তিস্তার পানি বাংলাদেশের মানুষের ন্যায্য অধিকার
এ এইচ এম ফিরোজ আলী : আমাদের পৃথিবীর চারভাগের তিন ভাগ পানি। মানুষের শরীরেও পানির অনুপাত এক রকম। পানির অপর নাম জীবন। পানি ছাড়া জীবন চলে না। পানি প্রকৃতির অংশ, কেউ তা তৈরি করেনি। “বেঁচে থাকার জন্য পানি ছাড়া প্রাণী ও উদ্ভিদের কোন উপায় নেই। সব প্রাণীর জন্য প্রয়োজন পানি। নাইজেরিয়ার এক কবির ভাষায়, রাজা ছাড়া মানুষ বাঁচে, মানুষ ছাড়া রাজা বাঁচে না, পশু ছাড়া ঘাস বাঁচে, ঘাস ছাড়া পশু বাঁচে না। প্রাণ ছাড়া পানি বাঁচে, পানি ছাড়া প্রাণ বাঁচে না”। পানি শুধু পান করার জন্য নয়, এ পৃথিবী টিকিয়ে রাখার জন্য, খাদ্য উৎপাদনের জন্য পানি অপরিহার্য। পানির এত প্রাচুর্যের মধ্যে বাস করেও পৃথিবীতে পানির জন্য হাহাকার চলছে। প্রকৃতির পানি নিয়ে রাজনীতি, দলাদলি, হিংসা বিদ্ধেষ হানাহানি হচ্ছে। পৃথিবীর যত পানি তার প্রায় ৯৭.৫ ভাগ সমুদ্রের লোনা। এ পানি ধারন করে আছে, অনেক জানা অজানা সম্পদ। বাকি আড়াই ভাগের দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি বরফ হয়ে জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাকি পানির তিন চতুর্থাংশ ভূগর্ভস্থ পানি যা এ পৃথিবীকে শুধু বাঁচিয়ে রাখেনি, তাকে অবিরাম সৃজনশীল রেখেছে। মাত্র শূণ্য দশমিক (০.৩) তিন ভাগ পানি আছে নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়, হাওর-বাওর, পুকুর ইত্যাদিতে।
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চল। নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের জীবন-জীবিকা এখন পানির জন্য অচল। ৫৮টি আন্তর্জাতিক নদী সহ কমপক্ষে ২৩০টি নদী বিধৌত এ প্লাবন ভূমি। আন্তর্জাতিক নদীগুলোর মধ্যে ৫৫টির উৎপত্তি ভারত এবং ৩টি মায়ানমার থেকে। চীন, ভারত, নেপাল, ভূটানের জন্য ভাটির দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মানুষের ভারত থেকে আসা পানির উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কৃষির জন্য প্রয়োজন পরিমিত পানি। আর স্মরনাতীত কাল থেকে এ পানি আসে উজানের দেশ ভারত থেকে ৫৫টি অভিন্ন নদী দিয়ে। দেশ বিভাগের পর থেকে ভারতের সরকারগুলো প্রতিটি নদীর উজানে একতরফা ভাবে বাঁধ দিয়ে পানি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। যে সকল নদী একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সেগুলো আন্তর্জাতিক নদী। ভারত বর্ষা মৌসুমে তাঁদের ইচ্ছামত পানি ছেড়ে দিয়ে আমাদের দেশে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি করে। চলতি বছর আগস্ট মাসে ভারত ফারাক্কা বাঁধের ১০৬টি স্লুইস গেইটের সবগুলো খুলে দিয়ে বাংলাদেশে ভয়াবহ অকাল বন্যার সৃষ্টি করে। পদ্মা ও মহানন্দা নদী ও এর শাখা-প্রশাখা দিয়ে চাপাইননবাবগঞ্জ, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুর সহ বিভিন্ন জেলায় বন্যার সৃষ্টি হয়। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি তখন ঘন্টায় ঘন্টায় বৃদ্ধি পায়। স্বাধীনতার ৪৫ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম এত উচ্চতায় পানি বইছে। এত বছরে মোট ১৮ বার পদ্মায় পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। শুষ্ক বা শীত মৌসুমে নদীগুলোর পানি আটকে বা প্রবাহ বন্ধ করে দিয়ে ভারত হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি করছে। এই ক্ষতি অংকে নির্ধারণ করার মত নয়। পানির অভাবে মানুষ পরিবেশ, উদ্ভিদ, জীববৈচিত্র এবং মানুষের জীবন-জীবিকা এখন হুমকির মুখে। বাংলাদেশ এখন নদীমাতৃক দেশ নয়। তিলে তিলে হয়ে যাচ্ছে মরুভূমির দেশ।
