Main Menu

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট: জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের সুযোগ ও সরকারের প্রস্তুতি

Manual1 Ad Code

মো. আকিকুর রেজা: ১১ ডিসেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। তফসিল অনুযায়ী আগামি ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল আকাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এদিন একইসাথে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। তবে এ ঘোষণার ৯ দিনের মাথায় তফসিলে কিছু সংশোধন এনেছে নির্বাচন কমিশন। সংশোধিত তফসিল অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল ২৯ ডিসেম্বর। নির্ধারিত সময়ে ৩০০ টি সংসদীয় আসনে ২ হাজার ৫৮২ টি মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের কাজ। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়েরের সময়সীমা ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে। প্রার্থীতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২০ জানুয়ারি। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করা হবে ২১ জানুয়ারি। ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়ে চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাতটা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ করা হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।

Manual2 Ad Code

এবারের নির্বাচন বিভিন্ন কারণে ব্যতিক্রমধর্মী, সে সাথে গুরুত্বপূর্ণও বটে। এদেশের মানুষ দীর্ঘ সতের বছর পর ভোট দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। কাগজে কলমে এ সতের বছরে তিনটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সেগুলোকে ‘ইলেকশন’ না বলে ‘সিলেকশন’ বলাই শ্রেয়। এতবছর পর ভোট দেয়ার এ সুযোগ এমনি এমনি আসেনি। ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্ট জুড়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ফসল এ নির্বাচনী তফসিল। যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এ গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল তার কতটুকু পূরণ হবে সেটির ফয়সালাও হবে ফেব্রুয়ারির এ নির্বাচনে। দেশের মানুষের কাছে সুযোগ এসেছে নিজেদের ভবিষ্যতের গতিপথ ঠিক করে দেয়ার।

Manual3 Ad Code

ইতিহাসে প্রথমবারের মত এবার জাতীয় নির্বাচনের সাথে একইদিন গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশে তিনটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে যার দুটি ছিল প্রশাসনিক এবং একটি সাংবিধানিক। তবে এবারের গণভোট এত সরল নয়। প্রধান উপদেষ্টার ভাষায়, এবারের গণভোটের প্রভাব হবে শতবর্ষব্যাপী। এমনটি বলা অযৌক্তিক নয়। গণভোটের বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এবারের গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতার পর থেকে চলে আসা রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সিস্টেমই পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে খোলা চোখে বিচার করলে বলা যায়, এ অভ্যুত্থান ৫৪ বছর ধরে চলে আসা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ এ ব্যবস্থা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, প্রত্যাশার খুব সামান্যই পূরণ করতে পেরেছে। এর প্রেক্ষিতেই গত ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত হয় জুলাই সনদ। তবে এ সনদের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। এ বিষয়গুলো নিয়েই এবারের গণভোট। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গঠন, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও উচ্চকক্ষের গঠন, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, জুলাই সনদে বর্ণিত সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন – এ বিষয়গুলোর মীমাংসা হবে এবারের গণভোটে।

সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখটি নিঃসন্দেহে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ নিয়ে অপেক্ষা করছে। একইসাথে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট এমনিতেই চ্যালেঞ্জিং। এর সাথে নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে যে কিছু গ্রুপ সক্রিয় আছে তা বলা বাহুল্য। কাজেই এ নির্বাচনকালীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ। ইতোমধ্যে তফসিল ঘোষণার পরদিনই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নির্ভীক সৈনিক ও ঢাকা-৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেয়া তরুণ ওসমান হাদীর উপর নৃশংস গুলিবর্ষণ ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুবরণ দেশবাসীকে কাঁদিয়েছে। এটি বলাই যায়, এ ঘটনা নির্বাচন কমিশনের কাজ আরো কঠিন করে দিয়েছে। এর সাথে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম একটি উদ্দেশ্যই ছিল দেশে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার করা। নির্বাচনের সাথে জড়িত সকল প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বয় করার উপরই নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের সাফল্য।

