কবি, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ মহিউদ্দিন শীরু স্মরণ: এক বহুমুখী আলোকিত মানুষ
আনোয়ার হোসেন রনি: আজ কবি, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ মহিউদ্দিন শীরুর মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, সাংবাদিক, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ এবং সমাজসেবক—যিনি আজীবন মানবিক মূল্যবোধ, সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার আলোয় জীবনকে আলোকিত করেছেন। তাঁর জীবন ছিল কর্ম ও আদর্শের সমন্বয়ে গড়া এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা আজও সিলেটের সাহিত্য-সাংবাদিকতার অঙ্গনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। শৈশবের স্মৃতিতে এক আলোকিত মানুষ শীরু ভাই—এই নামেই তাঁকে ডাকতাম শৈশবে। লেখালেখির সুবাদে তাঁর সাথে পরিচয় হয়েছিল, যা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল গভীর আত্মিক সম্পর্কে রূপান্তরিত। তিনি ছিলেন স্নেহশীল, সহজ-সরল, অথচ দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর স্নেহমাখা উপস্থিতি আজও আমার হৃদয়ের গভীরে অমলিন হয়ে আছে। মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলোর কথা, যখন তাঁর সান্নিধ্যে থেকে আমি প্রেরণা পেয়েছিলাম—লেখালেখি হোক কিংবা সামাজিক দায়িত্ববোধ, সর্বত্রই তিনি ছিলেন আলোকবর্তিকা।
শিক্ষাজীবন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা মহিউদ্দিন শীরু ছিলেন বালাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ। শিক্ষকতা তাঁর কাছে ছিল শুধু পেশা নয়, ছিল নেশা। তিনি বিশ্বাস করতেন—শিক্ষক শুধুমাত্র জ্ঞান বিতরণকারী নন, বরং একজন দিকনির্দেশক, যিনি ছাত্রদের চরিত্র গঠন ও মূল্যবোধ সঞ্চার করেন। ছাত্র-শিক্ষকদের কাছে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার প্রতীক। সততা, সাহস আর দূরদর্শিতা দিয়ে তিনি শিক্ষাঙ্গনে এক বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে ফুটে উঠত দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতা।
রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ শিক্ষকতার পাশাপাশি রাজনীতির সাথেও জড়িত ছিলেন মহিউদ্দিন শীরু। তবে তাঁর রাজনীতি ছিল জনকল্যাণকেন্দ্রিক। তিনি সর্বদা জনগণের কথা বলতেন, জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতেন। সততা ও সাহসের কারণে তিনি রাজনীতিতেও ছিলেন শ্রদ্ধাভাজন। তাঁর দূরদর্শিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।
সাংবাদিকতায় একসাথে পথচলা পরবর্তীতে সাংবাদিকতায় যুক্ত হওয়ার পর শীরু ভাইয়ের সাথে আমার পেশাগত সম্পর্ক আরও গভীর হয়। তাঁর কর্মশৈলী ছিল একেবারেই আলাদা।
সাংবাদিকতা তাঁর কাছে কেবল একটি পেশা ছিল না, বরং সত্য ও ন্যায়ের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠার একটি অঙ্গীকার ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব হলো জনগণের পক্ষে কথা বলা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং সমাজে সৎ চিন্তার চর্চা ছড়িয়ে দেওয়া। তাঁর লেখা প্রতিবেদনগুলোতে প্রতিফলিত হতো সমাজচিন্তা, ন্যায়বোধ ও প্রখর বিশ্লেষণ। তিনি ছিলেন সেই সাংবাদিক, যিনি কখনও আপস করেননি সত্যের সাথে।
সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় অবদান কবি হিসেবে মহিউদ্দিন শীরু ছিলেন সমাজমনস্ক। তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে মানবপ্রেম, প্রকৃতির সৌন্দর্য, স্বাধীনতার চেতনা এবং সাধারণ মানুষের সংগ্রামের গল্প। তাঁর কবিতায় কেবল সৌন্দর্যের চিত্রই নয়, বরং সমাজের অসঙ্গতি ও বাস্তবতাও জায়গা পেয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন—কবিতা কেবল অনুভূতির প্রকাশ নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ারও হতে পারে। সাংবাদিকতার মতো সাহিত্যেও তিনি ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের কণ্ঠস্বর। সিলেটের সাহিত্য-সাংবাদিকতার অঙ্গন তাঁকে আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য মহিউদ্দিন শীরুর ব্যক্তিত্ব ছিল সহজ-সরল অথচ দৃঢ়চেতা। তিনি ছিলেন সবার প্রতি স্নেহশীল, পরিশ্রমী এবং নীতিবান। সামাজিক, সাংস্কৃতিক কিংবা রাজনৈতিক—যে অঙ্গনেই তিনি সক্রিয় ছিলেন না কেন, তাঁর আন্তরিকতা তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।
মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং দায়িত্বশীলতা ছিল তাঁর জীবনের মূল শক্তি। সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে তিনি ছিলেন আস্থার প্রতীক।
অমলিন স্মৃতি ও প্রার্থনা আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। সাংবাদিকতা, সাহিত্য, শিক্ষকতা—প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন অমলিন স্মৃতি। তিনি না থাকলেও যেন আজও আমাদের মাঝে বিরাজ করছেন তাঁর কর্ম, আদর্শ ও স্নেহমাখা উপস্থিতি দিয়ে। তাঁর জীবন আমাদের জন্য এক শিক্ষা, এক অনুপ্রেরণা। আমরা যদি তাঁর মতো সততা, মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতার পথে চলতে পারি, তবে সেটাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন। আমার একটাই প্রার্থনা—আল্লাহ যেন প্রিয় শীরু ভাইকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। আমিন।
Related News
জালালপুরে সিলেটি পাঠাগার-এর শুভ উদ্বোধন
Manual1 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুরে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মুক্তপাঠRead More
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী আজ
Manual1 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: বিদ্রোহ, প্রেম, সাম্য আর মানবতার অবিনাশী উচ্চারণে বাংলা সাহিত্যকেRead More



Comments are Closed