Main Menu

সোনাপুরের নাগা মরিচ যাচ্ছে বিদেশে

মিনহাজ উদ্দিন, গোয়াইনঘাট: ৪ মার্চ বুধবার। সড়ক পথে উপজেলা কৃষি অফিসার মো. সুলতান মিয়া তার সাথে থাকা দুই উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মন্তজুর আলম মঞ্জু ও আবদুল্লাহ আল জাবিরসহ সরকারি জিপে চড়ে খাস সোনাপুর গ্রামে পৌছাই ঘড়ির কাঁটায় বেলা ১টায়। পথিমধ্যে ক্ষেতের আল ধরে কাঁচা সড়কে এগিয়ে চলতে চোখে পড়ে অজোপাড়াগায়ের কৃষকদের কৃষি কাজে মনোনিবেশের নানা দৃশ্য।

চোখে পড়ে ব্যস্ত কৃষাণীর স্বামী কিংবা পরিবারের সদস্যদের জন্য ক্ষেতের আল ধরে হেটে গিয়ে খাবার এনে দেয়ার চিত্রও। আলীরগাও ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে যেতেই যেন উৎসবের আমেজ। কৃষকদের সাথে কুশল বিনিময় ও পরামর্শ প্রদানে উপজেলার নবাগত কৃষি অফিসার আসছেন এমন খবরে জড়ো হন ১৫-২০জন কৃষক।

সফল এসব কৃষকরা কৃষি অফিসারদের সরব উপস্থিতিতে মুগ্ধ হয়ে তাদের ফুলের মালা দিয়ে বরন করে নেন। তারপর একে একে ঘুরে দেখান তাদের ফসলের মাঠ আর সোনালী স্বপ্নের বাস্তবিক প্রতিফলন। নাগা মরিচ, তরমুজ, সুর্য্যমুখী, সরিষা, সীম, ফরাস (ঝাড়সীম), লাউ, কুমড়ো, মিষ্টি কুমড়া, করলা, লাল শাক, ডাটা শাকসহ চোখে পড়ে ফসল ভান্ডার সোনাপুরের সফলতার নানা প্রতিচ্ছবি। এখানকার উৎপাদিত নাগা মরিচ সরাসরি পাইকারের হাত হয়ে যাচ্ছে বিদেশে। উৎপাদিত পন্য বিক্রির মাধ্যমে প্রতিনিয়তই সাবলম্বি হচ্ছেন খেটে খাওয়া কৃষকরা। সোনার ফসলে ভরে উঠেছে সোনাপুর হাওর।

সোনালী হাসিতে তৃপ্ত কৃষকের চোখে দেখা যায় আনন্দ অশ্রু। এই গল্প সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ৫নং আলীরগাও ইউনিয়নে কৃষির ভান্ডার সোনাপুর গ্রামের।

সোনাপুর গ্রামটি গোয়াইনঘাটের ৫নং আলীর ইউনিয়নের খাস মৌজাধীন এবং বারহাল বাজারের দুই কিলোমিটার উত্তর দিকে অবস্থিত। সরাসরি পাকা সড়ক নেই। বারহাল বাজারের পুর্ব উত্তরের অজুহাত গ্রাম হয়ে শুষ্ক মৌসুমে ক্ষেতের আল সমুহ কেটে নির্মিত অস্থায়ী সড়কে চলে ছোট ছোট যানবাহন,মোটর সাইকেল। বর্ষায় নৌকাই একমাত্র ভরসা। সোনাপুর পুুরো গ্রাম, হাওর জুড়ে পাক পাখালির মেলা।

গাছের মগডালে ফাগুনের কোকিল থেকে শুরু করে নানা জাতের ছোট বড় পাখিদেরকিচির মিচির নানা সুরের ডাক বিমুগদ্ধতার রসদ যুগায়। এই গ্রামে ও আশপাশে ৩ শতাধিক কৃষকের বসবাস। শুস্ক মৌসুমে সবাই রবি শষ্য ফসল ফলান মাঠে। গ্রামটির পুরুষ মহিলা সবাই ব্যস্ত। আর তাদের এ ব্যতিব্যস্ততার কারণ কৃষিতে ব্যস্ত সময়। এখানকার কর্মঠ কৃষকদের যেন দম ফালানোর ফুসরত নেই। সরজমিনে সোনাপুর গ্রামে পরিদর্শনকালে চোখে পড়ে সোনাপুরের সফল কৃষকদের সোনালী স্বপ্নের বাস্তবিক প্রতিবিম্ব।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে কথা হয় এই গ্রামের সফল কৃষক ফখরুল, সিরাজ, আলাউদ্দিন, আরজদ আলী,আলা উদ্দিন,এনাম উদ্দিন,বোরহান উদ্দিনসহ কৃষকদের সাথে। তারা জানালেন এখানকার মাটি খুবই উর্বর। যে কোন ধরণের ফসলের বাম্পার ফলন হয়ে থাকে। গ্রামের সফল কৃষক ফখরুল ইসলাম (৩৫)।

