Main Menu

অবক্ষয়ের চিত্র সর্বত্র মূল্যবোধের সংকট ও আমাদের ভবিষ্যৎ

Manual4 Ad Code

আতিকুর রহমান নগরী: আজকাল মোবাইলের স্কিন কিংবা খবরের কাগজে চোখ বুলালেই যে সংবাদে চোখ আটকে যায়, গলার পানি শুকিয়ে যায়, মনুষ্যত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। সেগুলো হলো হত্যা, খুন। নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা, আইনের প্রতি অবিচল শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য। এ তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার কথা একটি নিরাপদ ও প্রগতিশীল সমাজের। কিন্তু বাস্তবে বিপরীতভাবে চলছি আমরা।

Manual7 Ad Code

তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্তপাতের সংবাদ আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। সামান্য কথা-কাটাকাটি বা ক্ষুদ্র স্বার্থের দ্বন্দ্বেও যখন মানুষ অন্য মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে দ্বিধা করে না, তখন বুঝে নিতে হয়, আমরা এক গভীর নৈতিক ও মানসিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।

Manual8 Ad Code

অথচ কুরআনে কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল; আর যে একজনকে বাঁচাল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে বাঁচাল। (সূরা মায়িদা: ৩২)
আফসোস, আজ বাঁচানোর চেয়ে প্রাণে মারার নগ্ন প্রতিযোগিতা চলছে আমাদের সমাজে।

আর রাসূলের হাদিস অনুসন্ধান করলে আমরা দেখতে পাবো সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহর মধ্যে অন্যায়ভাবে হত্যাকে অন্যতম বলে উল্লেখ করেছেন। (সহিহ বুখারি: ২৭৬৬, সহিহ মুসলিম: ৮৯)

Manual3 Ad Code

অন্যদিকে সহিহ মুসলিম শরীফে ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীয়ে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে বিষয়ে বিচার করা হবে তা হলো রক্তপাতের বিষয়াদি। (সহিহ মুসলিম: ১৬৭৮)

এরপরও কেন নৈতিকতার এতো অধঃপতন। এর শেকড়ে কী আছে। সমাজবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ বলছে, সহিংসতা ও অস্থিরতার এই জোয়ারের নেপথ্যে কাজ করছে গভীর অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক দুর্বলতা। মানুষের মধ্যে সহনশীলতা ও ধৈর্যের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে কমে আসছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য এবং ন্যায়বিচারের অভাব সাধারণ মানুষের মনে জমিয়ে তুলেছে গভীর ক্ষোভ। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হলো ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’। অপরাধী যখন কোনোভাবে পার পেয়ে যায় কিংবা বিচারপ্রক্রিয়া অহেতুক দীর্ঘায়িত হয়, তখন সমাজে জন্ম নেয় আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক বিপজ্জনক প্রবণতা—যা একদিকে অপরাধীকে করে তোলে আরও দুঃসাহসী, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি জন্ম দেয় চরম আস্থাহীনতা।

মূল্যবোধের ক্ষয় ও প্রযুক্তির প্রভাব:
এই সামাজিক অবক্ষয়ের পেছনে পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ শিক্ষার ঘাটতিও কম দায়ী নয়। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ আমাদের বাহ্যিক জীবনযাত্রাকে সহজ করলেও, ভেতরে-ভেতরে ঠেলে দিয়েছে এক যান্ত্রিক ও নিঃসঙ্গ জীবনের দিকে। স্ক্রিন-নির্ভরতায় আচ্ছন্ন আমাদের তরুণ প্রজন্ম ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে সহমর্মিতা, ত্যাগ ও সহনশীলতার মতো মৌলিক মানবিক গুণাবলি থেকে। পারিবারিক পরিসরে শিষ্টাচার চর্চা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস দিন দিন বিলুপ্তির পথে। ফলে সামান্য দ্বিমত বা দ্বন্দ্ব দেখা দিলেই তা আলোচনার টেবিলে সমাধানের বদলে গড়ায় সহিংসতায়।

প্রয়োজন সম্মিলিত প্রয়াস:
এই অন্ধকার ও নৈরাজ্যময় পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা কোনো একক পক্ষের একার দায়িত্ব নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ ও পারিবারিক কাঠামোর সমন্বিত প্রয়াস:

আইনের শাসন নিশ্চিতকরণ:
অপরাধীর রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় যা-ই হোক না কেন, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কেবল আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগই পারে অপরাধপ্রবণতা কমাতে এবং মানুষের মনে হারানো স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে।
পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার পুনর্জাগরণ: পরিবারই মানবিক গুণাবলি অর্জনের প্রথম পাঠশালা। সন্তানদের কেবল একাডেমিক সাফল্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিকতা, সহনশীলতা ও অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধে গড়ে তুলতে হবে।

ইতিবাচক নেতৃত্ব ও সচেতনতা বিনির্মাণ:
রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বকে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিহার করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলতে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি তরুণদের সুস্থধারার খেলাধুলা, সংস্কৃতিচর্চা ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা জরুরি।
প্রতিদিন স্বজন হারানোর আর্তনাদে বাতাস ভারী হয়ে উঠবে। এমন সমাজ কারোরই কাম্য নয়। একটি রক্তপাতহীন, নিরাপদ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলাই আজকের সবচেয়ে জরুরি দাবি। রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজ যদি এখনই এই নৈতিক পতন ও সামাজিক ব্যাধি রোধে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই অস্থিরতার আগুন একদিন গ্রাস করবে আমাদের সবার ভবিষ্যৎকেই।

লেখক: আলেম, সাংবাদিক

Manual8 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code