সুনামগঞ্জে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ১জন নিহত, ৪০টি বাড়িতে লুটপাট
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের শাল্লায় পতিত জমির দখল নিয়ে গ্রামের দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার জের ধরে প্রতিপক্ষের প্রায় ৪০টি বাড়িঘরে টানা ৩ দিন লুটপাট হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা গ্রেফতারের ভয়ে এলাকা ছেড়ে যাওয়ায় ফাঁকা বাড়িগুলোতে নির্বিঘ্নে লুটপাট চালানো হয়েছে।
এ সময় ধান-চাল, স্বর্ণালংকার, আসবাবপত্র, জমি চাষের টিলার, কৃষি কাজের ইঞ্জিন, হাঁস-মুরগী, গবাধিপশু ও নৌকাসহ অন্তত অর্ধ কোটি টাকার সম্পদ লুট করে নেওয়া হয়েছে।
খুনের ঘটনার পর গ্রামের পাশের বাজারে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রাতের আধারে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছেন- স্থানীয় আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।
শাল্লা থানার ওসি বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ যাওয়ার আগে কিছু ঘটনা ঘটেছে। এখন এমন হয়ে থাকলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শাল্লা উপজেলার নিজগাঁও গ্রাম সংলগ্ন পূর্ব দিকের একটি পতিত জমির দখল নিয়ে রূপ মিয়া ও আজব আলীর মধ্যে বিরোধ চলছিল। এর জের ধরে গত ৩১ অক্টোবর দুই পক্ষের সংঘর্ষে রূপ মিয়ার চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান মারা যান। এরপর আজব আলীর পক্ষের লোকজন পুলিশের গ্রেপ্তারের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর তাদের বাড়ি-ঘর লুট হয়েছে। বাজারে পুলিশ থাকলে গ্রাম দূরে থাকার সুযোগে লুটপাট করেছে প্রতিপক্ষের লোকজন।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ঘটনার পর রূপ মিয়ার লোকজন তাদের বাড়িঘরে টানা তিন দিন লুটপাট চালিয়েছে। তিন দিনে আজব আলীর পক্ষের এলিম উদ্দিনসহ প্রায় ৪০টি বাড়ি থেকে ৬৫টি গরু, চাষাবাদের ৫টি টিলার, ২টি মোটরসাইকেল, টিউবওয়েল থেকে পানি তোলার ৫টি মটর, ডিজেল চালিত ২০টি ইঞ্জিন, ধানের মাড়াইকল ২টি, শতাধিক ব্যাগ বোরো বীজ ধান, প্রায় ৪০০ মণ বোরো ধান, ২টি ফ্রিজ, ১২টি গ্যাসের চুলা ও সিলিন্ডার, নগদ টাকা ৫ লাখ ও ৩ ভরি স্বর্ণালংকার ও গৃহস্থালি জিনিপত্র ও হাড়িপাতিল পর্যন্ত লুট করা হয়েছে। পুরুষ মানুষ বাড়ি ছাড়া হওয়ার পর থেকেই নিরাপত্তহীনতায় ভুগছেন নারীরা।
নিজগাঁও গ্রামের মৃত উমর আলীর স্ত্রী মিনারা বেগম বলেন, রাইতে আইয়া ঘরের দরজা খোলার লাগি অনেক লাথি দিয়েছে, ঘরের বেড়ায় লাথি গিয়েছে, গালিগালাজ করেছে কিন্তু ভয়ে আমরা দরজা খুলছি না। ঘরের বাইরের থাকা দুই পোলার দুইটা মিশিন, চাইরটি গরু ও একটা নৌকা আছিল; নিয়া গেছে।
মাসুম মিয়ার স্ত্রী মোছা. আসমিনা বেগম বলেন, বাড়ি-ঘরের সবকিছু লুট কইরা নিয়া গেছে। তিন দিনের লুটপাটে আমরা এখন পথের ফকিরের সমান অইয়া গেছি। ৪০০ মণ ধান, ২০ মণ চাল, তিন ভরি স্বর্ন, ১৭টা গরু, নগদ ৫ লাখ টাকা, ফ্রিজ, পানি তোলার মটর, মোটরসাইকেল, ট্রলি, ধান ভাঙ্গানোর মেশিনসহ ঘরে যা ছিল সব নিয়া নিছে। আমরা এখন চলব কীভাবে?