গত ১০ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে “তিস্তায় ভারতের সাড়া পেতে বাংলাদেশের অপেক্ষা” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদে বলা হয় ১৮ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন দিনের দ্বিপাক্ষীয় সফরে ভারত যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আকস্মিক ভাবে সফরটি স্থগিত করা হয়। আগামী জানুয়ারি বা ফেব্র“য়ারি মাসে ফের সফরটি আয়োজনের জন্য ভারতকে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের মধ্য দিয়ে অন্তত ২৫টি চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। এসব চুক্তির মধ্যে ছিল আমাদের বহু কাঙ্খিত তিস্তা চুক্তি। ভারতের মুদ্রা নীতি সহ বেশ কিছু চলমান ইস্যু নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ভারত সফরে তিস্তা চুক্তিতে মমতা সায় নাও দিতে পারেন। চলতি বছর ১৬ অক্টোবর ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম রাজ্য গোয়ায় ব্রিকসবিমসটেক সম্মেলন শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাথে একান্ত বৈঠক করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে ভারতের স্পষ্ট বক্তব্য চান শেখ হাসিনা। এ বৈঠক নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাংলা দৈনিক ‘আনন্দবাজার পত্রিকার’ এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তিস্তা চুক্তি নিয়ে দিলীর ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করছে বাংলাদেশ। মমতা তিস্তা চুক্তি নাকচ করে দিয়েছেন। পত্রিকার প্রতিবেদনে আর বলা হয়, পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য সার্ক সম্মেলন বর্জনে ভারতের সিদ্ধান্তকে প্রথম সমর্থন করেছে বাংলাদেশ। এখন বাংলাদেশ সরকারের দাবী ভারত অবিলম্বে তিস্তা চুক্তি সই করুক। নয়াদিলীর কূটনীতিকরা আনন্দবাজারকে বলেছেন মোদী তিস্তার ব্যাপারে ইতিবাচক বার্তা দেবেন শেখ হাসিনাকে। এজন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সচিব ভাস্কর খুলবেকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সাথে আলোচনার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
২০১৪ সালের ১৯ ফেব্র“য়ারি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন ভারতের পশ্চিবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। ঢাকায় তিনি বলেছিলেন, তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে একধরনের মধ্যস্ততাকারীর ভূমিকা পালন করতে চান। কূটনৈতিক প্রটোকল উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করে প্রমাণ করতে চেয়েছেন তিনি বাংলাদেশের ব্যাপারে কত আন্তরিক। দুপুরে গণভবনের খাবারে ১২ পদের মধ্যে তিন পদ ছিল ইলিশ। বাংলাদেশের ইলিশের প্রতি তার লোভ আছে তা সবাই জানেন। ভারতীয় হাই কমিশনার কর্তৃক আয়োজিত এক বৈঠকে বাংলা ভাষায়, মমতা নিজেই বলেছিলেন, “আমার ওপর আস্তা রাখুন বিশ্বাস রাখুন স্থল সীমানা চুক্তি তিস্তা চুক্তিতে তাঁর কোন আপত্তি নেই।” অবশ্য স্থল চুক্তি হলেও তিনি তিস্তা নিয়ে রাজনীতি করছেন। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন ৭টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন, তখন মমতা আসার কথা থাকলেও তিনি আসেননি। মমতার আপত্তির কারণে সে সময় তিস্তা চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি। ভারতের কেন্দ্রীয় পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী সঞ্জীব কুমার বালিয়ান এক বিবৃতিতে তিস্তা চুক্তির গ্রহণযোগ্য সমাধান খোজার চেষ্টা চলছে বলে ঢাকাকে বার্তা দিয়েছেন। মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত তাঁর দল ‘তৃণমূল কংগ্রেসের’ সাধারণ সম্পাদক পার্থ চট্টোপাধ্যায় আওয়ামীলীগের ২০তম সম্মেলনে ঢাকায় সফরকালে তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে মমতাকে রাজি করারও আশ্বাস দিয়েছিলেন। ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম.জে আকবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করে, আগামী নতুন বছরের ফেব্র“য়ারি মাসে তাকে ভারত সফরের কথা জানান। ভারতের বিগত নির্বাচনে নির্বাচনী বৈতরনী পার হওয়ার জন্য রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে তিস্তা চুক্তিতে বাধা দিয়েছিলেন মমতা। গত ২১ জুলাই বেনাপোল পেট্রাপোল সমন্বিত চেকপোষ্টের উদ্ভোধন কালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক ভিডিও কনফারেন্সে শেখ হাসিনাকে বলেছেন, জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আপনি একা নয়, যে লড়াই আপনি শুরু করেছেন তাতে গোটা ভারত আপনার পাশে আছে। ঐ দিন মমতা বন্দোপাধ্যায়ও তাঁর বক্তব্যে এই দিনকে একটি ঐতিহাসিক দিন হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, “ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্ক চিরকালের, চিরগভীর”।
