Main Menu

আলোচিত সুনামগঞ্জের টেংরাটিলায় আবারও গ্যাস অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত

Manual8 Ad Code

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: গ্যাস কূপ খনন করতে গিয়ে দুই দফা ব্লোআউট বা বিস্ফোরণের শিকার সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার গ্যাসক্ষেত্রের টেংরাটিলায় দুই দশক পর আবারও গ্যাস অনুসন্ধান করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সরকার। বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়াত্ব তেল গ্যাস অনুসন্ধান কো¤পানি বাপেক্স এই অনুসন্ধান করবে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।

২০১৬ থেকে ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে নাইকোর সঙ্গে বাপেক্সের দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা নিস্পত্তি হওয়ার পর টেংরাটিলায় নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের তেল গ্যাস খনিজ স¤পদ কর্পোরেশন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, টেংরাটিলায় প্রাথমিকভাবে দুটি কূপ খননের পরিকল্পনা হয়েছে এবং বাপেক্স ডিপিপি বা প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ শুরু করেছে।

২০০৫ সালে দুর্ঘটনার পর নানা জটিলতায় গত ২১ বছরে দোয়ারাবাজার ও টেংরাটিলায় গ্যাসক্ষেত্রে কোনো অনুসন্ধান বা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। টেংরাটিলার কূপ খননের প্রকল্প প্রস্তাব সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন নিয়ে আগামী বছরই নতুন কূপ খনন শুরু করতে চায় বাপেক্স।

টেংরাটিলা দুর্ঘটনার জন্য নাইকো রিসোর্সেসকে দায়ী করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত ইকসিড ৪২ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ দেয়।

কানাডার তেল গ্যাস কো¤পানি নাইকো রিসোর্সেস টেংরাটিলায় গ্যাস কূপ খনন করতে গেলে ২০০৫ সালের জানুয়ারি এবং জুন মাসে দুই দফা বিস্ফোরণ ঘটে। ক্ষয়ক্ষতির হিসেবে টেংরাটিলার ব্লো আউটের কারণে আনুমানিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়েছে। নীতিনির্ধারক এবং ভূতত্ত্ববিদরা মনে করেন, টেংরাটিলায় দশটি স্তরে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা ছিল। পুড়ে ক্ষতির পর এখনো কয়েকটি স্তরে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভূতত্ত্ববিদ ড. বদরুল ইমাম মনে করেন, এই ভূগঠনে গ্যাসের মজুত আছে এবং কূপ খনন করে সেখানে গ্যাস অনুসন্ধান করা দরকার। তিনি বলেন, বিস্ফোরণ হওয়ার ফলে এটারতো (টেংরাটিলা) আর ডেভলপমেন্ট করা হয় নাই। কিন্তু এটার একটা ভাল মজুত আছে বলেই আমরা ধারণা করি। সুতরাং এখানে কূপ খননের পরিকল্পনাটা বাস্তবধর্মী এবং এটা করা উচিত।

Manual4 Ad Code

টেংরাটিলা বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আবিস্কৃত দ্বিতীয় গ্যাসক্ষেত্র দোয়ারাবাজার গ্যাসক্ষেত্রের অংশ। দোয়ারাবাজার গ্যাসক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম দুটি জোনের মধ্যে টেংরাটিলার অবস্থান দোয়ারাবাজার পশ্চিম জোনে। ২০০৩ সালে বাপেক্সের সঙ্গে জয়েন্ট ভেনচার কো¤পানি গঠন করে টেংরাটিলা ক্ষেত্রটি নাইকোর কাছে ইজারা দেয়া হয়। যদিও দোয়ারাবাজার গ্যাসক্ষেত্রটি সিলেট গ্যাসফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল) এর আওতাধীন। সিলেট গ্যাস ফিল্ড ও টেংরাটিলায় গ্যাস কূপ খননে প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে পেট্রোবাংলা বাপেক্সকে দিয়ে খনন কাজ করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে।

