয়েন সাঙের (সপ্তম শতক) ভ্রমণ বৃত্তান্তে। হিউয়েন সাঙের বর্ণনাতে যে পোশাকসমূহের বিবরণ পাওয়া যায় তা দর্জি দিয়ে তৈরি বা সেলাই করা ছিল না। পুরুষরা একটা লম্বা কাপড় কটি বেস্টন করে বাহুর নীচ দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে শরীর পেঁচিয়ে ডান দিকে ঝুলিয়ে দিত। মেয়েদের পোশাক-পরিচ্ছদও শরীরকে আচ্ছাদন করে কাঁধ ও মাথার উপর পর্যন্ত প্রসারিত হতো। পুরুষরা বয়নকৃত অথবা সূচিকর্মযুক্ত টুপি ও জপমালা পরতো। এয়োদশ শতকে মুসলিম বিজয়ের পর বাংলার পোশাক ও সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসে। সুলতানী আমলে অভিজাত ও বিত্তবান মুসলিম পুরুষ ও মহিলাগণ
মূল্যবান, রুচিসম্মত ও আকর্ষণীয় পোশাক পরতেন। পুরুষরা পায়জামা ও গোল গলাবন্ধসহ লম্বা জামা পরতেন। কোমরের সাথে চিকনকাজসহ চাওড়া ফিতা বেধেঁ রাখতেন। তাদের মাথায় থাকতো পাগড়ী। তাঁরা পায়ে কারুকার্যখচিত জুতা ব্যবহার করতেন। মধ্যবিত্ত মুসলমানদের পোশাক ছিল পায়জামা, সাধারণ জামা ও পাগড়ী। সাধারণ মুসলিমরা লুঙ্গি, নিমা (খাটো জামা) ও মাথায় টুপি পরতেন। অভিজাত মুসলিম মহিলারা খাটো কামিজ ও সেলোয়ার পরতেন। তারা সূতি কিংবা রেশমী কাপড়ের ওড়না ব্যবহার করতেন। সাধারণ ও গরীব মহিলারা শুধু শাড়ি পরতেন। বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে সাধারণভাবে হিন্দুদের এবং বিশেষ করে অভিজাত হিন্দুদের পোশাক-পরিচ্ছদে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। অভিজাত হিন্দুদের পোশাক-পরিচ্ছেদে মুসলিম প্রভাব এত বেশি বিস্তার লাভ করেছিল যে, সে সময় উচ্চ শ্রেণীর একজন হিন্দু যদি তিলক কিংবা কানের দুল ব্যবহার না করতেন তাহলে তাকে একজন অভিজাত মুসলিম থেকে আলাদা করা খুবই কষ্টকর ছিল। সাধারণ হিন্দুরা সাধারণত ধুতি ও চাদর ব্যবহার করতেন। তারা ‘অঙ্গরাখি’ নামে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা এক ধরণের জামাও পারতেন। নিন্ম শ্রেণীর হিন্দুরা শুধু এক প্রস্থ ধুতি পরতেন যা কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত বিস্তৃত থাকতো। হিন্দু মহিলাদের শাড়ি পরার ধরন পাল্টে যায়। মুসলিম মহিলারা শাড়ি পরার স্থানীয় রীতির সাথে বিদেশী রীতির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে শাড়ি পরার নতুন রীতি চালু করেন। তাই বর্তমান শাড়ি পরার পদ্ধতিকে মুসলিম ও হিন্দু রীতির অভিযোজন বলা যায়।
পরবর্তী যুগে এ অঞ্চলে পুরুষদের প্রিয় পোশাক হিসেবে সেলাই করা লুঙ্গি, পায়জামা, পাঞ্জাবী, ধুতি ও মহিলাদের ক্ষেত্রে শাড়ি ও ব্লাউজের ব্যবহার প্রাধান্য পায়। উনিশ শতকের শেষে ও বিশ শতকের শুরুতে নারী-পুরুষ উভয়ের পোশাক শৈলীতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুরুষরা পশ্চিমা রীতির শার্ট, প্যান্ট, স্যুট ও টাই পরা শুরু করে। অন্যদিকে মেয়েরা শাড়ির পরিবর্তে আরবীয় ধরনের ফ্রক, সেলোয়ার-কামিজ ও অন্যান্য ডিজাইনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। পরিবর্তনের এ ধারা বর্তমানে আরো বেশি গতিশীল। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ফ্যাশন ও ডিজাইনের পোশাক বের হচ্ছে। এসব নিয়ে গবেষণা করার জন্য বহু ফ্যাশন ও ডিজাইনের পোশাক বের হচ্ছে। এসব নিয়ে গবেষণা করার জন্য বহু ফ্যাশন ডিজাইনার এবং প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে।
পোশক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে ধর্ম ও জাতীয়তার গভীর প্রভাব রয়েছে। ধর্মীয় ঐতিহ্যের কারণে হিন্দুরা ধূতি, পৈতা, খৃস্টানরা ক্রুসচিহ্নিত পোশাক এবং বৌদ্ধরা গেরুয়া কাপড়ের পোশাক পরেন। মুসলমানগণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে লুঙ্গি, পায়জামা, পাঞ্জাবী, জুব্বা টুপি ও পাগড়ী পরেন বিশেষত উপমহাদেশের একে সাধারণ এক ইসলামী পোশাক মনে করেন। আবার একই ধর্মের হওয়া সত্ত্বেও জাতিগত কারণে বাংলাদেশী মুসলমানদের পোশাক আরব, ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইউরোপের পোশাক হতে ভিন্ন ডিজাইনের। এভাবে একই দেশে বিভিন্ন উপজাতির পোশাক-পরিচ্ছদেও বিস্তর পার্থক্য লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশে বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরং, রাখাইন ইত্যাদি উপজাতিদের পোশাকশৈলীতে বেশ পার্থক্য রয়েছে।
