Main Menu

বিশ্বনাথে গোয়াহরি বিলে ঐহিত্যবাহী ‘পলো বাওয়া’ উৎসব অনুষ্ঠিত

Manual4 Ad Code

বিশ্বনাথ প্রতিনিধি: বাঁশ-বেত দিয়ে তৈরী করা পলো দিয়ে শীতকে উপেক্ষা করে ‘ঝপ-ঝপা-ঝপ’ শব্দের তালে তালে সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের গোয়াহরি গ্রামের বিলে (দক্ষিণের বড় বিল) বিপুল উৎসাহ-উদ্দিপনায় প্রতি বছরের ন্যায় এবারও পালন করা হয়েছে‘ বার্ষিক পলো বাওয়া’ উৎসব।

Manual2 Ad Code

বিগত বছরগুলোর ন্যায় এবছরও পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিতে দেশে এসেছেন গ্রামের অনেক প্রবাসী ও স্বামী-সন্তান নিয়ে পিত্রালয়ে বেড়াতে এসেছেন অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাওয়া গ্রামের অনেক মেয়েরা। প্রায় তিন শতাধিক বছরের পুরাণো চিরায়ত বাংলার ঐহিত্যবাহী ওই পলো বাওয়া উৎসবকে কেন্দ্র করে গোয়াহরি গ্রামে গত কয়েক দিন ধরে বিরাজ করা উৎসবের আমেজ, চলবে আরোও কয়েক দিন।

Manual2 Ad Code

বুধবার (১৫ জানুয়ারি) বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব শুরুর পূর্বে সকাল থেকেই গোয়াহরি গ্রামে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়।

পলো বাওয়া উৎসবে অংশ নিতে সকাল থেকে পলো-জাল নিয়ে বিলের তীরে আসতে থাকেন গ্রামবাসী। আর সকাল ১১টার দিকে একযোগে পলো-জাল হাতে মাছ শিকারের বিলে ঝাঁপিয়ে পড়েন গ্রামের সকল বয়সের পুরুষরা, বাদ যাননি শিশুরাও। বাবা-চাচা-ভাই-স্বামী-সন্তানের মাছ শিকার দেখতে বিলের পপাড়ে জড়ো হন গ্রামের মেয়ে ও বধুরা। শিশুরাই বা কম কিসে। পানি চলাচলের ব্যবস্থা না থাকার কারণে বিলে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি নেই, তবে এবার বিলে কচুরিপানা না থাকায় ও পানি কম থাকায় পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দেওয়া শৌখিন মাছ শিকারীদের প্রায় ৯৫% ব্যক্তিই মাছ হাতে হাসি মুখে ঘরে ফিরেছেন।

পূর্ব পুরুষদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যকে যুগ যুগ ধরে আজোও বুকে ধারণ করে রেখেছেন গোয়াহরি গ্রামের বর্তমান প্রজন্মের বাসিন্দারা। তাই নিজেদের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতি বছর মাঘ মাসের পহেলা তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব। যা আজ (বুধবার) থেকে আগামী ১৫ পর্যন্ত দিন পর্যন্ত চলবে। গোয়াহরি গ্রামের পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে ওই পনের দিন বিলে মাছ ধরার ক্ষেত্রে নেই কোন নিশেধাজ্ঞা। এজন্য ওই পনের দিনের ভিতরে বিলে গ্রামের যে কেউ হাত দিয়ে বা টেলা জাল (হাতা জাল) দিয়ে মাছ শিকার করতে পারবেন। তবে গ্রামের ঐতিহ্য অনুযায়ী আগামী ১৫ দিন পর ২য় ধাপে এক সাথে আবারও পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিবেন গ্রামবাসী।
এবারের পলো বাওয়া উৎসবে পলোর সাথে সাথে টেলা জাল (হাত জাল), উড়াল জাল, চিটকি জাল, কুচা’সহ মাছ শিকারের বিভিন্ন রকমের সরঞ্জাম নিয়ে মাছ শিকারে অংশ গ্রহন করেন কয়েক শতাধিক সৌখিন শিকারীরা। শিকারীদের হাতে শিকার হওয়া মাছের মধ্যে রয়েছে- রুই, কাতলা, বোয়াল, শউল, কারপু, গণিয়া, মিরকা, সরপুঁটি, তেলাপিয়া, ব্রিগেট’সহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় ছোট মাছ।

পলো বাওয়া উৎসবে অংশ নিতে ও দেখতে বুধবার সকাল থেকেই গোয়াহরি গ্রামবাসীর পাশাপাশি আশপাশের গ্রামের লোকজনও বিলের পাড়ে এসে জমায়েত হতে থাকেন। ঝপ-ঝপা-ঝপ শব্দের তালে তালে প্রায় ২ ঘন্টা চলে বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব। শীতের ঠান্ডাও কাবু করতে করতে পারেনি শৌখিন ওই মাছ শিকারীদেরকে। মাছ শিকার করতে নিজ নিজ পলো নিয়ে বিলের ঝাঁপিয়ে পড়া শিকারীদের মাছ ধরার দৃশ্যটি উপভোগ করতে বিলের পারে আসা শিশু থেকে বৃদ্ধ বয়সের পুরুষ-মহিলা এবং দূর থেকে আসা আত্বীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উৎসাহ দিতে দেখা যায়। আর মাছ শিকারের সাথে সাথে বিল থেকে আসা আনন্দ চিৎকার অন্য রকমের এক আমেজ সৃষ্টি করে গোয়াহরী গ্রামের বড় বিলের চারি দিকে।

বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের মেম্বার ও স্থানীয় গোয়াহরী গ্রামের বাসিন্দা গোলাম হোসেন বলেন, গ্রামবাসীর মধ্যে একতা থাকার কারণে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে যুগ যুগ ধরে পূর্ব-পূরুষদের রেখে যাওয়া চিরায়ত বাংলার ঐহিত্য বার্ষিক পলো বাওয়া উৎসব পালন করে যাচ্ছি। পলো বাওয়া উৎসব আমাদের গ্রামবাসীর এক পুনর্মিলনী উৎসবে রুপ নেয়। পলো বাওয়া উৎসবে যেমন দেশে আসেন অনেক প্রবাসী, তেমনি স্বামী-সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন বিয়ে হয়ে যাওয়া গ্রামের অনেক মেয়েরাও।
পলো হাতে উৎসবে অংশ নিয়ে দুটি রুই-কাতলা মাছ শিকার করা ১০ বছর বয়সী কামরুল ইসলাম বলেন, বাবা-চাচাদের সাথে পলো বাওয়া উৎসবে অংশ নিয়েছি। আর আমার ছোট পলো দিয়ে দুটি মাছ শিকার করতে পেরে অনেক আনন্দ লাগছে।

১২ বছর বয়সী মহসিন আহমদ বলেন, টেলা জাল দিয়ে আমি একটি বোয়াল ও একটি কারপু মাছ শিকার করেছি। এতে আমি খুব খুশি।

৭০ উর্ধ্বো যুক্তরাজ্য প্রবাসী মনোহর খান বলেন, পলো দিয়ে মাছ শিকার করা অন্য রকমের এক আনন্দের ব্যাপার। তবে এখন আগের মতো বড় মাছ পাওয়া যায় না। পলো বাওয়াতে অংশ গ্রহন করতে দীর্ঘদিন পর এবার দেশে এসেছি। আর পলো বাওয়াতে অংশ নিয়ে মাছ শিকার করতে পেরে খুব ভাল লাগছে।
বিয়ে হয়ে যাওয়া গ্রামের মেয়ে আয়েশা খাতুন বলেন, পলো বাওয়া উৎসব দেখতে স্বামীর কাছ থেকে ছুটি (অনুমতি) নিয়ে বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। আমার সন্তানরা পলো বাওয়া উৎসব দেখে অনেক আনন্দ পেয়েছে।

Manual7 Ad Code

স্পেন প্রবাসী মনোয়ার হোসেন বলেন, ছোট বেলা থেকেই বাবা-চাচাদের সাথে পলো বাওয়া উৎসব দেখতে আসতাম। এরপর থেকে নিজেও অংশ নিতাম। এখনও সেই টানে বিদেশ থেকে পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিতে সুযোগ পেলেই দেশে আসি।

যুক্তরাজ্য প্রবাসী তাজ উল্লাহ বলেন, পলো বাওয়া উৎসবটি গ্রামবাসীর এক পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের মতো। এতে অংশ গ্রহন করার জন্য প্রতি বছর অনেক প্রবাসীই দেশে আসেন। অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাওয়া গ্রামের মেয়েরাও স্বামী-সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে আসেন। দিনে শিকার করা মাছ, রাতে পরিবারের সদস্যদের সাথে নিয়ে এক সাথে খাওয়ার আনন্দই অন্য রকম এক আমেজ সৃষ্টি করে।
বিভিন্ন জাতের ৮টি মাছ শিকার করা সায়েম আহমদ বলেন, পলো বাওয়া উৎসবের আনন্দে শীতের প্রভাবের কথা মনেই পড়েনি। আর পলো বাওয়াতে অংশ নিয়ে মাছ শিকার করতে পেরে আমার কাছে উৎসবের আমেজ কয়েক গুন বৃদ্ধি পেয়েছে।

দীর্ঘ ১৫ বছর পর দেশে আসা সৌদি আরব প্রবাসী ও গোয়াহরী গ্রামের জামাই আবুল লেইছ বলেন, দীর্ঘদিন প্রবাস থাকার পর কিছু দিন হল দেশে এসেছি। দেশে আসার পর শ্বশুড় বাড়ি বেড়ানো হয়নি। আর তাই পলো বাওয়া উৎসবের সংবাদ পেয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বেড়াতে এসেছি। এখানে (শ্বশুড় বাড়ি) আসার পর পলো বাওয়াতে অংশ নিয়ে মাছ শিকার করতে পেরে অনেক আনন্দই লাগছে।

যুবক হাফিজুর রহমান বলেন, পলো বাওয়া উৎসব আমার কাছে বিয়ে করার চেয়েও অনেক বেশি আনন্দের। আর তাই পলো বাওয়া উৎসবে যোগ দিতে সকাল বেলা সিলেটের বাসা থেকে গ্রামের বাড়িতে এসেছি। মাছ শিকার করতে পেরে আমার আনন্দ কয়েক গুন বেড়ে গেছে। কষ্ঠ করে আসার সার্থক হয়েছে।

Manual3 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code