Manual4 Ad Code

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, বাপেক্স কূপ খনন করে সিলেট গ্যাস ফিল্ডের সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগি করবে। আমরা একটা কমিটি করেছি এই দুই কো¤পানির মধ্যে প্রফিট শেয়ারিং কীভাবে হবে তারা প্রপোজ করবে। ওই কমিটি যেভাবে প্রস্তাব দেবে, সেটা আমরা মন্ত্রণালয়কে প্রপোজ করবো। টেংরাটিলায় প্রথম পূর্বাংশে গ্যাস কূপ খনন করতে চায় বাপেক্স। এরপর পশ্চিম জোন। যেহেতু দুর্ঘটনায় গ্যাসক্ষেত্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাই দুর্ঘটনাস্থল থেকে দূরে ভিন্ন স্থানে ত্রিমাত্রিক জরিপের মাধ্যমে স্থান নির্ধারণ করে কূপ খনন করতে চায় বাপেক্স। দোয়ারাবাজার পশ্চিম জোন থেকে একটি কূপে অতীতে গ্যাস উত্তোলন হয়েছে। ওই কূপ থেকে মোট ২৭ বিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। ওই গ্যাস দোয়ারাবাজার সিমেন্ট কারখানায় সরবরাহ করা হয়। ১৯৮৪ সালে দোয়ারাবাজার গ্যাসফিল্ড বন্ধ হয়ে যায়।
দোয়ারাবাজার গ্যাসক্ষেত্রের পূর্ব জোনটি একেবারেই কোনো অনুসন্ধান হয়নি। তবে পশ্চিম জোনে যেহেতু গ্যাস উত্তোলন হয়েছে তাই এটি আবিস্কৃত গ্যাসক্ষেত্র। পশ্চিম জোনে টেংরাটিলায় দশটি স্তরে গ্যাসে সম্ভাবনা ও মজুত থাকার বিষয়টি জরিপে উঠে এসেছে। এখানে অন্তত চারশ বিসিএফ গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনার কথা জানা যায়।

এসজিএফএল এর মহাব্যবস্থাপক জীবন শান্তি সরকারবলেন, তাদের হিসেবে পূর্ব- পশ্চিম মিলিয়ে দোয়ারাবাজার গ্যাসক্ষেত্রে দুই থেকে তিন টিসিএফ গ্যাস রিসোর্স আছে বলে ধারণা রয়েছে।