বলেছিলাম তিস্তা নদীর কথা। তিস্তা নদী ভারতের সিকিম হয়ে দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ারের সমভূমি হয়ে চিলাহাটি থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে বাংলাদেশে নীলফামারী জেলার উত্তর খড়িবাড়ীর কাছে ডিমলা উপজেলার ছাতনাই দিয়ে প্রবেশ করেছে। ছাতনাই থেকে এ নদী নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, লালমনিরহাটের সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালিগঞ্জ, রংপুরের কাউনিয়া, পীরগাছা, কুড়িগ্রামের বাজারহাট, উলিপুর হয়ে চিলমারীতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়। ডিমলা থেকে চিলমারী এ নদীর বাংলাদেশের অংশে মোট ক্যাচমেন্ট এরিয়া প্রায় ১ হাজার ৭১৯ বর্গ কিলোমিটার। পাঠ্য পুস্তকের তথ্য মতে ১৯৮৭ সালের প্রবল বন্যায় তিস্তার গতিপথ পরিবর্তন হয়ে ব্রহ্মপুত্রের একটি পরিত্যক্ত গতিপথে প্রবাহিত হতে শুরু করে। তিস্তা নদীর বর্তমান দৈর্ঘ্য ১৭৭ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৩০০ থেকে ৫০০ মিটার। তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি ১৯৯৭-৯৮ সালে নির্মিত হয়। এই ব্যারেজটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পানি সংরক্ষণ, পানি নিস্কাশন, পানি সেচ ও বন্যা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের নদী কমিশন গঠনের পর তিস্তার পানির বণ্টন নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়। ১৯৮৩ সালের জুলাই মাসে দু’দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের এক বৈঠকে তিস্তার পানি বন্টন শতকরা ৩৬ ভাগ বাংলাদেশ, ৩৯ ভাগ ভারত ও ২৫ ভাগ পানি নদীর জন্য রাখার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু কোন চুক্তি হয়নি। ২০০৭ সালের ২৫,২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর তিনদিন ব্যাপী এক বৈঠকে বাংলাদেশ, তিস্তার পানির ৮০ ভাগ দু’দেশের মধ্যে বণ্টন করে বাকি ২০ ভাগ নদীর জন্য রাখার প্রস্তাব করলে ভারত তাতে রাজি হয়নি। বাংলাদেশের কোন প্রস্তাবে অতীতে মমতার সায় মেলেনি। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গের কৃষকদের কাছে তিস্তার পানি সেচ কাজের জন্য দরকার বেশি। এজন্য বরাবরই মমতা বিষয়টিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। মমতার আপত্তির কারণে তিস্তা চুক্তি বারবার হুচট খাচ্ছে।
তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ এককভাবে পানি প্রত্যাহার করে নিতে পারে না। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহার সংক্রান্ত ১৯৬৬ সালের আন্তর্জাতিক আইন সমিতির হেলসিংকি নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি অববাহিকাভূক্ত রাষ্ট্র অভিন্ন নদী সমূহ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই অন্য রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেবে। পশ্চিমবঙ্গের পানি ব্যবহারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রয়োজনকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। হেলসিংকি নীতিমালার ১৫ নং অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে প্রতিটি রাষ্ট্র তাঁর তীরবর্তী রাষ্ট্রের সীমানায় আন্তর্জাতিক পানি সম্পদের ব্যবহারের অধিকার ভোগ করবে যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। ১৯৯২ সালের ভাবলিন নীতিমালার ২নং নীতিতে বলা হয়েছে, পানি উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা অবশ্যই সবার অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে “জলপ্রবাহ কনভেনশন” নামে একটি নীতিমালা গ্রহণ করা হয়। এই নীতিমালার ৬নং অনুচ্ছেদে পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তি ও ন্যায়পরায়ণতার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ কোন আইন মানছে না।
