Main Menu

সিয়াম সাধনা তাৎপর্য ও শিক্ষা

Manual4 Ad Code

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: মাহে রমজান আমাদের মাঝে এসেছে তাকওয়া আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম এবং মহান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের ইস্পাতদৃঢ় চেতনা নিয়ে। নানা কারণে ও তাৎপর্যে এ মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয়। রমজান রোজার মাস, পবিত্র কুরআন নাজিলের মাস, লাইলাতুল কদরের মাস, বদর যুদ্ধের মাস, তারাবিহ, কুরআন তেলাওয়াত, ইতেকাফ, দান-খয়রাতসহ অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগির মাস। ত্যাগ-তিতিক্ষা সংযম, সমবেদনা ও সহমর্মিতার বার্তাবহ মাস রমজান। রহমত (অনুগ্রহ) মাগফিরাত (ক্ষমা) ও নাজাতের (জাহান্নাম থেকে মুক্তির) মাস রমজান। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের ওপর যে রোজার বিধান দেওয়া হয়েছে, এ রোজার উদ্দেশ্য কী তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নিজেই ঘোষণা করেছেন। হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পার। (সূরা : বাকারা : ১৮৩)।

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতায়ালা পবিত্র রমজান মাসে রোজা ফরজ করেছেন তাকওয়া অর্জনের জন্য। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রোজার উদ্দেশ্য সম্পর্কে লিখেছেন-রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে তার পাশবিক ইচ্ছা ও জৈবিক অভ্যাস থেকে মুক্ত করা এবং জৈবিক চাহিদার মধ্যে সুস্থতা ও স্বাভাবিকতা প্রতিষ্ঠা করা। ইমাম গাজ্জালী (রহ.) ইয়াহইয়াউল উলুমদ্দিন গ্রন্থে লিখেছেন, আখলাকে ইলাহি তথা ঐশ্বরিক গুণে মানুষকে গুণান্বিত করে তোলাই রোজার উদ্দেশ্য। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জন করে। শারীরিক ও আত্মিক শক্তির উন্নতি সাধন করে।

Manual7 Ad Code

ইসলামে যেসব ইবাদতের সওয়াব ও পুরস্কার সর্বাধিক তার মধ্যে রমজানের রোজা অন্যতম। অন্য কোনো ইবাদতের ফজিলত এত বেশি আলোচিত হয়নি। হজরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ইমান ও সওয়াবের নিয়তে রমজানের রোজা রাখবে, আল্লাহ তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেবেন, (বুখারি ও মুসলিম)। রমজান মাস এলে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, (বুখারি ও মুসলিম)। রমজান মাস এলে রহমতের দুয়ার খুলে দেওয়া হয়, (বুখারি ও মুসলিম)। রমজান সবরের মাস, আর সবরের পুরস্কার হলো জান্নাত, (বায়হাকি)। রমজানে মোমিনের জীবিকা বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়, (বায়হাকি)। যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, ওই রোজাদারের পুরস্কারের কমতি হবে না, (বায়হাকি)। যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো রোজাদারকে তৃপ্তিসহকারে আহার করাবেন; আল্লাহ তাকে হাউজে কাওসার থেকে পান করাবেন। এরপর জান্নাতে প্রবেশ পর্যন্ত সে আর তৃষ্ণার্ত হবে না, (বায়হাকি)।

Manual2 Ad Code

রোজা আদায়ের মাধ্যমে মানবহৃদয়ে তাকওয়া সৃষ্টি হয়। আল্লাহকে ভয় করার নামই তাকওয়া বা খোদাভীতি। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্বকে অপরাধমুক্ত করতে হলে এ তাকওয়ার কোনো বিকল্প নেই। লোকচক্ষুর অন্তরালে, পুলিশি প্রহরা যেখানে নিষ্ক্রিয়, রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী যেখানে যেখানে অপারগ, স্যাটেলাইটের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেখানে অসহায়, সেখানেও আল্লাহর ভয় একজন ব্যক্তিকে অপরাধমুক্ত রাখতে পারে। তাকওয়া মূলত নিজের জন্য নিজেই প্রহরী। আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।

রোজা ঢালস্বরূপ। রোজা মানুষকে ষড়রিপুর আক্রমণ থেকে ঢালস্বরূপ বাঁচিয়ে রাখে। কাম, ক্রোধ, লোভ-লালসা ইত্যাদি রিপুর তাড়নায় মানুষ বিপথগামী হয়ে ধ্বংসের মুখোমুখি হয়; রোজা মানুষের এসব কুপ্রবৃত্তি দমন করে। এ কারণেই মহানবি (সা.) বলেছেন, আস্সাওমু জুন্নাতুন অর্থাৎ রোজা ঢালস্বরূপ। রোজা উন্নত চরিত্র গঠনের কারিগর।

Manual1 Ad Code

রমজানের রোজা মূলত একটি প্রশিক্ষণ কোর্স। এ কোর্সের প্রশিক্ষক স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। সমগ্র মুসলিম উম্মাহ সেই প্রশিক্ষণ কোর্সের প্রশিক্ষণার্থী। প্রশিক্ষণ কোর্সের সিলেবাস হলো রোজার নিয়ম-কানুন, ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও নফলগুলো। আর তার ফলাফল তথা নম্বরপত্র হিসাবে বলা যায় তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন। তাকওয়া অর্জনই মূলত সিয়ামের মূল টার্গেট। সিয়াম পালন করে যে ব্যক্তি তাকওয়া অর্জন করতে পারেনি সে ব্যক্তি হলো ওই কৃষকের মতো, যে চাষাবাদ করল পুরো মৌসুম ধরে কিন্তু ফসল ঘরে উঠাতে পারল না। তার পরিশ্রম-ঘাম সবই বৃথা গেল। এবার সে না খেয়ে অনাহারে তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি সিয়াম নামক এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করতে পারবে না-সে হাশরের ময়দানে লাঞ্ছিত-বঞ্চিত ও অপমানিত হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। আমরা হাদিস শরিফ থেকেই জানতে পারি ‘যে ব্যক্তি রমজান মাস পেল কিন্তু গুনাহ মাফ চেয়ে নিতে পারল না; সে অবশ্যই ধ্বংসে নিপতিত হবে।’ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সেসব প্রশিক্ষণার্থীদের সারিতে শামিল হওয়ার তাওফিক দান করুন, যারা সিয়ামের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মিক ও সমাজ সংস্কারের মধ্য দিয়ে তাকওয়া অর্জনের ফলে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং জান্নাত লাভে ধন্য হবে। আমিন।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, পাঠানপাড়া (খানবাড়ি) কদমতলী, সদর-সিলেট।

 

 

 

Manual3 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code