উন্নয়নের পথে সিলেট–ম্যানচেস্টার ফ্লাইট অপরিহার্য সংযোগ
শাহ মনসুর আলী নোমান: জীবন জীবিকার তাগিদ এবং উচ্চ শিক্ষার্থে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের মানুষ ইউরোপ আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান এবং স্থায়ীভাবে বসবাস দীর্ঘদিন থেকেই। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের মানুষের বসবাস সেই ব্রিটিশ আমলে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশী অভিবাসীরা মা, মাটি, দেশ ও শেকড়ের টানে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তৎকালীন পাকিস্তানি অত্যাচারী বাহিনী কর্তৃক বাংলার নিরীহ জনগণের উপর অত্যাচার, নির্যাতন ও হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে ২৮ মার্চ ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম শহরের স্মলহিথ পার্কে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক জনতা।
যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে বসবাসকারী বাংলাদেশের মানুষ বিভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে জনমত গঠনে অগ্রনায়কের ভূমিকা পালন করেন।বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার পক্ষে তৎপরতা চালিয়েছেন। তাঁরা নিজের ব্যবসা ও কাজকর্ম ফেলে লন্ডনস্থ পাকিস্তানী হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ ও অনশন করেছেন। বিদেশি দূতাবাসে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অফিসে যোগাযোগ করে পাকিস্তানি সৈন্যদের বাংলাদেশে নিরীহ জনগণের উপর নির্যাতনের কথা তুলে ধরেছেন। যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত প্রবাসীরা চাঁদা তুলে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য টাকা পাঠিয়েছেন। যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের মুক্তিযুদ্ধের সময় তোলা চাঁদার পরিমাণ তিন লক্ষ ৯২ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড যা স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছিল।
‘তৃতীয় বাংলায় মুক্তিযুদ্ধ’ গ্রন্থের লেখক মাহমুদ এ রউফ বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ”বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলার বাইরে ১৯৭১ সালে সবচেয়ে বেশি বাঙালির সংখ্যা ছিল ব্রিটেনে। এবং এখানকার বাঙালিরা অস্ত্র হাতে না নিলেও স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য যা করেছে তা যুদ্ধের সমান।”
বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনেক পূর্ব থেকেই যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশীরা দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি,ভাষা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এমনকি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি অভিবাসীরা ফরেন রেমিটেন্স, ব্যবসা-বাণিজ্য,সামাজিক ও সাংগঠনিক উদ্যোগ গ্রহণ করে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে দৃষ্টান্তমূলক অবদান রেখেছেন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ বিমানের সিলেট-ম্যানচেস্টার রুটের ফ্লাইটটি আগামী ০১ মার্চ থেকে সাময়িকভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দেয়ায় যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রতিবাদে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সংগঠন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে সভা সমাবেশ করে বাংলাদেশ বিমানের এই ফ্লাইটটি যাতে বন্ধ না হয় সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই ফ্লাইটটি যেন বন্ধ না হয়, সেজন্য বর্তমান সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ যথাযথ কর্তৃপক্ষ বরাবরে অনুরোধ জানিয়েছেন। বিমানের সিলেট-ম্যানচেস্টার রুটের ফ্লাইটটি লাভজনক হওয়া সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্তে হতাশ যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশের মানুষ। দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে ‘সিলেট- ম্যানচেস্টার’ রুটের ফ্লাইটটি।এটি বন্ধ হলে বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন ও সম্ভাবনার উপর বিরূপ প্রভাব পড়বে,চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের উন্নয়ন।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস ২৫ আগস্ট ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া তাঁর প্রথম ভাষণ এবং বিভিন্ন সময় তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পিছনে প্রবাসীরা দেশের মূল চালিকাশক্তি এবং দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রবাসীরা দেশে অতিথির মত সম্মান পাবেন। প্রবাসীরা যাতে দেশে আরামদায়ক ও স্বাচ্ছন্দে আসা-যাওয়া করতে পারেন সে লক্ষ্যে ব্যবস্থা নেবেন বলে উল্লেখ করেন।
