Main Menu

গণভোট : রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক মুহূর্ত

Manual7 Ad Code

মো: শুভ : গণভোট হলো রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণের একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এ ব্যবস্থায় জনগণের হয়ে কেউ সিদ্ধান্ত নেয় না; বরং নাগরিকরা নিজেরাই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেন। জাতিসংঘের সংবিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত নথি ও বিভিন্ন দেশের গণতান্ত্রিক অনুশীলন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- সংবিধান প্রণয়ন বা সংশোধন, কোনো আইন প্রণয়ন কিংবা বাতিল এবং শাসনব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনের মতো বড় সিদ্ধান্তে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত নেওয়াই গণভোটের মূল উদ্দেশ্য। গণমানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর এই প্রক্রিয়াই গণভোট নামে পরিচিত।

গণভোটকে কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে নির্বাচন কমিশন সময়োপযোগী একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোট (ICPV) বা ডাকযোগে ভোটদানের ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিক, নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, নিজ নির্বাচনি এলাকার বাইরে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী, আইনগত হেফাজতে থাকা ভোটার এবং নির্বাচনি দায়িত্বে নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। এতে ভোটাধিকার আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে, যা গণভোটের প্রতি জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণ বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের বিধান প্রথম যুক্ত হয় দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে, যদিও পরবর্তীতে পঞ্চদশ সংশোধনীতে তা বাতিল করা হয়। চলতি বছরের জুলাই মাসে হাইকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করেন। এই প্রেক্ষাপটে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো গণভোট বাস্তবায়নে নানামুখী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এবার চতুর্থবারের মতো গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। অতীতে প্রতিবারই গণভোটের মাধ্যমে দেশ বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছে। ১৯৭৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম প্রশাসনিক গণভোটে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনের ওপর আস্থা বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ৯৮ দশমিক ৮০ শতাংশ ভোট ‘হ্যাঁ’ পড়ে। ১৯৮৫ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বৈধতা প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৯৪ দশমিক ১৪ শতাংশ ভোট ‘হ্যাঁ’ আসে। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক গণভোটে রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রূপান্তরের পক্ষে ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ ভোট পড়ে। প্রতিটি গণভোটই রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ- ২০২৫’- এর ওপর গণভোট। রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত এই জুলাই সনদে ৮৪টি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

জুলাই সনদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো ক্ষমতার মেয়াদ সীমিত করা। গণভোটে সংবিধানে সংশোধনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর বা পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। ২০২৫ সালের জুলাই ও অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংলাপে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই প্রস্তাবের পক্ষে ঐকমত্য পোষণ করে। এর মাধ্যমে ‘আমি ছাড়া দেশ চলবে না’- এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি চিরতরে ভেঙে পড়বে।

ইন্টারনেটকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়াও জুলাই সনদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আধুনিক রাষ্ট্রে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, ই-কমার্স ও ফ্রিল্যান্সিংসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইন্টারনেট অপরিহার্য। নির্বিচারে ইন্টারনেট বন্ধ বা ‘কিল সুইচ’ ব্যবহারের ফলে নাগরিক অধিকার ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তাই গণভোটের মাধ্যমে ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ, আইনি স্বচ্ছতা ও নীতিমালা প্রণয়নের দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।

গণভোটে হলে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো-গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র- কোনো একক সরকার বা অনির্বাচিত শক্তি পরিবর্তন করতে পারবে না। বিশেষ ক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধনের জন্য গণভোট বাধ্যতামূলক হবে, যা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র আরও সুসংহত করবে।

এছাড়া বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গণভোটের একটি বড় ইস্যু। বিচার বিভাগ নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত থাকবে। বিভাগীয় পর্যায়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ ও উপজেলা পর্যায়ে আদালত স্থাপনের পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

Manual2 Ad Code

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ এবং স্বচ্ছ নির্বাচনি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সব মিলিয়ে গণভোট মানে কেবল একটি ভোট নয়; এটি জনগণের সম্মতিতে রাষ্ট্র সংস্কারের একটি আইনি ভিত্তি। গণভোটে মধ্য দিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তব রূপ পাবে। (পিআইডি ফিচার)

লেখক: অফিস সহকারী, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, তথ্য অধিদফতর, সিলেট।

 

Manual6 Ad Code

 

 

 

Manual6 Ad Code

 

 

Manual6 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code