সময়ের সাক্ষী আলী আমজাদ ঘড়ি: সিলেটের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের নীরব প্রহরী
মোহাম্মদ মহসীন: বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সুরভী বেড়াতে এসেছেন বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মণিকোঠা, প্রকৃতি কন্যা সিলেটে। এতদিন শুধু সবার মুখে-মুখে, পত্রপত্রিকা, টিভি কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সিলেটের সৌন্দর্যের কথা শুনেছেন; এবার সেই সৌন্দর্য স্বচক্ষে দেখার পালা। বাবা সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ায় সিলেট সার্কিট হাউসে সপরিবারে অবস্থান করবেন তারা। বিকেলে রওনা দিয়ে সিলেটে এসে পৌঁছান রাত বারোটায়। রূপসী নদী সুরমার পাড়ের নান্দনিক স্থাপনা আর নদীর বুকে ভেসে থাকা রূপালি ঢেউয়ের চিকচিক করা সৌন্দর্যে বিমোহিত সুরভীর চোখ ঠিক তখনই থমকে যায়। নিস্তব্ধ রাতকে খানখান করে ভেঙে টালমাটাল শব্দে বেজে ওঠে-ঢং ঢং ঢং-গুনে গুনে বারোটি ঘণ্টাধ্বনি। তখন বুঝতে আর বাকি থাকে না, বারোটা বেজেছে। এটি ঘড়ির শব্দ- আলী আমজাদ ঘড়ি।
কেউ একে আলী আমজদ, কেউ আবার আলী আমজাদ ঘড়ি নামে চেনেন। সিলেট কেবল তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্যও সমাদৃত। এই শহরে পা রাখলেই যে নিদর্শনগুলো দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ক্বীন ব্রিজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক ঘড়ি। সময় জানানোর একটি যন্ত্রের সীমা ছাড়িয়ে আলী আমজাদ ঘড়ি হয়ে উঠেছে সিলেটের মানুষের গৌরব, আত্মপরিচয় ও ইতিহাসের প্রতীক।
উনিশ শতকের শেষ দিকে নির্মিত এই ঘড়িটি সিলেটের নবাব পরিবারের সন্তান ও তৎকালীন জগন্নাথপুরের জমিদার নবাব আলী আমজাদের উদ্যোগে স্থাপিত হয়। সমাজসেবক ও আধুনিক চিন্তাধারার অধিকারী নবাব আলী আমজাদ সিলেটবাসীর জন্য একটি স্থায়ী নিদর্শন রেখে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই ব্রিটিশ আমলে এই ঘড়ি নির্মাণ করেন। সে সময় উপমহাদেশে এ ধরনের ঘড়ি টাওয়ার ছিল অত্যন্ত বিরল। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই এটি সাধারণ মানুষের কৌতূহল ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
আলী আমজাদ ঘড়ি টাওয়ারের স্থাপত্যে ইউরোপীয় ও উপমহাদেশীয় রীতির এক সুন্দর মেলবন্ধন দেখা যায়। উঁচু টাওয়ার আকৃতির এই স্থাপনার চারদিকে বসানো ঘড়িগুলো শহরের বিভিন্ন দিক থেকে সময় দেখার সুযোগ দেয়। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে ঘড়ির কাঁটা ও ঘণ্টাধ্বনি সিলেট শহরের মানুষের জীবনে সময়ের দিকনির্দেশনা দিয়ে এসেছে।
একসময় এই ঘড়ির ঘণ্টাধ্বনিই ছিল সিলেটের দৈনন্দিন জীবনের ছন্দ। বাজার খোলার সময়, নামাজের সময় কিংবা সরকারি অফিস শুরুর সংকেত হিসেবে ঘড়ির শব্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। সাধারণ মানুষ নিজেদের কাজের সময়সূচি মিলিয়ে নিত এই ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে। ফলে আলী আমজাদ ঘড়ি ধীরে ধীরে সিলেটবাসীর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
সিলেটের মানুষ এই ঘড়িকে ঘিরে অগণিত স্মৃতি ও গল্প লালন করে। অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের স্মৃতিতে আজও ভাসে সেই সময়, যখন আলী আমজাদ ঘড়ির শব্দ এতটাই স্পষ্ট ছিল যে দূরের গ্রাম থেকেও তা শোনা যেত। কেউ কেউ বলেন, এই ঘড়ির ঘণ্টাধ্বনিতেই শুরু হতো সিলেট শহরের সকাল, আবার রাতের নীরবতায় এই শব্দই জানিয়ে দিত সময়ের অগ্রগতি।
সময় বদলেছে, প্রযুক্তির উন্নয়নে যান্ত্রিক ঘড়ির প্রয়োজনীয়তা আগের মতো আর নেই। তবুও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সিলেটবাসী আজও আলী আমজাদ ঘড়িকে শহরের প্রতীক হিসেবে আগলে রেখেছে। বর্তমানে সিলেট সিটি কর্পোরেশন ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ঘড়িটি সংরক্ষণের কাজ চলছে। নতুন রং, যন্ত্রাংশ মেরামত ও আশপাশের সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে এটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে।
প্রতিদিন অসংখ্য দেশি-বিদেশি পর্যটক ক্বীন ব্রিজ ও সুরমা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে আলী আমজাদ ঘড়ি দর্শন করেন। অনেকেই এখানে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, ভিডিও ধারণ করেন এবং ইতিহাসের সঙ্গে নিজেদের সময়কে মিলিয়ে নেন। আলী আমজাদ ঘড়ি তাই কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান সিলেটের গর্ব ও ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী।
আলী আমজাদ ঘড়ি আমাদের মনে করিয়ে দেয়- প্রযুক্তি সময়ের সঙ্গে বদলায়, কিন্তু ঐতিহ্য ও ইতিহাস অটুট থাকে যুগের পর যুগ। সিলেট ভ্রমণে এলে এই ঐতিহাসিক ঘড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সময়ের কাঁটার সঙ্গে নিজের স্মৃতিকে মিলিয়ে না দেখলে ভ্রমণ যেন অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
(পিআইডি ফিচার)
লেখক: প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, তথ্য অধিদফতর, সিলেট।
Related News
নববর্ষ ১৪৩৩ সবার জন্য হোক মঙ্গলময়
Manual6 Ad Code লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল: বাঙালির সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলা নববর্ষ।Read More
বাংলা সনের প্রবর্তক সম্রাট আকবর
Manual8 Ad Code আতিকুর রহমান নগরী: বাংলা আর বাংলাদেশির গর্বের সংস্কৃতির সন হলো ‘বাংলা’ সন।Read More



Comments are Closed