Main Menu

তীব্র শীতে শিশু ও প্রবীণদের সুরক্ষা

Manual1 Ad Code

মোঃ মাহমুদুল ইসলাম: সারা দেশে জেঁকে বসেছে তীব্র শীত। গত কয়েকদিন ধরে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় কুয়াশা ও তীব্র শীতের দাপটে জনজীবন বিপর্যস্ত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সূর্যের দেখা মিলছে না। এ শীত মৌসুমে দেশের সর্বনিম্ন ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। এরই মধ্যে ধেয়ে আসছে শৈত্যপ্রবাহ ‘কনকন’। ‘কনকন’ এর প্রভাবে তাপমাত্রা নামতে পারে ৬ ডিগ্রিতে। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার তথ্য মতে আগামী কয়েক দিনে আসন্ন এই শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে শীত আরও তীব্র হতে পারে ।

তীব্র শীতের কারণে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া ও নিম্ন আয়ের মানুষ। এছাড়া ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও প্রবীণরা। বিশেষ করে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ, ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাস শিশু ও বয়স্কদের স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশে শীত মোকাবিলার প্রস্তুতি সীমিত হওয়ায় শিশু ও প্রবীণদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে না ওঠায় তারা সহজেই ঠাণ্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। শীতকালে শিশুদের মধ্যে সর্দি-কাশি, জ্বর, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিওলাইটিস ও ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়ে যায়। বিশেষ করে নবজাতক ও এক বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এসব রোগ প্রাণঘাতীও হতে পারে। অনেক দরিদ্র পরিবারে পর্যাপ্ত গরম কাপড়, মোজা কিংবা কম্বলের অভাবে শিশুরা সারারাত ঠাণ্ডায় দুর্ভোগ পোহাতে থাকে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে প্রবীণদের জন্য শীত আরও বেশি বিপজ্জনক। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায়। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, হাঁপানি কিংবা বাতের সমস্যায় ভোগা প্রবীণদের ক্ষেত্রে শীতকালীন জটিলতা বহুগুণ বেড়ে যায়। ঠাণ্ডার কারণে রক্তনালি সংকুচিত হয়ে হৃদযন্ত্রে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়, যা হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি শীতের সকালে কুয়াশার কারণে পিচ্ছিল পথে পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার ঘটনাও প্রবীণদের মধ্যে অহরহ দেখা যায়।

তীব্র শীত থেকে শিশু ও প্রবীণদের সুরক্ষায় প্রথম ও প্রধান করণীয় হলো পর্যাপ্ত গরম কাপড় নিশ্চিত করা। শিশুদের ক্ষেত্রে একাধিক স্তরের নরম ও আরামদায়ক পোশাক পরানো উচিত। মাথা, কান, গলা ও পা ভালোভাবে ঢেকে রাখা জরুরি, কারণ এসব স্থান দিয়ে শরীরের তাপ দ্রুত বের হয়ে যায়। প্রবীণদের ক্ষেত্রেও ঢিলেঢালা কিন্তু উষ্ণ পোশাক পরা প্রয়োজন। রাতে ঘুমানোর সময় কম্বল বা কাঁথা ব্যবহার এবং ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রেখে ঠাণ্ডা বাতাস প্রবেশ রোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Manual3 Ad Code

খাদ্যাভ্যাস শীতকালে শরীরকে সুস্থ ও উষ্ণ রাখতে বড় ভূমিকা রাখে। শিশু ও প্রবীণদের পুষ্টিকর ও উষ্ণ খাবার খাওয়াতে হবে। গরম দুধ, স্যুপ, খিচুড়ি, ডাল, শাকসবজি ও মৌসুমি ফল শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। শীতকালে তৃষ্ণা কম অনুভূত হলেও পর্যাপ্ত পানি পান করানো জরুরি। প্রবীণদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন এবং শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

Manual8 Ad Code

শীতকালে স্বাস্থ্য সুরক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিচ্ছন্নতা ও সতর্কতা। শিশুদের ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল না করানোই উত্তম; প্রয়োজনে হালকা গরম পানি ব্যবহার করা উচিত। ঘন কুয়াশা থাকলে শিশু ও প্রবীণদের অপ্রয়োজনে বাইরে বের না করা নিরাপদ। বাইরে যেতে হলে মুখ ঢেকে রাখা, গরম জুতা ও মোজা পরা এবং ধুলাবালি এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। শীতজনিত অসুস্থতার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

Manual4 Ad Code

শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও শীতকালে গুরুত্ব পাওয়া উচিত। দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতর বন্দি থাকা, সূর্যালোকের অভাব ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে শিশুদের মধ্যে অস্থিরতা এবং প্রবীণদের মধ্যে একাকীত্ব ও বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে। তাই দিনের বেলায় রোদে বসা, হালকা হাঁটাচলা এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটানোর ব্যবস্থা করা জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে গল্প বলা, খেলাধুলা বা পড়াশোনার মাধ্যমে মানসিক স্বস্তি দেওয়া যেতে পারে।

তীব্র শীতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে গ্রাম, চর ও বস্তিতে বসবাসকারী মানুষ। অনেক ঘরবাড়ি শীত প্রতিরোধে উপযোগী নয়, ফলে রাতের বেলা ঠাণ্ডা সরাসরি শরীরে আঘাত হানে। এ অবস্থায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও যুবসমাজের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। শীতবস্ত্র বিতরণের পাশাপাশি শিশু ও প্রবীণদের আলাদা করে চিহ্নিত করে সহায়তা দেওয়া হলে তা আরও ফলপ্রসূ হয়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শৈত্যপ্রবাহের আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, কম্বল বিতরণ, আশ্রয়কেন্দ্র চালু এবং কমিউনিটি ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে প্রস্তুত রাখা জরুরি।

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত স্বাস্থ্যবিষয়ক বার্তা প্রচার করলে মানুষ আরও সচেতন হয় এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, তীব্র শীত শিশু, প্রবীণ, ছিন্নমূল ও বস্তিবাসীদের জন্য নীরব এক হুমকি। একটু সচেতনতা, পারিবারিক যত্ন, সামাজিক সহানুভূতি এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ একসাথে থাকলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। শীতের এই মৌসুমে আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব হলো- শিশু, প্রবীণ, ছিন্নমূল ও বস্তিবাসীদের উষ্ণতা, নিরাপত্তা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, যাতে কোনো জীবন অবহেলা বা অসচেতনতায় ঝরে না পড়ে।

Manual5 Ad Code

লেখক: তথ্য সহকারী, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, সিলেট।

 

 

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code