লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি সুনামগঞ্জের ১২ যুবক, মুক্তিপণ দাবি
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: ইতালি গিয়ে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্নে বাড়ি ছেড়েছিলেন সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ১৩ যুবক।
মানবপাচারকারীদের সঙ্গে জনপ্রতি ১৩ থেকে ১৪ লাখ টাকায় চুক্তি করে তারা অবৈধপথে বিদেশে পাড়ি জমান। কিন্তু ইতালি পৌঁছানোর আগেই লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন তাদের ১২ জন। আরেকজন বর্তমানে লিবিয়ার পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।
জানা গেছে, গত ১২ দিন ধরে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে একটি মাফিয়া চক্রের হাতে আটক রয়েছেন ওই ১২ যুবক। জিম্মিকারীরা তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালাচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলে নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে প্রত্যেকের পরিবারের কাছ থেকে ২৬ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে।
স্বজনদের অভিযোগ, জিম্মিকারীরা বাংলা ভাষাভাষী লোকদের দিয়ে ফোনে কথা বলাচ্ছে এবং বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে বলছে। জিম্মিদের মধ্যে ১০ জনের বাড়ি জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাঁক ইউনিয়নের নাজিমনগর গ্রামে।
জিম্মি থাকা যুবকেরা হলেন— জীবন মিয়া (২৫), আব্দুল কাইয়ুম (২৬), মনিরুল ইসলাম (২৪), মামুন মিয়া (২৭), আতাউর রহমান (২৮), এনামুল হক (২৬), আতাউর রহমান (২৯), আমিনুল ইসলাম (২৫), সফিকুল ইসলাম (৩২) ও নিলয় মিয়া (২২)। এছাড়া জামালগঞ্জ উপজেলা সদরের তেলিয়াপাড়া এলাকার আবুল হামজা ও সাচনা গ্রামের আবুল কালামও জিম্মি আছেন। তাদের সঙ্গে দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া গ্রামের সোহেল মিয়াও একই ঘটনায় আটক রয়েছেন। অন্যদিকে নুরু মিয়ার বড় ছেলে ইয়াছিন মিয়া (৩০) বর্তমানে লিবিয়ার পুলিশের হাতে আটক রয়েছেন।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৮ জানুয়ারি ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন তারা। প্রথমে তাদের আবুধাবি নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে কুয়েত, এরপর কুয়েত থেকে মিশর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি লিবিয়া থেকে ইঞ্জিনচালিত ছোট নৌকায় সাগরপথে ইতালি পাঠানোর আগে একটি চক্র তাদের জিম্মি করে।
এরপর থেকেই শুরু হয় নির্যাতন। প্রতিদিন পরিবারের সদস্যদের মোবাইলে ভিডিও কলে নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে টাকা দাবি করা হচ্ছে। প্রথমে জনপ্রতি ২৬ লাখ টাকা দাবি করা হলেও পরে দরকষাকষির পর ১২ লাখ টাকা দিলে তাদের ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে জিম্মিকারীরা।
জিম্মি সফিকুল ইসলামের বাবা রাশিদ আলী বলেন, “দ্বিতীয় রোজার দিন ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল। এরপর আর কোনো খবর পাইনি। জায়গা-জমি বিক্রি করে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। এখন টাকা-পয়সা কিছুই নেই, আল্লাহর উপরই ভরসা।”
জীবন মিয়ার বাবা নুরু মিয়া বলেন, “গ্রামের কয়েকজনকে বিশ্বাস করে এত টাকা দিয়েছিলাম। এখন টাকা গেল, ছেলের জীবনও ঝুঁকিতে পড়েছে। ধারণা করছি, দালালরা ঠিকমতো টাকা না দেওয়ায় এমন ঘটনা ঘটেছে।”
আতাউর রহমানের বড় ভাই হারুন মিয়া বলেন, “অনেক কষ্ট করে টাকা জোগাড় করে দালালকে দিয়েছিলাম। এখন আবার ১২ লাখ টাকা করে চাওয়া হচ্ছে। পরিবারগুলো গরু-ছাগল বিক্রি করে ও ঋণ নিয়ে টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করছে।”
ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য একরাম হোসেন বলেন, “গ্রামের ১০ জন একসঙ্গে জিম্মি আছে। আমার আত্মীয়স্বজনও তাদের মধ্যে রয়েছেন। পুরো গ্রাম এখন উদ্বেগ ও কান্নায় ভেঙে পড়েছে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দিলোয়ারা বেগম প্রথমে বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও পরে তা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমরা কাউকে বিদেশে পাঠাই না। গ্রামের অনেকেই গেছে, তাদের মধ্যে আমাদের আত্মীয়ও আছে।”
এ বিষয়ে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুশফিকুন নুর বলেন, “এ বিষয়ে কেউ সরাসরি কোনো অভিযোগ করেননি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি দেখেছি। বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশে গিয়ে কেউ বিপদে পড়লে সরকার ব্যবস্থা নিতে পারে। তবুও বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।”
স্বজনদের দাবি, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে জিম্মিদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হোক এবং মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
Related News
মিশরে ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার ২৯ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে
Manual1 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিস যাওয়ার পথে দিকভ্রান্তRead More
ভূমধ্যসাগর ট্রাজেডি: শান্তিগঞ্জের নিখোঁজ ৭ যুবকের পরিচয় মিলেছে
Manual2 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: লিবিয়া থেকে নৌপথে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জRead More



Comments are Closed