Main Menu

সুনামগঞ্জ সীমান্তে চোরাই পথে আসছে কোটি টাকার চুনাপাথর

হাবিব সরোয়ার আজাদ, সুনামগঞ্জ থেকে: সুনামগঞ্জ-২৮ বর্ডারগার্ড ব্যাটালিয়নের চারাগাঁও বিওপির কিছু অসৎ বিজিবি সদস্য, স্থানীয় আ’লীগ নেতা, বিজিবির সোর্স ও চোরাচালান চক্রের সদস্যরা পরস্পরের সহযোগীতায় প্রতিমাসে বিনাশুল্কে সীমান্তের ওপার থেকে কয়েক কোটি টাকার চুনাপাথর নিয়ে আসছে। হ্যান্টট্রলি বোঝাই এসব চোরাই চুনাপাথর থেকে বিজিবি, পুলিশ, কয়লা আমদানিকারক গ্রুপ, সাংবাদিকদের নামেও চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
ক্ষণ বিরতি দিয়ে গত এক বছরেরও অধিক সময় ধরে নির্ঞ্ঝাঝাট ভাবেই চলছে এ অবাধ চোরাচালান বাণিজ্য। প্রতি সপ্তাহে ১৯ থেকে ২৫ লাখ টাকা মূল্যের চুনাপাথর বিনাশুল্কে সীমান্তের ওপার থেকে নিয়ে আসা হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব চোরাচালান আর চাঁদাবাজির চালকের ভুমিকায় আছেন ঐ সীমান্তের শাসকদলের এক নেতা। পাশাপাশী রয়েছে তার অনুগত চাঁদাআদায়কারী বিজিবি-পুলিশের এক সোর্স ও বিওপিতে যখন যে ক্যাম্প কমান্ডার আসেন তিনি থাকেন পরোক্ষ মদদ দাতা হিসাবে। এমন অভিযোগ সীমান্তবাসীর।
সরেজমিনে গিয়ে মঙ্গলবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দেখা যায়, চারাগাঁও শুল্ক ষ্টেশনকে ব্যবহার করে সীমান্তের লাগোয়া পাহাড় থেকে রাতে সড়িয়ে আনা কয়েক শত মেট্রিক টন চোরাই চুনাপাথর সারিসারি হ্যান্ডট্রলিতে লোড করে চারাগাঁও বিওপির সামনে দিয়ে পশ্চিমের এক কয়লা ব্যবসায়ীর বাড়ির পেছনে হাওরের তীরে ডাম্পিং করা হচ্ছে। স্থানীয় লোকজন জানায় সোমবার ভোর রাত থেকে দিনভর একই কায়দায় কমপক্ষে ২ থেকে আড়াই’শ হ্যান্ডট্রলি বোঝাই চুনাপাথর এনে ছোট ছোট ট্রলারে করে পাচার করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত প্রায় দুই শতাধিক হ্যান্ডট্রলি বোঝাই চুনাপাথর এনে একই স্থানে ডাম্পিং করা হয়। একেকটি হ্যান্ডট্রলিতে চুনাপাথরের ধারণ ক্ষমতা প্রায় দেড় মেট্রিক টন। বিজিবি ক্যাম্পের দেড় থেকে দু’শ গজের মধ্যে প্রকাশ্যে এসব চোরাচালান বাণিজ্য হলেও মূলত কিছু অসৎ বিজিবির সদস্য বিওপিতে বসেই ট্রলি গোনার কাজে ব্যস্ত থাকে প্রতিনিয়ত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সীমান্তের একাধিক ব্যক্তি এ প্রতিবেদককে জানান, সপ্তাহের ৩ রাত পার্শ্ববর্তী চারাগাঁও শুল্ক ষ্টেশনের জিরো পয়েন্ট ও বাঁশতলা গ্রাম অতিক্রম করে দু’টি পয়েন্ট দিয়ে প্রায় সহস্রাধিক শ্রমিক চুনাপাথর ভাঙ্গার কাজ করে। এরপর পাথর গুলো সকালে জিরো লাইন বরাবর সড়িয়ে আনা হয়। পরবর্তীতে সপ্তাহের ৩ দিন ট্রলি বোঝাই করে বিজিবি ক্যাম্পের সামনে দিয়েই হাওরে নিয়ে ডাম্পিং করার পর ছোট ছোট ট্রলারে করে এসব চুনাপাথর পাচার করা হয়। বিনা শুল্কে নিয়ে আসা চোরাই চুনাপাথরের জন্য ট্রলি প্রতি বিজিবির নামে ১৫০ টাকা, পুলিশের নামে ৫০ টাকা, তাহিরপুর কয়লা আমদানিরকারক গ্রুপের চারাগাঁও সড়ক মেরামতের নামে ১০০ টাকা ও একাধিক সাংবাদিক ম্যানেজ করার কথা বলে ১০০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। এভাবে সপ্তাহের তিন দিনে কমপক্ষে ৯শ থেকে ১২শ মেট্রিক টন চুনাপাথর বিনাশুল্কে সীমান্তের ওপার থেকে নিয়ে এসে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার পাশাপাশী সীমান্তের হত দরিদ্র শ্রমিকদের চোরাচালানের দিকে ধাবিত করা হচ্ছে।
