সিলেট সীমান্তে প্রাণহানি, অপরাধ আর রাজনৈতিক নীরবতার অস্বস্থিকর বাস্তবতা
হোসাইন আহমদ সুজাদ: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন ঘিরে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য নিয়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির বন্যা দেখা গেলেও একটি মৌলিক, জীবনঘনিষ্ঠ এবং দীর্ঘদিনের উপেক্ষিত প্রশ্ন আবারও আড়ালে থেকে যাচ্ছে সিলেটের ৬৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত।
সীমান্ত কেবল মানচিত্রের একটি দাগ নয়, এটি নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতি এবং মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওত-প্রোতভাবে জড়িত একটি বাস্তবতা। পরিসংখ্যান বলছে, গত চার বছরে সিলেট সেক্টরের ৩০২ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় বিএসএফ ও খাসিয়াদের গুলিতে ২৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এই সংখ্যাটি নিছক একটি তথ্য নয়, প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারে শোক, একটি জনপদে আতঙ্ক এবং একটি রাষ্ট্রের জন্য অস্বস্তিকর প্রশ্নচিহ্ন।
প্রশ্ন হচ্ছে এই মৃত্যুগুলো কি অনিবার্য ছিল? নাকি সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, অবহেলা এবং কার্যকর সমন্বয়ের অভাবের ফল?
বাস্তবতা হলো, সিলেট বিভাগের সীমাসবতবর্তী এলাকাগুলোতেই হত্যা, চুরি, মাদক পাচার, চোরাচালান, মানবপাচার, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বহু গুরুতর অপরাধের বিস্থার বেশি। সীমান্ত দুর্বল থাকলে তার প্রভাব কেবল সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না, পুরো বিভাগই ধীরে ধীরে নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
সীমান্ত কেন অপরাধের উর্বর ক্ষেত্র হয়ে উঠছে-
সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সাধারণত রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি তুলনামূলক কম, নজরদারি দুর্বল এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ সীমিত। এই শূন্যতার সুযোগ নেয় চোরাচালান চক্র, মাদক কারবারি ও দালালচক্র। স্থানীয় কিছু মানুষ বাধ্য হয়ে বা প্রলোভনে জড়িয়ে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকান্ডে। ফলে সীমান্ত কেবল নিরাপত্তা নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটেরও কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সীমান্তে প্রাণহানির অধিকাংশ ঘটনাই ঘটে চোরাচালান বা সন্দেহভাজন গতিবিধির প্রেক্ষাপটে। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন সীমান্তবাসী এমন ঝুঁকির পথে যায়? এর উত্তর খুঁজতে গেলে সামনে আসে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বিকল্প আয়ের অভাব এবং দীর্ঘদিনের অবহেলা। অর্থাৎ, সীমান্ত সমস্যা কেবল আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি উন্নয়ন, জীবিকা ও রাষ্ট্রীয় মনোযোগের সমস্যা।
দুই পাশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বৈষম্য-
ভারতের সীমান্ত অংশে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া, নিয়মিত টহল, নজরদারি টাওয়ার, প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের অংশে, বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে, সমন্বিত ও আধুনিক নিরাপত্তা বলয়ের ঘাটতি দীর্ঘদিনের।
এই বাস্তবতা সীমান্তকে অপরাধচক্রের জন্য সহজ রুটে পরিণত করেছে। এর খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ, আর প্রাণ হারাচ্ছে নিরীহ সীমান্তবাসী।
রাজনৈতিক ইশতেহারে সীমান্ত নিরাপত্তা কেন নেই?
দুঃখজনক হলেও সত্য, আসন্ন নির্বাচনে সিলেটের অধিকাংশ প্রার্থীর ইশতেহারে সীমান্ত নিরাপত্তা, সীমান্ত উন্নয়ন বা সীমান্তবাসীর জীবন-জীবিকা নিয়ে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার অনুপস্থিত। যেন সীমান্ত একটি ‘প্রশাসনিক বিষয়’, রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো সীমান্ত ইস্যু রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে না এলে প্রশাসনিক সক্রিয়তাও টেকসই হয় না।
সীমান্তের মানুষ যখন দেখে তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটটি নির্বাচনী আলোচনায় স্থান পাচ্ছে না, তখন তাদের মধ্যে রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রতি এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়।
কী প্রত্যাশা সীমান্তবাসীর?
সীমান্তবাসীর প্রত্যাশা খুব জটিল নয়, বরং অত্যান্ত বাস্তব ভিত্তিক
১. সীমান্তে কার্যকর নিরাপত্তা জোরদার।
২. মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা।
৩. প্রাণহানি কমাতে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ।
৪. সীমান্ত এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান ও উন্নয়ন প্রকল্প।
সীমান্ত নিরাপত্তা মানে শুধু অস্ত্রধারী টহল নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আধুনিক প্রযুক্তি, দ্রুত প্রশাসনিক সাড়া, স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা এবং কার্যকর কূটনৈতিক সংলাপ।
সীমান্ত নিরাপদ না হলে সিলেট নিরাপদ নয়-
বিনয়ের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি সীমান্ত নিরাপদ না থাকলে সিলেটের কোনো উপজেলা, কোনো জনপদই দীর্ঘ-মেয়াদে নিরাপদ থাকতে পারে না। সীমান্তের দুর্বলতা ধীরে ধীরে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিকে প্রভাবিত করে।
নির্বাচন একটি নীরব প্রশ্নকে সামনে আনার সুযোগ-
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের দিন নয়; এটি একটি বড় সুযোগ সিলেটের সীমান্তকে জাতীয় ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে নিয়ে আসার। আশা করা যায়, এবারের নির্বাচনে প্রার্থীরা সীমান্ত বাসীর এই ন্যায্য প্রশ্ন-গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন এবং তাদের ইশতেহারে এর সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকবে। কারণ সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, একাত্তর টেলিভিশন।
Related News
সিলেট সীমান্তে প্রাণহানি, অপরাধ আর রাজনৈতিক নীরবতার অস্বস্থিকর বাস্তবতা
Manual7 Ad Code হোসাইন আহমদ সুজাদ: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয়Read More
গণভোট : রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক মুহূর্ত
Manual6 Ad Code মো: শুভ : গণভোট হলো রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তে জনগণের সরাসরিRead More




Comments are Closed