সিলেটে বাড়ছে হামের প্রকোপ, হাসপাতালে ভর্তি ১২ শিশু
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটজুড়ে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিদিন অসংখ্য শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, বর্তমানে সিলেটে অন্তত ১২ শিশু হাম নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
রোববার (২৯ মার্চ) সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত জানান, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে কয়েকজনের বয়স এখনো ৯ মাস পূর্ণ হয়নি। কারো বয়স ৫ মাস কিংবা ৬ মাস। অর্থাৎ তাদের হামের টিকা দেওয়ার সময়ই হয়নি। আবার কিছু শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে টিকা নেওয়া সত্ত্বেও তারা সংক্রমিত হয়েছে।
তিনি বলছেন এর কারণ অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য বিভাগ বিশেষ তদন্ত শুরু করেছে।
তিনি আরও জানান, গত বছর হামের টিকা নিয়ে কিছুটা সঙ্কট ছিলো। তবে এই মুহুর্তে হামের (এমআর) টিকার কোন সংকট নেই।
হাম কী এবং কেন এটি উদ্বেগজনক
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় এবং বিশেষ করে শিশুরা দ্রুত আক্রান্ত হয়। সংক্রমণের পর প্রথম কয়েকদিন জ্বর, সর্দি, কাশি দেখা দেয়। পরবর্তী কয়েকদিনে পুরো শরীরজুড়ে র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত দুই সপ্তাহে রোগ সেরে যায়, কিন্তু দ্বিতীয় সপ্তাহে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। চিকিৎসকদের তথ্যমতে, আক্রান্ত শিশুদের বেশির ভাগের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখে সংক্রমণ, সেলুলাইটিস বা ইলেকট্রোলাইট সমস্যা দেখা যায়। অল্পসংখ্যক শিশুর ক্ষেত্রে কিডনি ও হার্ট ফেইলিউর কিংবা মস্তিষ্কে প্রদাহও হতে পারে।
হামের টিকা কোন বয়সে দেওয়া হয়
বাংলাদেশে হামের টিকা এমআর (মিজেলস-রুবেলা) নামে দেওয়া হয়। যার প্রথম ডোজ ৯ মাসে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে। এই দুই ডোজ নেওয়ার পর সাধারণত শিশুর শরীরে শক্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। তবে টিকা দেওয়ার পর ইমিউনিটি তৈরি হতে সময় লাগে এবং ৯ মাসের নিচে শিশুদের টিকা দেওয়া যায় না। ফলে টিকার আগের সময়টিই তাদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
সিলেটে সংক্রমণ কেন বাড়ছে
সিলেটে যেসব শিশু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, তাদের মধ্যে কয়েকজন সম্প্রতি দীর্ঘ যাতায়াত, উৎসব কিংবা ভিড়যুক্ত পরিবেশে গিয়েছিল বলে জানা গেছে। হামের সংক্রমণ অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়, ফলে একজন শিশুর আংশিক সংস্পর্শেও অন্য শিশু আক্রান্ত হতে পারে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, গত বছর দেশে টিকা সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন হয়েছিল। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে যারা টিকা নেয়নি, তারা ঝুঁকিতে বেশি। আর যেসব শিশু টিকা নেওয়ার বয়সের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সিলেটে টিকা প্রস্তুতি: ক্যাম্পেইন কবে
সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, অতিরিক্ত ঝুঁকিতে থাকা ৯ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী সকল শিশুকে এমআর টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সিলেটের বেশ কিছু এলাকায় ড্রপআউট হার বেশি, তাই ক্যাম্পেইনের আওতায় যত বেশি শিশুকে আনা যায় সেটিই এখন লক্ষ্য। স্বাস্থ্য বিভাগের একটি সূত্র বলছে, সিলেটে এই বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন খুব শিগগিরই শুরু হবে এবং প্রয়োজন হলে বয়সসীমা আরও বাড়ানো হতে পারে। ডা. জন্মেজয় দত্ত জানিয়েছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যেই এমআর ক্যাম্পেইনটি শুরু হবে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, গত বছর হামের টিকা ক্যাম্পেইন শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও নানা জটিলতায় তা বাস্তবায়িত হয়নি। চলতি বছর জাতীয় নির্বাচন শেষে রমজানের আগেই কার্যক্রম শুরু করার কথা ছিল, কিন্তু সেটিও শুরু করা যায়নি। সূত্রটি জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ হলে ক্যাম্পেইনটি খুব দ্রুত চালু হবে এবং প্রতিটি এলাকায় যেসব শিশু এখনো এমআর টিকা পায়নি, তাদের সবাইকে এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকার আওতায় আনা হবে।
উপসর্গগুলো কি কি
আক্রান্তদের প্রথম ৩ থেকে ৪ দিন জ্বর-সর্দি-কাশি দেখা দেয়। তারপর ৪ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। সারতে ২ সপ্তাহ সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকরা বুঝে ওঠার আগেই (দ্বিতীয় সপ্তাহ) রোগীর জটিলতা শুরু হয়। ৯০ ভাগ রোগীর নিউমোনিয়া, ৬০ থেকে ৭০ ভাগের ডায়রিয়া, ৫০ ভাগের কনজেক্টিভাইটিস (চোখে সংক্রমণ) হয়। এছাড়া স্বল্পসংখ্যক রোগীর সেলুলাইটিস (র্যাশজনিত ইনফেকশন), রক্তে সোডিয়াম (লবণ) কমে যাওয়া, কিডনি ও হার্ট ফেইলিউর, এনকেফাইলাইটিস (মস্তিষ্কে টিস্যুর প্রদাহ) ও খিঁচুনি হয়।
হামের প্রতিকার ও প্রতিরোধ
শিশু জ্বর, সর্দি, কাশি বা র্যাশে আক্রান্ত হলে ভিড় থেকে দূরে রাখতে হবে। পর্যাপ্ত পানি, পুষ্টিকর খাবার ও বিশ্রাম দিতে হবে। চোখ বা মুখে সংক্রমণ হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। অন্য শিশুদের সংস্পর্শ যতটা সম্ভব কমাতে হবে। বয়স হলে দুই ডোজ এমআর টিকা সময়মতো দিতে হবে।
সিলেটের জন্য বিশেষ সতর্কতা
সিলেটের হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্তদের চাপ বাড়ছে। ফলে সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা ও আক্রান্তদের আলাদা রেখে চিকিৎসা দেওয়াই এখন সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ভিড় বেশি এমন জায়গায় শিশুদের না নিয়ে যাওয়া এবং আশপাশে আক্রান্ত কেউ থাকলে তাকে আইসোলেশনে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
সচেতন মহল মনে করছেন, সিলেটে এখনই প্রয়োজন জনসচেতনতা বাড়ানো, টিকা কার্যক্রম জোরদার করা এবং সম্ভাব্য নতুন সংক্রমণকে ঘিরে দ্রুত লজিস্টিক প্রস্তুতি নেওয়া। কারণ জাতীয় পরিস্থিতির সঙ্গে মিল রেখে সিলেটেও রোগী বৃদ্ধির আশঙ্কা বাস্তবেই ঘনিয়ে আসছে।
Related News
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু
Manual2 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩Read More
সিলেটে হামের উপসর্গে আরও ১শিশুর মৃত্যু, প্রাণহানী বেড়ে ১৪১
Manual2 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেট গত ২৪ ঘন্টায় হামের উপসর্গে আরও এক শিশুরRead More



Comments are Closed