এক্ষেত্রে প্রামাণ্য আয়তটি হলো: (অনু.) ‘হে আদম সন্তান! নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য এমন পোশাক (পরিধানের বিধান) নাযিল করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থানকে ঢেকে রাখবে এবং যা হবে ভূষণ। আর তাকওয়ার পোশাক, তা-ই কল্যাণকর। এ হচ্ছে আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম। আশা করা যায় তারা উপদেশ গ্রহণ করবে’ (আ‘রাফ ২৬)। এ আয়াত থেকে পোশাকের তিনটি মৌলিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা যায়। অর্থাৎ পোশাক মানুষের সতরকে আবৃত করে রাখবে। পুরুষেল সতর হচ্ছে নাভী হতে হাঁটু পর্যন্ত। নারীদের সতর নারীদের পরিবেশে বুক থেকে হাঁটু পর্যন্ত এবং বাইরের পরিবেশে দু’হাতের তালু, দু’পায়ের পাতা ও মুখমন্ডল ছাড়া সমস্ত দেহ। এটা ঢেকে রাখা ফরয। সুতরাং যে পোশাক মানুষের সতর (লজ্জাস্থান) আবৃত করে না, তা পোশাক হতে পারে না। পোশাক অবশ্যই ভূষণ বা শোভাবর্ধক ও সৌন্দর্য বিকাশের মাধ্যমে হবে। আল্লাহ তা‘আলা পোশাকের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে ‘রীশ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এর ব্যবহারিক অর্থ হলো ওজ্জ্বল্য, চাকচিক্য ও শোভাবর্ধক। অভিধানে ‘রীশ’ শব্দের অর্থ হলো: পাখির পালকের মতই, এ কারণে মানুষের পোশাক বাহ্যত কিরূপ হবে তা বুঝানোর জন্য ঐ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। ইমাম রাযী বলেন, ‘রীশ’ দ্বারা সৌন্দর্যবর্ধক পোশাককে বুঝানো হয়েছে। পোশাকের মাধ্যমে ব্যক্তির সৌন্দর্যবোধ, ভদ্রতা, শালীনতা, রুচি ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। সুতরাং যে পোশাক ব্যক্তিকে শালীন ও সুন্দর করে না তা কুরআন সমর্থিত পোশাক নয়। অবশ্য সৌন্দর্য ও শোভার ক্ষেত্রে মানুষের রুচি পরিবর্তনশীল। স্থান, কাল, আবহাওয়া ও মানসিক অবস্থার দৃষ্টিতে এতে অনেক পার্থক্য ও পরিবর্তন হতে পারে। এ কারণে পোশাকের ধরন ও কাটিং পরিবর্তনশীল।
আল-কুরআনে পোশাকের ক্ষেত্রে তাকওয়ার উল্লেখ রয়েছে। অতএব পোশাক শুধু সতর ঢাকা এবং সৌন্দর্যবর্ধকই নয়, এটি একটি মনোদৈহিক বিষয়ও। পোশাকের মাধ্যমে ব্যক্তির রুচিবোধ ও মন-মানসিকতার প্রকাশ ঘটে। সুতরাং পোশাক এমন হতে হবে যা ভুষণ ও শালীন হওয়ার সাথে সাথে তাকওয়ার পরিচয় ও বহন করে। পোশাকে গর্ব-অহংকারের পরিবর্তে নম্রতা, ভদ্রতা ও বিনয়ের ছাপ থাকবে এবং এতে প্রয়োজনাতিরিক্ত অপচয় থাকবে না। তদুপরি মুমিনের পোশাক এমন হওয়া উচিত যা পবিত্রতারক্ষক ও নামায আদায়ের ক্ষেত্রে অনুকূল হয়।
ইসলাম পোশাক পরিচ্ছেদের ব্যাপারে যেমনি উদারতার পরিচয় দিয়েছে, তেমনি কিছু মূলনীতিও নির্ধারণ করে দিয়েছে যা সভ্যতা, শালীনতা রক্ষায় একান্ত প্রয়োজন। ইসলামের সেই মূলনীতিগুলো পালন করে নারী-পুরুষের জন্য যে কোন পোশাকেই পরিধান করা অনুমোদনযোগ্য। পোশাক প্রশ্নে এই হলো ইসলামের ব্যাপকতর গ্রহণযোগ্য নীতি। তথাপি এত বৈচিত্রের মধ্যেও পোশাকে ঐক্য থাকবে কেবল আল্লাহ তাঁর রসূল স. এর দিকনির্দেশনা পালনে এবং পোশাকের ব্যাপারে শরীয়ত প্রদত্ত শর্তাদি মেনে চলার মধ্যেই সভ্যতা ও সংস্কৃতি মেনে পোশাকের ব্যবহার করতে হবে।
লেখকঃ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান, পাঠানপাড়া (খান বাড়ি), কদমতলী, সদর, সিলেট-৩১১১।
Related News
পোশাকে ধর্মীয় ও জাতিগত প্রভাব
Manual3 Ad Code মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: পোশাক মানব সভ্যতার এক অপরিহার্য উপকরণ। সৃষ্টির শুরুRead More
পলাশীর ট্রেজেডি এবং বিশ্বাসঘাতকের ইতিহাস
Manual4 Ad Code মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: ২৩ জুন বাঙালীর কলঙ্কের ইতিহাস। ১৭৫৭ সালের ২৩Read More



Comments are Closed