সফল এ কৃষক এবার সোনাপুর গ্রামের ক্ষেতে ১০ বিঘা জমিতে নাগা মরিচ লাগিয়েছেন। পাশাপাশি সীম, ঝাড় সীম, শষা, লাউ, লাল শাকসহ আর শাক সবজি লাগিয়েছেন। তার ক্ষেতের ফসল রোপন, পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৪লক্ষ টাকা। ফলনও হয়েছে বাম্পার। সফল কৃষক জানালেন তার উৎপাদিত ফসলের মধ্যে শুধু মাত্র নাগা মরিচ বিক্রি করে তিনি পেয়েছেন ১৫ লক্ষ টাকা। তার এ আয় থেকে বাড়িতে নতুন বিল্ডিংয়ের কাজ শুরু করেছেন বলে জানান।

সোনাপুরের কৃষক সিরাজ উদ্দিন। তিনি এবার ৮ বিঘা জমিতে নাগা মরিচ, ১ বিঘায় সূর্য্যমুখি ফুল, ১০বিঘায় ভুট্রা চাষ করেছেন। তার নাগা মরিচসহ এ পর্যন্ত সর্বসাকুল্যে ব্যয় হয়েছে ৪লক্ষ টাকা। এ পর্যন্ত শুধু মাত্র নাগা মরিচ বিক্রি হয়েছে ১৪ লক্ষ টাকা। সুর্য্যমুখি থেকে ২০ থেকে ২৫ হাজার এবং ভুট্রা থেকে আরও ২লক্ষ টাকা আয় হতে পারে বলে জানান এই কৃষক।

সোনাপুর গ্রামের সবচেয়ে কম বয়সী কৃষক ফখরুল ইসলাম (৩৫)। তিনি ১০ বছর থেকে কৃষিতে জড়িয়ে আছেন। এবার তিনি তার ক্ষেতে ১০ বিঘায় নাগা মরিচ ও ২বিঘায় সীম চাষ করেছেন। তার এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৪লক্ষ ৫০ হাজার টাকা এবং উৎপাদিত নাগা মরিচ থেকে বিক্রি আয় হয়েছে ১৬ লক্ষ টাকারও উপরে। সফল এ কৃষক জানালেন তার আয় থেকে এবার তিনি বাড়িতে পাকা বিল্ডিং তুলছেন।

আরজদ আলী নামক আরেকজন কৃষক জানান, তিনি ৪ বিগায় নাগা মরিচ, ৩ বিগায় ফরাস (ঝাড়সীম) ও ১ বিঘায় ভুট্রা চাষ করেছেন। সর্বসাকুল্যে ব্যয় হয়েছে ১লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা এবং উৎপাদিত ফসল থেকে বিক্রি এসেছে ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে আরও আয় হতে পারে ১২ থেকে ১৪ লক্ষ টাকা।

আলাউদ্দিন নামের একজন কৃষক ৮ বিগায় নাগা মরিচ, ২ বিঘায় তরমুজ চাষ করেছেন। নাগা মরিচে তার ব্যায় হয়েছে ৩লক্ষ ৫০ হাজার টাকা, এ পর্যন্ত বিক্রি হতে আয় হয়েছে ৪ লক্ষ টাকা, আরও ১০লক্ষ টাকা তার আয় হতে পারে । ২ বিঘা তরমুজ চাষে তার ব্যয় হয়েছে ৫০ হাজার টাকা আয় হতে পারে দেড় থেকে ২লক্ষ টাকা বলে জানান তিনি।

আ. নুর ৫ বিঘায় নাগা মরিচ ও ১ বিঘা সুর্য্যমুখি চাষ করেছেন। খরচ হয়েছে ১লক্ষ ৮০ হাজার টাকা। এ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ৩লক্ষ টাকা এবং তার এখান থেকে অবশিষ্ট আয় হতে পারে আরও ৭ থেকে ৮লক্ষ টাকা।