২৪ এপ্রিল ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) পরিবেশিত দৈনিক ইত্তেফাকের (অনলাইন সংস্করণ) সংবাদ থেকে জানা যায়, প্রধান উপদেষ্টা প্রবাসীদের দেশে আসা-যাওয়া শান্তিপূর্ণ করতে তিনি সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে ঘোষণা দেন।
প্রধান উপদেষ্টা কর্তৃক প্রবাসীদের উন্নয়ন ও নিরাপত্তায় বিভিন্ন উদ্যোগের কথা প্রশংসিত হলেও বাংলাদেশ বিমানের এই সিদ্ধান্তে বেদনার্ত যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশী জনসমাজ। এপ্রিল এবং জুন মাসে দীর্ঘ সময় স্কুল হলিডে থাকায় যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিরা সন্তানদের নিয়ে দেশে আসেন।অনেক বয়স্ক মানুষ আছেন যারা ট্রানজিট বা কানেক্টিং ফ্লাইট এর মাধ্যমে দেশে আসলে অনেক কষ্ট হয়ে যাবে অথবা দেশে আসার উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন। এমনকি ব্যবসা-বাণিজ্যিক প্রয়োজনে লোকজন সিলেট – ম্যানচেস্টার ফ্লাইটে অল্প সময়ে দেশে আসতে পারেন। এতে করে তাদের সময়ের অনেক সাশ্রয় হয়।
গ্রেটার ম্যানচেস্টার ও নর্থ ওয়েস্ট অঞ্চল, ইউর্কশায়ার কাউন্টি, ল্যাঙ্কাশায়ার কাউন্টি, নিউক্যাসেল, স্কটল্যান্ড এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক বাংলাদেশী মানুষের মধ্যে সিংহভাগ মানুষ সিলেট অঞ্চলের বাসিন্দা। তাই সিলেটে অঞ্চলের মানুষের জন্য ফ্লাইটটি খুবই আরামদায়ক। ফ্লাইটটি বন্ধ হয়ে গেলে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে। দেশে আসতে সময় বেশি লাগবে বলে তাঁরা নিরুৎসাহিত হবেন এবং দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। সীমাহীন দুর্ভোগ এবং ভোগান্তিতে পড়বেন সিলেট অঞ্চলের এক বিরাট জনগোষ্ঠী।
সিলেট-ম্যানচেস্টার রুটের ফ্লাইট স্থগিতের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের গ্রেটার ম্যানচেস্টার ও নর্থ ওয়েস্ট অঞ্চলের আটজন সংসদ সদস্য। চিঠিতে এমপিরা উল্লেখ করেন সিলেট-ম্যানচেস্টার রুট যুক্তরাজ্যের বৃহৎ বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য যোগাযোগ মাধ্যম। অসুস্থ স্বজনের খোঁজ নেওয়া, মৃত্যুজনিত জরুরি ভ্রমণ, চিকিৎসা ও পারিবারিক প্রয়োজনে অনেক বাংলাদেশী মানুষ এই সরাসরি ফ্লাইটের ওপর নির্ভরশীল। এমপিরা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে বাংলাদেশ হাইকমিশন ও সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে রুটটি স্থগিতের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা এবং যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশী অভিবাসীদের সামাজিক ও মানবিক দিক বিবেচনার পাশাপাশি নর্থ ওয়েস্ট ইংল্যান্ডের জন্য এই রুটের দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব রয়েছে উল্লেখ করেন।
যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশী জনসমাজ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন, অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছেন।এখনও তাঁরা দেশের শিল্প-সাহিত্যের বিকাশে অনন্য অবদান রেখে যাচ্ছেন, দেশের দুর্দিনে, নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের কল্যান ও মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। সিলেট – ম্যানচেস্টার ফ্লাইট চালু থাকলে এর সুফল বহুমুখী। যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী সহজে ও দ্রুত দেশে আসতে পারবেন।দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।দেশ শিক্ষা, সংস্কৃতি,ইতিহাস,ঐতিহ্য এবং পর্যটন খাত প্রচুরভাবে লাভবান হবে। বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি যোগাযোগ ও দেশের ভাবমূর্তি অনেক বৃদ্ধি পাবে,যা দেশের অর্থনীতি,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিরাট ইতিবাচক অর্জন।
সিলেট-ম্যানচেস্টার রুটের বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটটি বন্ধ হলে সারা দেশে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম ও বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। প্রবাসীরা এবং তাদের সন্তানেরা দেশে আসতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। জাতীয় স্বার্থে এই রুটের ফ্লাইট চালু রাখার বিষয়ে সম্মানিত প্রধান উপদেষ্টার জরুরী সুদৃষ্টি প্রয়োজন।
লেখক: গবেষক, শিক্ষা প্রশাসক ও কলামিস্ট, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার-নর্থ ইস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।
Related News
সিলেট সীমান্তে প্রাণহানি, অপরাধ আর রাজনৈতিক নীরবতার অস্বস্থিকর বাস্তবতা
Manual5 Ad Code হোসাইন আহমদ সুজাদ: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয়Read More
গণভোট : রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক মুহূর্ত
Manual8 Ad Code মো: শুভ : গণভোট হলো রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তে জনগণের সরাসরিRead More



Comments are Closed