১৯৭৫ সাল থেকে ভারত ফারাক্কার কাছে নদীর ওপর ব্যারেজ নির্মাণ করে প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক পানি সংযোগ কালের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের ভাগীরথী নদীতে প্রত্যাহার করে দিচ্ছে। তিস্তা নদীর ওপর একইভাবে গজল ডোবার কাছে একটি ব্যারেজ নির্মান করে এর পানি সেচকালের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ বিহারে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। ভারত পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরে মহানন্দার পানি দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার আত্রাই ও পূর্ণভরা নদীর পানি নদীয়ায়, ভৈরব নদীর পানি এবং উত্তর চব্বিশ পরগণায় বেথনা ও কোদলা নদীর পানি বাঁধ দিয়ে প্রত্যাহার করে। ভারত ফেনী নদীর পানি পাম্প দিয়ে তুলে, গোমতি নদীর পানি ড্যামের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে। বিজনী, খোয়াই, মনু এবং বরাক নদের কিছু উপনদী পানি জল কাঠামো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে সেচ ও শহরে জল সরবরাহের জন্য প্রত্যাহার করে। চলতি গুগল স্যাটেলাইট ম্যাপে দেখা যায় ২০১৪ সালের ১৪ এপ্রিল ভারত গজল ডোবা ব্যারেজের উজানে পাওয়া তিস্তার সমুদয় পানি প্রত্যাহার করে নিয়ে ডাহুক নদীতে ফেলে দিচ্ছে। এই ডাহুক নদী ভাটিতে ফুলহার নদীতে পড়ে তা ফারাক্কার উজানে গঙ্গা নদীতে গিয়ে পড়েছে। গুগল চিত্রে দেখা যায়, বাংলাদেশের তিস্তা নদী তিস্তা ব্যারেজের মুখে শুকিয়ে আছে।
বাংলাদেশ গঙ্গা নির্ভর এলাকায় কৃষি, মৎস্য, শিল্প, নৌপরিবহন, জল সরবরাহ এবং ভূগর্ভস্থ পানি ইত্যাদির ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে ফারাক্কা বাঁধের কারণে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ ক্ষতির পরিমান আনুমানিক প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে চাপাইননবাবগঞ্জ জেলার পশ্চিম সীমানা থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার (১১ মাইল) উজানে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার রাজমহল ও ভগবান গোলার মাঝে ফারাক্কা নামক স্থানে বাঁধ নির্মান করে। ১৯৬১ সালে বাঁধের মূল নির্মান কাজে হাত দেয়া হলে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়। ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলক ভাবে ফারাক্কা বাঁধের সব ফিডার ক্যানেল চালুর কথা বলেছিল ভারত। কিন্তু ঐ ৪১ দিনের পরিবর্তে ৪১ বছর পরও বঁাঁধটি চালু আছে। ইতিহাস থেকে জানা যায় ১৯৫১ সালের ২৯ অক্টোবর পাকিস্তান সরকার প্রথমবারের মত গঙ্গা নদী থেকে বিপুল পরিমান পানি প্রত্যাহারে ভারতীয় পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে, গঙ্গার বিষয়টি সবার নজরে আসে। ১৯৫২ সালে ভারত জানায় পরিকল্পনাটি প্রাথমিক পর্যায়। এ ঘটনা থেকে গঙ্গার পানি বণ্টন ইতিহাসের সূত্রপাত। ১৯৭০ সালে গঙ্গার পানি প্রবাহ বণ্টন ব্যাপারে বহুবার আলোচনা হয়। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইন্ধিরা গান্ধী যৌথ এক বিবৃতিতে শুকনা মৌসুমে ৪৪ হাজার কিউসেক পানি বাংলাদেশ পাওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ৩১ মে মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ১৯৭৬ সালের ২৬ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভারতকে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। তারপর ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর ৫ বছর মেয়াদি (১৯৭৭-৮২) চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ১৯৮২ সালের ৪ নভেম্বর চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হয়। ১৯৮২ ও ১৯৮৫ সালে ভারতের সঙ্গে চুক্তিটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত আর কোন গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি হয়নি। ফলে ভারত একতরফা ভাবে পানি ব্যবহার করে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবগৌড়া ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি করেন। চুক্তি অনুযায়ী ফারাক্কা পয়েন্টে পানি প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক হলে ভারত ৫০ ভাগ এবং বাংলাদেশ পাবে ৫০ ভাগ। পানি ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হলে বাংলাদেশ পাবে ৩৫ হাজার কিউসেক অবশিষ্ট পানি পাবে ভারত। পানি প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক বাংলাদেশ পাবে অবশিষ্ট অংশ। চুক্তিটি এখনও বলবৎ আছে। এসব তথ্য গণমাধ্যমের।
