Main Menu

শবে বরাতের ফযিলত ও আমাদের করণীয়

Manual5 Ad Code

আতিকুর রহমান নগরী: আল্লাহ তা’লা যাকে ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা মর্যাদা দান করেন, ফযিলত বা শ্রেষ্ঠত্ব তারই হাতে। এই চিরন্তর বিধান অনুযায়ী এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তির উপর, এক নবী অন্য নবীর উপর, এক জনপদকে অন্য জনপদের উপর, এক সাহাবীকে অন্য সাহাবীর উপর, এক মাসকে অন্য মাসের উপর, এক দিবসকে অন্য দিবসের উপর এক রজনীকে অন্য রজনীর তিনি শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছেন। রমযান মাস সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, জুমার দিন সপ্তাহের সাতদিনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। অনুরূপ শবে বরাত, শবে ক্বদরের মর্যাদা অন্যান্য রাতের তুলনায় অনেক গুণ বেশী। প্রত্যেক মানুষের এটাই কাম্য হওয়া উচিত যে তার জীবনের মূল্যবান মুহুর্তগুলি ইবাদতে ইলাহিতে ব্যয় হোক এবং বেশি বেশি কল্যাণের অধিকারি হোক। কিন্তু মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, সীমাবদ্ধ তাহার আয়ূ। আবার এর উপর রয়েছে অনেক বাধা-বিঘœ যার কারণে সে গন্তব্যস্থান পর্যন্ত পৌছতে সক্ষম হয় না। ইহা দয়ামনের অসীম দয়া যে, তিনি স্বীয়-বান্দাগণের প্রতি অনুগ্রহ করে তাহাদের জীবনে কল্যাণ দান ও অফুরন্ত সওয়াব হাসিল করার জন্য বিশেষ বিশেষ ‘দিবস’ দান করিয়াছেন।

শবে বরাত হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত অনুরূপ এক বরকতময় সুবর্ণ সুযোগ। শবে বরাত (লাইলাতুল বরাত) “শব” হচ্ছে ফার্সি শব্দ এর অর্থ রাত, রজনী। বারাআতুন হল আরবী শব্দ এর অর্থ হচ্ছে নাজাত, নিস্কৃতি। যেহেতু, এই রাতে আল্লাহ তায়ালার প্রিয় বান্দারা তাওবা, ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে ক্ষমা প্রাপ্ত হয়ে দোযখ থেকে নাজাত ও নিস্কৃতি লাভ করে থাকেন। তাই এই রাত্রির নাম “লাইলাতুল বারাআত” এরই সংক্ষিপ্ত নাম “শবে বরাত”। এই রাত্রিটি হল শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত এবং ১৫ই শাবানের পূর্বে রাত্রিটি। হাদীসে ইহাকে বলা হয়েছে “লাইলাতিন নিছফি মিন শা’বান”। অর্থাৎ অর্ধ শাবানের রাত্রি।

সারা বৎসরের যাবতীয় ফয়সালা হায়াত (জীবন), মওত (মৃত্যু) রিযিক্ব, ধন-সম্পদ, আমল ইত্যাদির সহিত সম্পর্ক যুক্ত আদেশ-নিষেধ সমূহ উক্ত রাত্রিতে লওহে মাহফুজ থেকে উদ্ধৃত করিয়া কার্যনির্বাহি ফেরেস্তাদের নিকট সোপর্দ করা হয়। হতে পারে, শাবানের পনের তারিখ রাত হইতে এই কাজ শুরু হয় এবং শবে ক্বদরে তাহার পরিসমাপ্তি ঘটে। তফসীরে আশরাফীতে উল্লেখ আছে যে, উভয় রাত্রিতে (শবে বরাত-শবে ক্বদর) উপরোক্ত বিষয়াদির মিমাংশা হইয়া থাকে।

মহানবী সা. বলেন, অর্থাৎ “খুশী তাহার জন্য, যে শা’বান চাঁদের মধ্য (পনের তারিখ) রাতে ইবাদতে মগ্ন থাকে।” অপর এক হাদীসে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. হইতে বর্ণিত যে, রাসূল সা. বলেছেন “হে মুমিনগণ! তোমরা শা’বান মাসের মধ্যম (পনের তারিখ) রাতে জাগ্রত থাক। কেননা এ রাত অতি বরকতময়। এরাতে আল্লাহপাক বলিতে থাকেন, হে বান্দাগণ! তোমাদের মধ্যে ক্ষমা প্রার্থনাকারী কেহ আছ কি? আমি তাহাকে ক্ষমা করিব। অন্য এক হাদীসে বর্ণিত আছে যে, “যে ব্যক্তি শা’বান মাসের পনের তারিখ রোযা রাখিবে, দোযখের আগুন কখনও তাহাকে স্পর্শ করবেনা”।