একই গ্রামের বশির উদ্দিন, আলাউদ্দিন, বোরহান উদ্দিন, এনাম উদ্দিন ভ্রাতৃদ্বয়রা মিলে ২ বিঘা জমিতে সরিষা, ১বিঘাতে টমেটো, দেড় বিঘাতে ফরাস (ঝাড়সীম) এবং ১ বিঘাতে ভুট্রা ফলিয়েছেন। তাদের রোপায়িত ফসলেরও বাম্পার ফলন হয়েছে। উৎপাদিত ফসলের মধ্য হতে টমেটো থেকে ২০ হাজার, ফরাস (ঝাড়সীম) থেকে ৩৫ হাজার টাকা পেয়েছেন।
উৎপাদিত সরিষা নিজেদের প্রয়োজনে রেখে দিলেও সেই সরিষার বাজারমুল্য আনুমানিক ৩০ হাজার টাকা হবে বলে জানান তারা। প্রথম বারের মতো ১ রোপায়িত ১ বিঘা জমিতে ভুট্রার বাম্পার ফলন হয়েছে। সেখান থেকেও আসবে আশানরুপ টাকা। মৌসুম শেষে তাদের রোপায়িত ফসল থেকে আরও ২ লক্ষ টাকা আয় হতে পারে বলে আশাবাদ তাদের।

সরেজমিনে পরিদর্শনকালে সোনাপুর গ্রামের আরও অগিণত কৃষকের দিনভর কৃষিতে ব্যস্ততার চিত্র চোখে পড়ে।

উপজেলা কৃষি অফিসার মো. সুলতান আলী জানান, গোয়াইনঘাটের প্রায় সব এলাকাতেই মাটি উর্বর এবং যে কোন ফসল ফলানোর উপযোগি। সোনাপুর গ্রামের মাটিও উর্বর এবং এখানকার কৃষকরা অত্যান্ত পরিশ্রমী। এই গ্রামের রবিশষ্যের যে বিপ্লব চোখে পড়ছে তা তাদেরই কষ্টার্জিত ঘামের ফসল। এখানকার কৃষকদের সার, কিটনাশক প্রয়োগে সচেতনতা তৈরীসহ তাদের যে কোন কল্যাণে আমরা উপজেলা কৃষি বিভাগ সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত আছি। তাদের সমস্যাগুলো সনাক্ত করে কৃষিতে আরও সফল হওয়ার পথ বাতলে দেয়া হচ্ছে। সরকারের বিনামুলে সার, বীজ, কিটনাশক, কৃৃষি উপকরণসহ নানা প্রনোদনা চালু আছে।সেচ সুবিধার্থে স্থানীয় হিদাইরখালের অপরিকল্পিত বাধ অপসারণ করে পানির ব্যবস্থা হলে গোয়াইনঘাটের তথা উত্তর সিলেটের কৃষি ব্যবস্থাপনায় আরও বড় অবদান রাখবে এই সোনাপুরের সফল কৃষকরা।

গোয়াইনঘাটের উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নাজমুস সাকিব জানান, গোয়াইনঘাটের কৃষি ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে সরকার আন্তরিক। সরকার সব সময় কৃষকদের পাশে আছে এবং তাদের কল্যানের জন্য যা দরকার তা গুরুত্ব সহকারে করবে। গোয়াইনঘাটের সোনাপুরের কৃষকদের সফলতার গল্প শুনেছি। তাদের সমস্যাগুলোও চিহিৃত করা হয়েছে। অচিরেই সেখানে পরিদর্শন করে তাদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয়া হবে।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ এমপি বলেন, কৃষি বান্ধব এ সরকারের সব সময় কৃষকদের পাশে ছিলো,আছে এবং থাকবে। গোয়াইনঘাটের কৃষকদের সব ধরণের সহযোগিতায় সরকার দোরগোড়ায় সেবা পৌছে দিচ্ছে। বিনা মুল্যে সার, বীজ, কিটনাশক, প্রনোদনা, বিভিন্ন ভাতা, ভুর্তকির মাধ্যমে কৃষি উপকরণ প্রদানসহ সহজ শর্তে ঋণ প্রদানও চালু আছে। আলীরগাওয়ের সোনাপুরের কৃষকদের কৃষিতে সফলতার গল্প শুনেছি, এটা অত্যান্ত এবং ইতিবাচক ভালো খবর। সড়ক নির্মাণসহ তাদের সমস্যা সমাধানে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

0Shares





Related News

Comments are Closed