টেংরাটিলায় মজুত নিয়ে ভূতত্ত্ববিদ ড. বদরুল ইমাম বলেন, উত্তোলনযোগ্য মজুত হতে হলে কূপ খননের পর আবিস্কারের মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে হবে। রিসোর্স বলতে বুঝাই যে পুরো অবস্থানটা গ্যাসটা আছে। কিন্তু আমরা রিজার্ভ বলি যেইটাকে উঠায় নিয়ে আসতে পারবো সেইটাকে। তো রিজার্ভ যদি বলা হয়, সেটা দুই টিসিএফ রিসোর্স হতে পারে তবে উত্তোলনযোগ্য সিক্সটি পার্সেন্ট হতে পারে খুব ভালো হলে সেভেনটি পার্সেন্ট হতে পারে। আমি মনে করিনা এখানে দুই টিসিএফ গ্যাস আছে। এখানে (পূর্ব- পশ্চিম মিলিয়ে) নেয়ার এবাউট টিসিএফ থাকতে পারে বলে আমার ধারণা। এদিকে যেহেতু টেংরাটিলায় বিস্ফোরণের পর প্রচুর স¤পদ পুড়ে নষ্ট হয়ছে, তাই সেখানে আসলে কতটা মজুত আছে- সেটি একটি প্রশ্ন। ভূ-ক¤পন জরিপ এবং কূপ খননের মাধ্যমেই টেংরাটিলার মজুত পরিস্থিতি স¤পর্কে চূড়ান্ত ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে পেট্রোবাংলার সবশেষ হিসাব অনুযায়ী, ৩০টিসিএফ গ্যাসের প্রমাণিত মজুত পাওয়া গেছে যার মধ্যে প্রায় ২৩ টিসিএফ উত্তোলন হয়েছে এবং এখন সাত টিসিএফ এর মতো অবশিস্ট আছে। পেট্রোবাংলার প্রতিবেদনে গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিদেশি কো¤পানি ও আমদানি নির্ভরতাই এখন মোট সরবরাহের চার ভাগের তিনভাগ। এই মুহূর্তে গ্যাসের যে প্রমাণিত মজুত আছে, বিদ্যমান হারে উত্তোলন করলে সেটুকু শেষ হয়ে যাবে দশ বছরের মধ্যে। তবে নতুন আবিস্কারের মাধ্যম প্রতিনিয়ত প্রমাণিত মজুত বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। বাণিজ্যিক ভাবে উত্তোলনের জন্য গ্যাস না পেলেও সেটাকে অপচয় বা ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন না ভূতত্ত্ববিদরা। কারণ ওই খননের তথ্য নতুন কূপ খননে সহায়তা করে এবং ভূগঠন স¤পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়া বর্তমান গ্যাস সংকট ও বিশ্ব বাজারে অস্থিরতার বিবেচনা থেকে হিসেব করলে কূপ খনন যে গুরুত্বপূর্ণ এবং লাভজনক সেটি প্রতীয়মান হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। উদাহরণ হিসেবে ইরান যুদ্ধের কারণে মূল্য বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ এক কারগো এলএনজি আমদানি করতে সর্বোচ্চ যে খরচ করতে হয়েছে, সেই টাকায় স্থলভাগে আটটি কূপ খনন করতে পারে বাপেক্স। কারিগরি সক্ষমতার চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যেমন এই মুহূর্তে বাপেক্সের ৫টি রিগ বা খননযন্ত্র থাকলেও একসঙ্গে তিনটির বেশি রিগ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নেই। সুতরাং অর্থ বরাদ্দ করলেও বাপেক্স একসঙ্গে ৫টি রিগ ব্যবহার করে গ্যাস কূপ খনন করতে পারবে না। এছাড়া বাংলাদেশে গভীর কূপ খনন করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা, সেখানেও অভিজ্ঞতা এবং সক্ষমতার ঘাটতি আছে বাপেক্সের। কারণ বাপেক্স নিজস্ব রিগ দিয়ে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৪৯৭৭ মিটার পর্যন্ত গভীরে কূপ খনন করেছে।এই মুহূর্তে গভীর কূপ খনন করার জন্য বাপেক্সের একদিকে কারিগরি সক্ষমতা নেই। আবার বাস্তব অভিজ্ঞতাও নেই। এ কারণে বাপেক্সকে নতুন করে গভীর কূপ খনন করার রিগের আধুনিকায়ন দরকার হবে আবার জনবলকে গভীর কূপ খননে দক্ষ ও অভীজ্ঞ করতে প্রশিক্ষণ লাগবে।

Manual6 Ad Code

এক্ষেত্রে বিদেশি কো¤পানির সহায়তা নেয়া লাগতে পারে বলে মনে করেন ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম। তিনি বলেন, এই খানে ডিপ ড্রিলিং করতে হবে। ডিপ ড্রিলিং করার জন্য যে সরঞ্জাম, সেটা একটু ইকুইপমেন্ট ইনটেনসিভ এবং অর্গানাইজেশন ইনটেনসিভ। বাপেক্স যে লেভেলে ড্রিলিং (খনন) করে সেটা ডিপ ড্রিলিং নয়। ডিপ ড্রিলিংয়ে যেতে হলে খুব সম্ভবত বাপেক্সকে বিদেশি কো¤পানির সহায়তা নিয়ে করতে হবে। ইভেনচুয়্যালি বাপেক্সও এটায় পারদর্শী হয়ে উঠতে পারে। সমালোচনা রয়েছে বাংলাদেশে জাতীয় তেল গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে জাতীয় সক্ষমতা গড়ে না ওঠায় বিদেশি কো¤পানির সঙ্গে চুক্তির প্রয়োজন হয়। তেল গ্যাস খাতের চুক্তির স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বাংলাদেশে। টেংরাটিলায় নাইকোর সঙ্গে চুক্তি নিয়েও অভিযোগ ছিল এবং সাবেক দুইজন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়েছিল। উচ্চ আদালতের রায়ে পৃথকভাবে দুজনই অব্যাহতি পেয়েছেন। যদিও সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে ২০০৫ সালে তৎকালীন জ্বালানি মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়। অন্যদিকে কানাডার একটি আদালত ২০১১ সালে নাইকোকে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনায় অসাধু পন্থা অবলম্বনের দায়ে ৯.৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করে রায় দেয়।

Manual2 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code