গণভোট আয়োজনের চ্যালেঞ্জ অবশ্য ভিন্নরকম। গণভোটের সাথে এদেশের মানুষ পরিচিত নয়। সর্বশেষ গণভোট হয়েছিল নব্বই এর দশকের শুরুতে। গণভোট নিয়ে যেমন ভোটারদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে তেমনি গণভোটের বিষয়বস্তুও সব স্তরের ভোটারদের কাছে বোধগম্য নয়। রাজনীতি সচেতন কিংবা শিক্ষিত তরুণ ভোটারদের গণভোট ও এর বিষয়বস্তু নিয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকলেও নারী ও প্রান্তিক ভোটারদের এ বিষয়ে ধারণা প্রায় নেই বললেই চলে। আর এমন ভোটারদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়, বরং এদের সংখ্যাই বেশি। এমন ভোটারদের ভোটে শতবর্ষব্যাপী প্রভাব রাখতে যাওয়া একটি গণভোটের সিদ্ধান্ত আসুক এটি নিশ্চই কারোর কাম্য নয়। এদেশের লাখ লাখ গৃহবধূ যারা রাজনীতি নিয়ে কোন আগ্রহই রাখেন না, খেটে খাওয়া মানুষ যাদের দিন শেষ হয় দুবেলা আহার যোগাড়ের চিন্তায়, উত্তরবঙ্গের কৃষক, ভাটির জেলে কিংবা সিলেটের চা শ্রমিকরা জুলাই সনদ সম্পর্কে কতটুকু জানে? তাহলে তারা কীভাবে গণভোটে তাদের মতামত দিবে? হয়ত তারা কিছু না জেনে না বুঝেই স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা যেভাবে বলবে সেভাবেই ভোট দিবে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। গণভোটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আরও একবার সময় এসেছে তরুণদের দায়িত্ব নেয়ার। যত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই হোক না কেন, প্রতিটি কমিউনিটি থেকেই অন্তত একজন হলেও সব প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়েছে, রাজনীতি সচেতন হয়েছে। তাদের উচিত নিজ নিজ কমিউনিটিতে গিয়ে জুলাই সনদ ও গণভোটের বিষয়টি বুঝিয়ে বলা। নিজ পরিবারে বাবা-মা, দাদা-দাদী কিংবা রাজনৈতিকভাবে অসচেতন সদস্যদেরকে সচেতন করে তোলা। যুগান্তকারী পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আসা গণভোটে একজন ভোটারকেও যেন অন্ধভাবে ভোট দিতে না হয়।

Manual8 Ad Code

সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ বেশ আশাব্যঞ্জক। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মত প্রবাসীদের ভোট দেয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে সরকার। যাদের রেমিটেন্সে এদেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরে, এতবছর তাদের কোন রাজনৈতিক মতামত দেয়ার সুযোগ ছিল না। Postal Vote BD অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইনে নিবন্ধন করে প্রবাসীরা এবার ভোট দিতে পারবেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। নিজ ভোটার এলাকার বাইরে অবস্থানকারী কিংবা নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীও এতদিন ভোট দেয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। এই অ্যাপের মাধ্যমে এবার তারাও ভোট দেয়ার সুযোগ পাবে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ অ্যাপে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা সাড়ে দশ লাখ ছাড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, জেলখানা বা আইনি হেফাজতে থাকা ভোটারদেরকেও ‘ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোটিং (আইসিপিভি)’ পদ্ধতিতে ভোটদানের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। মোট কথা, সরকার এবার সকল ভোটারকেই ভোট দেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচারণাতেও সরকার বেশ সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রতিটি বিভাগে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন ও প্রচারণায় সমন্বয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে মাঠ পর্যায়ের সকল সরকারি দপ্তর, কলেজের অধ্যক্ষ, মসজিদের ইমাম, এনজিও, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে নির্বাচনের উদ্বুদ্ধকরণ প্রচার কার্যক্রম জোরদারে জেলা তথ্য অফিসগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তথ্য অফিসগুলো প্রচার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনী প্রচারে গণভোটকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নবীন ভোটার, নারী ভোটার, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও প্রান্তিক ভোটারদের উৎসাহিত করতে অঞ্চলভিত্তিক জনপ্রিয় সঙ্গীত তৈরি ও প্রচারের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে গণভোট বিষয়ে অঞ্চলভিত্তিক ১০ টি সঙ্গীত রচনা করা হয়েছে। এছাড়া তথ্য অফিসগুলো ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে উঠান বৈঠক, চলচ্চিত্র প্রদর্শন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘ভোটালাপ’ ও গ্রামের ছোট ছোট বাজারে ‘টেন মিনিট ব্রিফ’ কর্মসূচির মাধ্যমে গণভোট বিষয়ে প্রচারপত্র ও লিফলেট বিতরণ করার পাশাপাশি জনগণকে প্র্যাকটিক্যাল ডেমনস্ট্রেশন দেখাচ্ছে। এর সাথে নির্বাচন কমিশন, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় মাঠ পর্যায়ে প্রচারের জন্য বিজ্ঞাপন, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও বিভিন্ন ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করেছে।

নির্বাচনী প্রচারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ‘ভোটের গাড়ি’। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষ্যে ভোটারদের সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করতে ২২ ডিসেম্বর এ কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয়। নির্বাচনী প্রচারণার উদ্দেশ্যে সারাদেশে মোট ১০ টি ‘ভোটের গাড়ি’ পরিচালনা করবে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। তথ্য অফিস, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ প্রচারণা পরিচালিত হবে।

Manual3 Ad Code

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের চাবি জনগণের হাতে তুলে দিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টাই করছে। নবীন ভোটার, নারী ও প্রান্তিক ভোটারদের নির্বাচনে অন্তর্ভূক্ত করা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার চ্যালেঞ্জ উতরে গিয়ে সরকার একটি স্বচ্ছ নির্বাচন উপহার দিবে এটিই সকলের প্রত্যাশা। কারণ এ নির্বাচনের উপরই নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যত, গণতন্ত্রের গতিপথ ও জনগণের প্রত্যাশার মূল্যায়ন। পুরোনো বন্দোবস্তে স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবেই দেশ পরিচালিত হবে নাকি নতুন বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াবে, জনগণ সে সিদ্ধান্তই নিবে এ নির্বাচনের মাধ্যমে। (পিআইডি ফিচার)

লেখক: তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, সিলেট।

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code