তিস্তার পানি বন্টনের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আমাদের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। বিষয়টি হালকা করে দেখা হলে উত্তরবঙ্গে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটবে। খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে। তিস্তার পানি পাওয়া আমাদের ন্যায্য অধিকার। এ অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে আমাদের দিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব আমাদের পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়া। মমতার আপত্তির বিষয়টি আমাদের বিবেচনার মূল বিষয় নয়। মমতা বাংলাদেশের মানুষকে ভালবাসেন, বাংলায় কথা বলেন এবং তিস্তা চুক্তির জন্য অঙ্গীকারও করেছেন। তারপরও আস্থা ও বিশ্বাসের কথা বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতি হয় এমন কিছু করবেন না বলে ইশারা ইঙ্গিত দিয়েছেন। উলেখ করা আবশ্যক যে, তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে মমতা বন্দোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের রুদ্র কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গের এই পানি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশকে ৫০ ভাগ পানি দেওয়া সম্ভব বলে সুপারিশ করেছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রণব কুমার রায়ও এই সুপারিশের সমর্থণ করেছিলেন। এর ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার ও মমতা বন্দোপাধ্যায় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এমতাবস্থায় মমতা বন্দোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তিতে সম্মতি জ্ঞাপন করবেন। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় হচ্ছে তিস্তার পানি বন্টনের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভারতের উপর কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা। কারণ আমরা ভারতের অনেক দাবী পূরণ করেছি। সীমান চুক্তি হওয়ায় দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরাট উলেখ্যযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এ সম্পর্কের মাঝে যদি মমতা বন্দোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তিতে সম্মতি না দেন তাহলে দু’দেশের মধ্যে অবিশ্বাসের জন্ম নেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশ থেকে গড়ে প্রতিদিন চিকিৎসা ভ্রমন সহ নানা কাজে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ ভারত গমন করেন। এই ভ্রমনকারীরা ভারতের অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখছেন। বাংলাদেশে বৈধভাবে ভারতের প্রায় ৫ লাখ এবং অবৈধ ভাবে আরও ২ লাখেরও বেশি লোক গার্মেন্টস, টেক্সটাইল এবং আইটি সেক্টর সহ বিভিন্ন ভাবে কাজ করছেন। তাঁরা বছরে ৩০ হাজার কোটি টাকা ভারতে পাঠান। বিদেশ থেকে ভারতীয়রা যে পরিমান অর্থ ভারত পাঠান, সেই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তি ভারতের সমতূল্য না হতে পারে, তবে যা আছে তা থেকে ভারত অবজ্ঞা করার মত নয়। সামাজিক সূচকে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। তিস্তার পানি পাওয়া বাংলাদেশের মানুষের ন্যায্য অধিকার। ভারতকে সেটা বিবেচনা করতে হবে। তিস্তা চুক্তি হলে দু’দেশের সম্পর্ক যেমন বজায় থাকবে, তেমনি উভয় দেশ অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হবে। বিষয়টি ভারতকেই বিবেচনা করতে হবে।
লেখক: কলামিস্ট
Related News
স্ত্রীর আয় নয়, সংকট পুরুষের পুরোনো পরিচয়ে
হক মোঃ ইমদাদুল: একটি সংসারে স্ত্রী যখন স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করতে শুরু করেন, তখনRead More
অবক্ষয়ের চিত্র সর্বত্র মূল্যবোধের সংকট ও আমাদের ভবিষ্যৎ
আতিকুর রহমান নগরী: আজকাল মোবাইলের স্কিন কিংবা খবরের কাগজে চোখ বুলালেই যে সংবাদে চোখ আটকেRead More



Comments are Closed