গোয়াইনঘাট সীমান্ত দিয়ে ওপারে যাচ্ছে রসুন, এপারে আসছে গরু, মহিষ, চিনিসহ নানা প্রসাধনি
এম এ মতিন, গোয়াইনঘাটঃ স্বৈরশাসকের পতনের পর সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ ছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আবারও সক্রিয় হন চোরাকারবারিরা। সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা জানান, বর্তমানে গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী অন্তত কুড়িটি স্থান দিয়ে চোরাই পণ্য দেদারসে দেশে প্রবেশ করছে। আর প্রতিদিন অর্ধকোটি টাকা মূল্যের রসুন যাচ্ছে ওপারে।
চোরাকারবারিরা ভারতের কিছু ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করে চোরাই পথে গভীর রাত থেকে ভোরবেলা পর্যন্ত গরু, মহিষ, চিনিসহ নানা প্রসাধনি পণ্য আনছেন। এসব পণ্য স্থানীয়ভাবে ‘বুঙ্গার মাল’ নামে পরিচিত। এই ‘বুঙ্গার মালে’ সয়লাব এখন সিলেটের বাজার। সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রবেশ করছে গরু, মহিষ ও চিনি।
চোরাকারবারিদের নিয়োগ করা শ্রমিকেরা দিন-রাত সুযোগ বুঝে ৫০ কেজির চিনির একেকটা বস্তা মাথায় করে সীমান্ত পার করেন। পরে নৌকা, মোটরসাইকেল কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা দিয়ে বিভিন্ন স্থানে মজুত করা হয়। এরপর একশ্রেণির ব্যবসায়ীদের তৎপরতায় এসব চিনি সিলেট নগরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়। একইভাবে প্রসাধনসামগ্রী, কাপড়, মাদক, আপেল, কম্বলসহ বিভিন্ন পণ্য আসছে।
এ ব্যাপারে সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি) এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ হাফিজুর রহমান পিএসসি বলেন, উর্ধ্বতন সদরের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমান্তে নিরাপত্তা রক্ষা ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি’র আভিযানিক কার্যক্রম ও গোয়েন্দা তৎপরতা সর্বোতভাবে অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সীমান্তবর্তী এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে এবছরের জুলাই থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চোরাচালানী ১০২ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯২ টাকা মূল্যের মালামাল জব্দ করা হয়েছে।
চোরাকারবারিদের দেওয়া তথ্যমতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে চিনিসহ চোরাচালান সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাদের হাতে। ক্ষমতার পালাবদলের পর সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নেন অন্য একটি রাজনৈতিক দলের কিছু নেতা-কর্মী। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় সীমান্ত এলাকা থেকে চিনিসহ চোরাই পণ্য ট্রাক কিংবা পিকআপে করে এনে সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হচ্ছে। এর বিনিময়ে তাঁরা মোটা অঙ্কের টাকা নিচ্ছেন। কয়েকজন চোরাকারবারির ভাষ্য, গোয়াইনঘাটের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে আগে প্রতিদিন গড়ে কোটি টাকা মূল্যের গরু, মহিষ ও চিনি আসত। বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমেছে। চোরাই পথে আসা গরু, মহিষ ও চিনি তামাবিল-জৈন্তাপুর-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক, খাগাইল-তোয়াকুল সড়ক, সালুটিকর-গোয়াইনঘাট সড়ক এবং গোয়াইনঘাট-সারীঘাট সড়ক দিয়ে সিলেট মহানগরীর পাইকারি বাজার কালীঘাটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। মহাসড়ক দিয়ে এখন প্রতি ট্রাক চিনি ৫ থেকে ৮ হাজার টাকায় পার করিয়ে দিচ্ছে কয়েকটি সিন্ডিকেট। একইভাবে অন্যান্য পণ্যের প্রকার অনুযায়ী ট্রাক প্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চিনি ব্যবসায়ী বলেন, আগে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁদের অনুসারীরা মহাসড়ক দুটিতে পাহারা দিয়ে প্রতিদিন মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত চোরাই চিনির ট্রাক শহরে ঢোকাতেন। এখনকার সিন্ডিকেটটি নিজেদের একটি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী বলে পরিচয় দিচ্ছে।
পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেটে ভারত থেকে চোরাই পথে সাধারণত চিনিই বেশি আসে। এর বাইরে বেশি আসে প্রসাধনসামগ্রী, বিভিন্ন ধরনের মাদক ও গরু। তবে সম্প্রতি আপেল ও কম্বল আসার ঘটনাও ঘটছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের চকলেট, চা-পাতা, বিস্কুট, কোমল পানীয়, হরলিকস, কাজুবাদাম, নানা ধরনের ক্রিম, স্পোর্টস বুট জুতা, পাতার বিড়িসহ বিভিন্ন পণ্য আসছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, বিজিবি ও পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। এ ছাড়া র্যাব-৯ চোরাই মাদকদ্রব্য উদ্ধারে কাজ করছে। এর পরও কিছু চক্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে চোরাচালান চালাচ্ছে। তবে চক্রের সদস্যরা নিয়মিত গ্রেপ্তারও হচ্ছেন।
সিলেট নগরের পাইকারি বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সম্প্রতি ভারতে রসুন পাচারের ঘটনা বেড়েছে। কালীঘাট এলাকা থেকে রসুন কিনে নিয়ে একশ্রেণির ব্যবসায়ী সীমান্তবর্তী এলাকায় বিক্রি করছেন। পরে সেসব রসুনই চোরাকারবারিরা ভারতে পাচার করছেন। বিশেষ করে গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্ত দিয়ে রসুন বেশি পাচার হয়। ওই ব্যবসায়ীরা জানান, আগে সিলেটে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে রসুন বিক্রি হতো। এখন সেই রসুনের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২০ টাকা। সেসব রসুনই ভারতের বিভিন্ন খোলাবাজারে এখন ৩৮০ থেকে ৪০০ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে। লাভের পরিমাণ বেশি হওয়ায় রসুন পাচার ক্রমে বাড়ছে।
শুধু চোরাচালান নয়, বিএনপি কিংবা সহযোগী সংগঠনের যে কারও বিরুদ্ধে অনৈতিক অভিযোগের প্রমাণ পেলে সর্বোচ্চ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম আহমদ। তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির সিলেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতারা প্রশাসনের সঙ্গে দেখা করে বলেছি, এই ব্যাপারে (চোরাচালান) বিএনপির কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। আমাদের (বিএনপি) কেউ তদবির করলে তাকেও যেন আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়।’
বুঙ্গার চিনি’সহ চোরাই পণ্য জব্দ করতে পুলিশ শক্ত অবস্থানে আছে দাবি গোয়াইনঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ সরকার তোফায়েলের। তিনি বলেন, ‘এরই মধ্যে চোরাচালানবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করেছি। চোরাকারবারিদের ধরার পাশাপাশি যেসব সন্ত্রাসী রাস্তায় চোরাই চিনি ছিনতাই বা চোরাচালানে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
Related News
গোয়াইনঘাটে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তির রহস্যজনক মৃত্যু
Manual1 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার হাদারপার বাজারে তৃতীয় লিঙ্গের এক ব্যক্তিরRead More
জৈন্তাপুরে সারী-গোয়াইন এফসিডিআই পানি ব্যবস্থাপনা এসোসিয়েশনের নির্বাচন সম্পন্ন
Manual7 Ad Code জৈন্তাপুর প্রতিনিধি: সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার সারী-গোয়াইন এফসিডিআই পানি ব্যবস্থাপনা এসোসিয়েশন ত্রি-বার্ষিক নির্বাচন-২০২৬Read More



Comments are Closed