শবে বরাতের ফযিলত
১। এই রাতে আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহ মুমিনদের উপর বর্ষিত হয়।
২। এই রাতে আল্লাহর দরবারে মানুষের আমল সমূহ পেশ করা হয়।
৩। এই রজনীতে মানুষের এক বৎসরের রিযিক নির্ধারিত হয়।
৪। এই রাতে পরবর্তী এক বৎসরের মৃত্যুবরণকারীদের নাম তালিকাভুক্ত হয়।
৫। এই রাতে পরবর্তী এক বৎসরের জন্মগ্রহণকারীদের নামও তালিকাভুক্ত করা হয়।
৬। এই রাতে বিশেষ ধরণের অপরাধী ছাড়া বাকি সকলকে মাফ করা হয়।
৭। এই রাতের মাঝামাঝি সময়ে নবীজি সা. মদীনা শরীফের প্রসিদ্ধ গোরস্তান বাকী এ গরক্বদে গমন করিয়া শহীদগণের মাযার যিয়ারত করেন।
৮। এই রাতে যমযমের পানি সুমিষ্ট হয়।
৯। এই রাতে “বনী কালব” বনী রবী, এবং মুদার গোত্রের সমগ্র ভেড়া-বকরির পশমের সংখ্যা পরিমাণ গোনাহগার বান্দাদের ক্ষমা করা হবে।

“লাইলাতুম মুবারাকা”
তাফসীর বিশারদগণের অভিমত হল যে, “সূরা দুখানে” উল্লেখিত “লাইলাতুম মুবারাকা’র দ্বারা শবে বরাতকে বুঝানো হয়েছে।

এই অভিমত পোষণকারীদের মধ্যে কেউ কেউ শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভির নাম উল্লেখ করেছেন। হযরত ইকরামা রা. এই আয়াতে উল্লেখিত “লাইলাতুম মুবারাকার” তাফসীরে ১৫ শাবানের রাতকে নির্ধারিত করেছেন।-সূরা দুখান

মহান এ রাতে ক্ষমার অযোগ্য যারা :
(১) মুশরিক, (২) যাদুঘর (৩) গণক (৪) ঈষা পরায়ণ (৫) না-হক্ব হত্যাকারী (৬) গায়ক (৭) বাদক (৮) ভাগ্য ও ভবিষ্যত বর্ণনাকারী (৯) আত্মীয়দের সাথে ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া সম্পর্ক ছিন্নকারী (১০) পরস্পর শত্রæতার ভাবপোষণকারী (১১) জালিম শাষক ও তাহাদের সহযোগী (১২) মিথ্যা শপথের সাহায্যে পণ্য বিক্রেতা (১৩) পায়ের গিরার নিচে কাপড় পরিধানকারী (১৪) মদ্যপানকারী। (১৫) পরস্ত্রীগামী (১৬) মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান (১৭) কৃপণ ব্যক্তি (১৮) পরোক্ষ নিন্দাকারী (১৯) অন্যায়ভাবে শুল্ক আদায়কারী (২০) দাবা পাশার খেলোয়ার।

Manual1 Ad Code

শবে বরাতের নামাযের নিয়ম কানুন: এশার ফরয ও সুন্নত দুই রাকাতের পরে বিতির নামায না পড়িয়া শবে বরাতের নফল নামায সমূহ আদায় করিতে হয়। কত রাকাত পড়িতে হবে তার কোন সীমারেখা নেই। যতবেশী পড়া যায় ততই ভালো।
এই রাতে শুধু নফল নামায পড়িতে হবে এমন কোন কথা নয়। নফল নামাযের সাথে অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগী, যেমন: কোরআন তেলাওয়াত দোয়া দূরূদ, তাসবীহ-তাহলীল, যিকির-আযকার করিলেও অশেষ সওয়াব পাওয়া যায়। শবে বরাতের নামাযের নিয়ত নিচে দেয়া হল।

উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন্-উসাল্লিয়া লিল্লাহি তা’লা রাকাআতাই সালাতিল লাইলাতিল বারাআতি নাফলি, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’বাতিশ শারীফাতি আল্লাহু আকবার। শবে বরাতের রাত্রে আমাদের করণীয়: আমাদের সমাজে এমন অনেক মূর্খ লোক পাওয়া যায় যারা এই রাত্রে দলবেধে পায়ে হেঁটে, গাড়িতে চড়ে জোড়ে “আল্লাহর নাম অর্থাৎ যিকির করে রাস্তা-ঘাটে, মসজিদে মাজারে ঘুড়ে বেড়ায় হাসি খুশী করে।

১। তাদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ যে, আল্লাহর ইবাদত একাগ্রতার সহিত খালিছ দিলে হওয়া উচিত। দলবেধে মিছিল সহকারে আল্লাহর ইবাদত হয়না বরং তাতে গুনাহের কাজ হয়।
সুতরাং মনে রাখা উচিত আল্লাহ হচ্ছেন সর্বশ্রোতা, ক্ষমাশীল দয়াময় নিচু স্বরে যিকির-আযকার করলে অন্যজনের অসুবিদা হবে না। তাতে আল্লাহও আপনার উপর সন্তুষ্ট হবেন।
২। মাজার যিয়ারত করা কোন গুনাহের কাজ নয়। কিন্তু মাজার যিয়ারতের নিয়ম কানুন বজায় রেখে করা উচিত। মাজারে মোমবাতি, আগরবাতি, জ্বালালো মারাত্মক গুনাহের কাজ। এ থেকে আমরা বিরত থাকব। অন্যকে বিরত রাখবো।

Manual1 Ad Code

পরিশেষে, আমি মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করি তিনি সমগ্র দুনিয়ার মুসলমানকে ক্বোরআন হাদীসের আলোকে পবিত্র রজনী “শবে বরাত” আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে কাটিয়ে দেয়ার তৌফিক দান করেন। আমিন।

লেখক: আলেম, সাংবাদিক।

Manual7 Ad Code

 

Manual4 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code