একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয় স্বাধীনতা দিবস
পিযুষ চক্রবর্তী: ১৯৭১ সাল, বাঙালির জাতীয় জীবনে সুখ-দুঃখ ও স্বাধীনতা অর্জনে চিরস্মরণীয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম। স্বাধীনতা সংগ্রাম বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষা ও পাকিস্তানী শাসন, শোষণ ও বঞ্চনাসহ নানা নির্যাতন থেকে মুক্ত হওয়ার সংগ্রাম ছিল। ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্তে¡র বাহানায় পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের নাম পূর্ব বঙ্গ ও পূর্ব পাকিস্তান নামানুসারে পরিচিত হয় এবং পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর স্বার্থান্বেষী হীনমন্যতার শিকার হতে হয় নানাভাবে। তৎসময়ে ভুক্তভোগী পূর্ব বঙ্গের মানুষ প্রতিবাদে পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। এ ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এরপর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানী বাহিনী মির্মমভাবে হত্যা করে এদেশের ছাত্র, শিক্ষক, পুলিশ, ইপিআর সদস্যসহ সাধারণ মানুষকে। তাই ২৫ মার্চকে আমরা কালরাত বলি। ২৬ মার্চ তারিখে মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এদিন থেকেই শুরু হয় পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে আমাদের (বাঙালিদের) মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করি। ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল বলে এই দিবসটি আমাদের স্বাধীনতা দিবস। এ দিবসটি আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
১০ এপ্রিল গঠন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার। এ সরকার মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিত। শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য গঠন করা হয় মুক্তিবাহিনী। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ। অসীম সাহসে মুক্তিকামী বাঙালিরা স্বশস্ত্র পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যান। যুদ্ধকালীন সময়ে প্রাণ ও মান ভয়ে প্রায় এক কোটি মানুষ প্রতিবেশী দেশ ভারতের মৈলাম ও বালাট নামক স্থানে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়। ভারত সরকারপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তাদের আশ্রয়সহ খাদ্য ও স্বাস্থ্যের জন্য ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, এমনটি বয়স্কদের কাছ থেকে আজও জানা যায়। আরও জানা যায়, এলাকার হিন্দু-মুসলিম, জাতি-ধর্ম ও বর্ণের অনেক মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন দেশ ও মানুষের মুক্তির জন্য।
আমরা সবাই বাঙালি ও বাংলাদেশি, একে অন্যের আত্মার আত্মীয়, প্রতিবেশী ও একই ভাষা-সংস্কৃতির অধিকারী। মুক্তিযোদ্ধারা বাংলা মায়ের কৃতিসন্তান। মুক্তিযুদ্ধ ছিল রক্ত¯œাত ও জীবনোৎসর্গকারী বিজয় নিশান। ঘরের ছেলে মাকে না বলে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এমনও কৃতিসন্তান রয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে ভারত অস্ত্র ও ট্রেনিং দিয়ে বাঙালি মুক্তিকামী মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিল। এমনটিও মুরব্বিদের মুখে জানা যায়। তাঁরা বলেন, মুক্তিযুদ্ধে ভারত ভালো প্রতিবেশী ও অকৃত্রিম বন্ধু ছিল। প্রায় ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম চলছিল। তখন ভারতসহ কিছু রাষ্ট্রের সহযোগিতায় পাকিস্তানী বাহিনী অবশেষে হার মানতে বাধ্য হয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী বাহিনী মিত্রবাহিনী ও গেরিলা বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। অবশেষে আমরা বিজয় অর্জন করি। এ স্বাধীনতা ও বিজয় এমনি এমনি আসেনি বাঙালির জাতীয় জীবনে। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনে প্রায় ৩০ লক্ষ লোক শহিদ হয় ও ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি ঘটে। হাজার হাজার ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল পাকবাহিনী ও তাদের দোসররা। বহু রাস্তাঘাট অকার্যকর করে দিয়েছিল। যুদ্ধাহত মানুষের সংখ্যাও ছিল বহু; যাঁদের আত্ম-আহাজারির সান্ত¡নার ভাষা জানা নেই কারোর। যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীরা লক্ষ লক্ষ পরিবারের সম্পদ লুণ্ঠন করে সর্বশান্ত করে দেয়।
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। তবে সান্ত¡নার বিষয়, বাঙালিরা পেয়েছিল পূর্ব বঙ্গ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ; যা বিশ^ দরবারে স্থান লাভ করে নেয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাধ্যমে আমরা অর্জন করি স্বাধীন দেশ; যার নাম বাংলাদেশ। এর সংসদীয় নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। এদেশে লিখিত সংবিধান বিদ্যমান ও এককেন্দ্রিক সংসদীয় সরকারের মাধ্যমে জনসেবা ও রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালিত হয়। এদেশ বহুদলীয় রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বাংলাদেশ। আমাদের গর্ব আমাদের দেশের মানচিত্র, লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, নাগরিক অধিকার ও মর্যাদার জন্য। আমরা প্রতিবছর যথাযথ মর্যাদায় জাতীয় স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং মাতৃভাষা দিবস উদ্যাপন করে থাকি। জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আয়োজন করা হয় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনাসভা প্রভৃতি।
ঐতিহ্যপ্রবণ বাংলার মাটি ও মানুষকে ভালোবাসি এবং স্বাধীনতা উত্তর বাংলার উন্মেষ জাগরুকদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। প্রগতিশীল বাংলাদেশে সম্প্রীতি, দেশপ্রেম ও মানুষের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হোক এমনটাই প্রত্যাশা।
লেখক: কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক।
Related News
হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আগমন : অন্ধকার পৃথিবীতে আলোর জাগরণ
Manual2 Ad Code লায়ন মো: গনি মিয়া বাবুল: হযরত মুহাম্মদ (সা.) একজন মহান পথপ্রদর্শক। তাঁরRead More
আখেরি চাহার শোম্বার তাৎপর্য ও শিক্ষা
Manual4 Ad Code হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী: নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ”Read More



Comments are Closed