রেজু মিয়ার স্ত্রী তানিয়া আক্তার বলেন, আমার ও আমার শাশুড়ির খাট-পালং, আলমিরা, ঘরের সব জিনিসপত্র, হাড়ি-পাতিল, ধান-চাল, জমিতে পানি দেওয়ার পাম্প নিয়ে গেছে লুট করে। রান্নার সব চুলা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। রান্না করার মত কোন কিছু নেই ঘরে।
আহাদ নুর মিয়ার স্ত্রী লিমা আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, কোন বাড়িতেই পুরুষ মানুষ নাই। খালি বাড়ি থেকে গরু-বাছুর, ধান-চাল সব নিয়ে গেছে। এখন পানি খাওয়ার একটা গ্লাসই নাই। ৫০ কিয়ার জমির খড় ছিল, গভীর রাতে আগুন দিয়ে খড়গুলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।
পুলিশের ভয়ে বাড়ি ছাড়া গ্রামের এলিম উদ্দিন। লুটপাটের খবর শুনে তার ছোট বোন মাহমুদা আক্তার এসেছিলেন ভাইয়ের বাড়ি দেখতে। তিনি বললেন, এখন ঘটনা আমাদের জীবনেও দেখিনি। খালি বাড়িতে মহিলাদের গালি-গালাজ করে ও হুমকি দিয়ে সব লুটপাট করেছে। মারামারিতে আব্দুল মান্নান মারা যাওয়ার পর রূপ মিয়ার লোকজন আমাদের ভাইদের পক্ষের প্রায় ৪০টা ঘরের কোন-কিছু লুট করার বাকী রাখেনি।
নিহত আব্দুল মান্নানের চাচাতো ভাই রূপ মিয়া বলেন, জমিটি আমার বাবার নামে, আমি মাটি ভরাটও করেছি। এখন আজব আলী দাবি করে এই জায়গা তার। আজব আলীর লোকজনের হামলায় আমার ভাই (আব্দুল মান্নান) মারা গেছেন ও ৩০-৪০ জন আহত হয়েছে। আমার বাম পা ও মাথায় গুরত্বর আঘাত লেগেছে। আমি বিছানা থেকে উঠতে পারি না।
লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরও বলেন, আমাদের কেউ প্রতিপক্ষের বাড়িঘর লুটপাট করেনি, অন্যের জিনিসপত্র আনতে কড়া নিষেধ করা হয়েছে। তারা নিজেরাই আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে মালামাল পাচার করে আমাদেরকে অভিযুক্ত করছে। পুলিশকে আমরা জানিয়েছি যারাই এসবের সঙ্গে জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন।
আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, মারামারির পর রাতের আধারে নিজগাঁও গ্রামে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে সত্যি। তবে কে বা কারা করছে আমরা জানি না। একটি বাড়ির বিশাল খড়ের গাদায় আগুন দেওয়া হয়েছে। অনেকেই জানিয়েছেন ধান-চাল, পাওয়ার টিলার ও ইঞ্জিন লুট করে নিয়ে গেছে।
শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সুহেল বলেন, সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর নিজগাঁও গ্রামে পুলিশ যাওয়ার আগে কিছু ঘটনা ঘটেছে। এখন গ্রামের বাজারে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। রাতে এমন ঘটনা ঘটছে বলে শোনা যাচ্ছে। সবার বাড়ি-ঘরে পুলিশের যাওয়া কঠিন। তবে পুলিশ এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
Related News
সুনামগঞ্জে তিন মাসে নিখোঁজের ৩৭ জিডি, ২০ জনই শিক্ষার্থী
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সন্তানকে সকালে স্কুলে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না সুনামগঞ্জের অভিভাবকরা। স্কুলে যাচ্ছেRead More
সুনামগঞ্জে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ১জন নিহত, ৪০টি বাড়িতে লুটপাট
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের শাল্লায় পতিত জমির দখল নিয়ে গ্রামের দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহতRead More



Comments are Closed