বড়ছড়া ও বাগলী শুল্ক ষ্টেশনের একাধিক আমদানিকারক জানান, ৯৯ টন চুনাপাথর এলসির মাধ্যমে আনার জন্য প্রতি টনে ৩১৮ টাকা করে সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স দিতে হয়। প্রতিটন চুনাপাথরের বর্তমান বাজার মুল্য রয়েছে ২০০০ থেকে ২১০০ টাকা। এই হিসাবে প্রতি সপ্তাহে চারাগাঁও সীমান্ত এলাকা দিয়ে বিনাশুল্কে প্রায় ১৯ থেকে ২৫ লাখ লাখ টাকার চুনাপাথর পাচার হচ্ছে। এসব চোরাচালান বাণিজ্যের পেছনে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে গড়ে ৪০০’শ টাকা। চাঁদা আদায়ের পরিমাণ দাড়ায় সপ্তাহে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। শুধু চুনাপাথর নয় একই কায়দায় সপ্তাহের ৩ থেকে ৪ দিন সীমান্তের ছড়া থেকে পাথর উক্তোলনের পর প্রতিদিন ৩ থেকে সাড়ে ৩শ হ্যান্ডট্রলি বোঝাই পাথরের জন্য ট্রলি প্রতি বিজিবি ৩০, কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সড়ক মেরামতের অজুহাতে ৩০, পুলিশ ১০ ও সাংবাদিকদের নামে ৩০ টাকা করে প্রায় ১০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
এদিকে, মঙ্গলবার এলাকাবাসী সুনিনির্দিস্ট তথ্য দেয়ায় ক্যাম্প কমান্ডার হাবিলদার আবদুর রশীদ তার ৩ সদস্যের টহল দল ও সোর্স শফিকুল ইসলাম ভৈরবকে নিয়ে হাওরের তীরে গিয়ে নিজে দাড়িয়ে থেকে চোরাচালানকৃত চুনাপাথর বোঝাই ১৫ থেকে ১৬টি ট্রলার সড়িয়ে ফেলতে সহায়তা করেন। এছাড়া হাওরের তীরে পড়ে থাকা প্রায় ২ থেকে আড়াই’শ মেট্রিক ট্রন (যার মুল্য প্রায় সোয়া ৪ লাখ থেকে সোয়া ৫ লাখ টাকা) বিনাশুল্কে নিয়ে আসা চোরাই চুনাপাথর দ্রত সরানোর জন্য চোরাচালানী চক্রের সদস্যের নির্দেশ প্রদান করেন। একই ভাবে একই সময়ে ১০ থেকে ১৫ মেট্রিক টন চোরাই চুনাপাথর বোঝাই ১৫ থেকে ১৬টি ট্রলার আটক না করেই ওই ক্যাম্প কমান্ডার ট্রলারগুলো সড়িয়ে নিতে সহযোগীতা করেন।
বিজিবি-পুলিশ-কয়লা আমদানিকারক গ্রুপ ও সাংবাদিকদের নামে চাঁদা আদায়কারী চারাগাঁও’র শফিকুল ইসলাম ভৈরব মঙ্গলবার দুপুরে এ প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করে নেয় চাঁদা আদায় ও চোরাচালান বাণিজ্যের কথা। সে আরো জানায়, আমার এখানে কেউ নেই। হাসান মেম্বার আমাকে খুব বিশ্বাস করে। তার কথায় আমি লাইন ম্যান হিসাবে কাজ করি। সোমবারও লাইন (চোরাই চুনাপাথর) এসেছে এবং মঙ্গলবারও কয়েক ট্রলি চুনাপাথর এসেছে। এ বিষয়টি পত্রিকায় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে সে জানায় আপনারা না করলে আমি আর এই কাজে যাবো না। সব দিক আমার ম্যান্টেজ (ম্যানেজ) করা লাগে।
ইউনিয়ন আ’লীগের সাধারন সম্পাদক ও স্থানীয় ইউপি সদস্য হাসান আলী কয়লা আমদানিরকারক গ্রুপ ও থানা পুলিশের নামে চুনাপাথর চোরাচালান ও পাথর থেকে দু’দফা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে মঙ্গলবার দুপুরে বলেন, না ভাই আমি শফিকুলকে চিনি না। কেউ চাঁদাবাজি করলে পুলিশ এসে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাক। তিনি আরো বলেন এলাকায় কেউ এ ধরণের কথা স্বীকার-ই করবে না।
চারাগাঁও বিওপির ক্যাম্প কমান্ডার হাবিলদার আবদুর রশীদের নিকট মঙ্গলবার বিনাশুল্কে নিয়ে আসা চুনাপাথর চালান জব্দ না করে উল্টো নৌকা ছেড়ে যেতে ও ডাম্পিং করা চোরাই চুনাপাথর সড়িয়ে ফেলতে টহল দল নিয়ে চোরাচালানীদের সহযোগীতা করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, গরীব মানুষের মাল ছিল, তাই সড়িয়ে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছি আর এসব চোরাচালান হবে না, আমি শফিকুলকে (লাইনম্যান) গালিগালাজও করেছি কেন এসব করতে যায়।
তাহিরপুর থানার ওসি মো. শহীদুল্লাহর নিকট চোরাচালানকৃত চুনাপাথর ও সীমান্তছড়া থেকে পাথর বোঝাই ট্রলি থেকে দু’দফা পুলিশের নামে চাঁদা আদায়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি মঙ্গলবার বিকেলে বলেন, “পুলিশের নামে চাঁদা আদাযের বিষয়টি আমি জানিনা’’ শুনেছি হাসান মেম্বার এর আগেও সীমান্ত এলাকায় এটা সেটা বলে তার লোকজন দিয়ে চোরাচালান ও চাঁদাবাজি করায়, সুনির্দিস্ট তথ্য পেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Share





Related News

Comments are Closed