শিক্ষাগুরুর ভবিষ্যৎ গন্তব্য কোথায়?
মোঃ ইমরান হোসেন ইমু: পাঠ্যবই থেকে শিক্ষাগুরুর মর্যাদা নামক অসাধারন তাৎপর্যবাহী কবিতাটি বাদ দেবার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কি ছিল তা আজো বুঝিনি। তবে ব্যাপারটা বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষাগুরুর মর্যাদা শিক্ষার্থী তথা সমাজ থেকেই লোপ পাবার সাথে কাকতালীয়ভাবে মিলে যাচ্ছে!
পেশাজীবী হিসেবে একজন শিক্ষকের বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন হলো সম্মান। সে শিক্ষক যখন সম্মানহীন হয়ে পড়েন তখন তাঁর বেঁচে থাকা ও শিক্ষক হয়ে পথ চলা দুষ্কর হয়ে পড়ে। আমরা জানি আমাদের সমাজে অর্থের বিনিময়ে সম্মান কিনতে পাওয়া যায়! কিন্তু একজন শিক্ষক তো তেমন অর্থকড়ীর মালিক নন! তাই একজন শিক্ষককে তাঁর মেধা ও শ্রম দিয়ে তিলে তিলে তাঁর সামাজিক মর্যাদা ও সকলের মাঝে তাঁর প্রতি সম্মানবোধ গড়ে তুলতে হয়। প্রায় প্রতিজন শিক্ষকই তাই করে যাচ্ছেন। এভাবেই প্রাপ্য সম্মানকে অবলম্বন করেই শিক্ষকেরা বেঁচে আছেন।
কিন্তু শিক্ষক সমাজ আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। আমরা যেন হুজুগে বাঙালীর তকমার যথার্থতা প্রমানিত করতে হুমড়ি খেয়ে পরেছি। তাতে যে শিক্ষাগুরুর গোড়ায় কুঠারাঘাত হচ্ছে সেদিকে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই!!
দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঠিক পথের দিশারী যারা তাদের যদি সমাজের কাছে দিগম্বর করে প্রদর্শন করা হয় তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি প্রদর্শকের দেখানো পথে এগোবে?! মানুষ তো মানুষই! ফেরেশতা বা অতিমানবীয় কিছু তো না! সে শিক্ষক হোক বা অন্য কোন পেশাজীবী। শিক্ষকেরও যে ভুল হয় না এ দাবি কি আজ পর্যন্ত কোন শিক্ষক করেছেন? দোষ-ত্রুটি বা কোন অন্যায় হলে তা কি প্রচলিত আইনেই সমাধান যোগ্য নয়?
তাছাড়া কিছু ব্যাপার ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে খুবই ত্রুটিপূর্ণ মনে হয়। যেমনঃ কোন আইন জারি করে এবং তা ফলাও করে প্রচার করে গোটা দেশ ও জাতিকে জানানো যে শিক্ষকদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে!! শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি সত্যিই মানবাধিকার লঙ্ঘন। এ ব্যাপারে যথাযথা ব্যবস্থা নেয়াও জরুরী। কিন্তু শিক্ষক কোন শিক্ষার্থীকে কোনরুপ শারীরিক শাস্তি দিতে পারবেন না, দিলে শিক্ষকের বিরুদ্ধে কেমন কেমন শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে তা কি ফলাও করে প্রচার করার বিষয়!!!!? এতে কি শিক্ষার্থী ও সমাজের দুষ্ট প্রকৃতির লোকদের শিক্ষকের উপর চড়াও হবার মানসিকতা তৈরী করে না?!! একটি অফিসিয়াল গোপনীয় প্রজ্ঞাপন বা আদেশের মাধ্যমে আরো কঠোরভাবে কি শারীরিক শাস্তির ব্যাপারে শিক্ষকদের সতর্ক করা যেত না!!!? এখন হলো কি? শিক্ষকের জন্য ফলাও করে প্রচারিত এসব আদেশ শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয় ও মর্যাদাহানী করার অস্ত্র হিসেবে কাজ করছে!!?
এটা কি গ্রহনযোগ্য? !! শারীরিক শাস্তি বা নিয়মতান্ত্রিক কোন অপরাধ ছাড়াও একজন শিক্ষক ব্যক্তিগত বা অন্য কোন কারনে যেকারোই বিরাগভাজন হতেই পারেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের জন্য প্রচারিত ঐসব শান্তির আদেশই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যে কারো মনের ঝাল মেটানোর নেয়ামক হিসেবে কাজ করছে!! যা সত্যিই দুর্বিষহ রুপ লাভ করেছে!!
একজন শিক্ষক হিসেবে আমি অত্যন্ত চিন্তিত আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমি সবসময় আশঙ্কায় থাকি কখন কে কোন বানোয়াট অভিযোগে আমাকে ঘায়েল করতে আসবে! কখনো যদি আমার উপরও নেমে আসে অসম্মানের খড়গ!! কারো ব্যক্তিগত বিদ্বেষের থাবা যদি এসে পরে আমার উপর!! তাছাড়া আমার জন্য প্রতিবাদের ঝড় উঠবে তো? নাকি ক্ষেত্রবিশেষের ফাঁদে পড়ে হয়ে যাবো নিকৃষ্টতম!
আমি মনে করি দেশের প্রত্যেক শিক্ষকই এ আশঙ্কায় থাকেন। প্রতিনিয়ত অসম্মানীত হবার আশঙ্কা নিয়ে শিক্ষাগুরুরা গড়ে চলেছেন দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা মেরুদণ্ড। জানিনা সে মেরুদন্ড কতটা মজবুত হবে!
মাঝে মাঝে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করি শিক্ষকতা চালিয়ে যেতে পারবো তো!? শিক্ষকতা পেশা হিসেবে সম্মানজনক থাকবে তো!? শিক্ষাগুরুর ভবিষ্যৎ গন্তব্য কোথায়?
লেখক: সহকারি শিক্ষক,সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
Related News
কুরবানী: আত্মশুদ্ধি, মানবিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের মহাশিক্ষা
Manual5 Ad Code কবি আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু: “কুরবানী শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; কুরবানীRead More
ইউরোপের পথে প্রবাসীদের স্বপ্ন ও সংগ্রামের ব্যবচ্ছেদ
Manual1 Ad Code শামসুল ইসলাম: ইউরোপ, এক মায়াবী হাতছানির নাম। উন্নত জীবন-যাপন আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতেরRead More



Comments are Closed