বন্যা ও বন্যা পরবর্তী রোগ-বালাই প্রতিরোধে করণীয়
মাসুদ পারভেজ : নদীমাতৃক বাংলাদেশ। পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনাসহ ছোট-বড় অসংখ্য নদ-নদী এদেশের মাটি ও মানুষকে করেছে সমৃদ্ধ। দেশের অনেক অঞ্চলে নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জীবন ব্যবস্থা। আবার প্রকৃতির নিয়মে মাঝে মাঝে নদ-নদীই মেতে ওঠে মরণ খেলায়। প্রলয়ঙ্করী বন্যায় ধ্বংস করে দেয় লোকালয়, বিনষ্ট করে সম্পদ, অসংখ্য মানুষকে টেনে নিয়ে যায় অবর্ণনীয় দুর্দশার দ্বারপ্রান্তে। বন্যা আমাদের দেশে প্রতি বৎসরই কোন না কোন অঞ্চলে হয়ে থাকে এবং এর ফলে সম্পদ ও শস্যহানি হয় ব্যাপক। ২০২২ সালে সিলেটে ও ১৯৮৮ সালে সারা দেশে সংঘটিত হয়েছে স্মরণকালের ভয়াবহতম বন্যা। এছাড়া ১৯৮৭, ১৯৮৪, ১৯৮০, ১৯৭৭, ১৯৭৪ সালগুলিতেও বেশ বড় ধরনের বন্যা হয়েছিল। আমাদের দেশের বেশির ভাগ অংশই বন্যাপ্রবণ। তাই বন্যার সঙ্গেই আমাদের বসবাস করতে হবে। বন্যা প্রতিরোধ সম্ভব নয়, তবে কিছু অতি সহজ উপায় ও কৌশল অবলম্বন করে বন্যাজনিত জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা যায়।
বর্তমানে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। কয়েক দফা বন্যায় সিলেট অঞ্চলের মানুষের জনজীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। টেলিভিশন, ছাপা সংবাদপত্র ও অনলাইন ভিত্তিক বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে বন্যাকালীন দুর্ভোগের চিত্র। বন্যা পরিস্থিতি সবার জন্যই ভীতিকর হলেও এ সময় ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ সময়ে নিজেকে ও পরিবারকে বাঁচাতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বন্যায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানুষের নানা স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়। শুধু যে বন্যার্ত মানুষই এ ঝুঁকিতে থাকে, তা নয় বরং বন্যায় উদ্ধারকর্মী, ত্রাণকর্মী, স্বাস্থ্যসেবাদানকারীও ঝুঁকিতে থাকেন।
চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন্যা-পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ অনেক বেড়ে যায়। বন্যায় নিরাপদ পানির অভাবে অনেকেই খাবার এবং দৈনন্দিন কাজে অনিরাপদ পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এ দূষিত পানি ব্যবহারের ফলে পানিবাহিত রোগ, যেমন ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড কিংবা হেপাটাইটিস রোগের সংক্রমণ বেড়ে যায়। তাই সবার আগে বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
বন্যার পর বাড়ির আশপাশে পানি জমে থাকে। এ পানি মশার বংশ বিস্তারে ভূমিকা রাখে। ফলে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া, ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। তাই বন্যা পরবর্তী সময়ে মশা থেকে সাবধান থাকতে হবে। দিনে রাতে সব সময় মশারি টানিয়ে ঘুমান এবং সম্ভব হলে মশা প্রতিরোধক স্প্রে ব্যবহার করুন। ঘরবাড়ি স্যাঁতসেঁতে হওয়ার কারণে ত্বকে ছত্রাকজাতীয় সংক্রমণ বেড়ে যায়। বন্যা পরবর্তী রোগ বালাই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং হেলথ অ্যান্ড হোপ স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালক ডা. লেলিন চৌধুরী সিলেটের একটি স্থানীয় দৈনিককে বলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর পানিবাহিত রোগ যেমন আমাশয়, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, জ্বর, হেপাটাইটিস বা এ জাতীয় রোগ বেড়ে যায়। আবার বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরেও বিভিন্ন জায়গায় পানি আটকে থাকে। এ জমে থাকা পানিতে মশার বংশ বৃদ্ধির কারণে ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়ার মত রোগ বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে। তিনি আরো বলেন, বন্যার পানিতে চলাফেরা করার কারণে মানুষের শরীরে নানা জাতীয় চর্মরোগ দেখা দেয়। বর্তমানের বন্যায় স্বাস্থ্যকর্মীবৃন্দ ডায়রিয়া ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগ সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং এর প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করছেন। সেকারণে কোথাও মহামারীর মতো তেমন কিছুই ঘটেনি কারণ ক্ষতিগ্রস্ত বেশিরভাগ মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতেই সুস্থ্য হয়ে উঠছে।
বন্যার কারণে সৃষ্ট রোগের সিংহ ভাগই হয়ে থাকে পানি ও খাবার থেকে। এ সময় কষ্ট হলেও বন্যার পানি পান পরিহার করতে হবে। সম্ভব হলে আধা ঘণ্টা ফুটিয়ে পান করতে হবে, ফুটানো সম্ভব না হলে ১০ লিটার পানিতে দুটি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট (হ্যালোজেন ট্যাবলেট) আধা ঘণ্টা মিশিয়ে রাখলেই ওই পানি পানের উপযোগী হবে। পঁচা ও বাসি খাবার গ্রহণ পরিহার করতে হবে, খাবার সব সময় ঢেকে রাখতে হবে। বন্যাকালে অধিকাংশ সময় পানির সংস্পর্শে থাকার ফলে শরীরে খোসপাঁচড়া, ফাঙ্গাসের সংক্রমণ বা স্ক্যাবিস-জাতীয় চর্মরোগ দেখা দিতে পারে, তাই যতটা সম্ভব শরীর শুকনো রাখতে হবে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা এসব রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বেশি থাকে। এছাড়াও গর্ভবতী নারীরাও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে। এসব রোগ প্রতিরোধে সবার আগে সুপেয় পানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে হবে বলে পরামর্শ দেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞবৃন্দ।
এ সময় শিশু ও বৃদ্ধদের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবে। বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা এড়াতে সংযোগ চলাকালে বিশেষ সতর্কতা জরুরি। বাসস্থানের চারদিকে কার্বলিক অ্যাসিড রেখে দিলে সাপের উপদ্রব হ্রাস পায়। সাপ বা ইঁদুর কামড়ালে দ্রুত স্থানীয় মেডিকেল টিম বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ডায়রিয়া বা কলেরা আক্রান্ত রোগীকে পর্যাপ্ত খাবার স্যালাইন বা ভাতের মাড় খাওয়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় মেডিকেল টিম বা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। বন্যার সময় গবাদিপশুর সাধারণত পরজীবী আক্রমণ বেড়ে যায়। লোম দীর্ঘক্ষণ ভেজা থাকায় চামড়ায় ইনফেকশন হয়; ব্যাকটেরিয়া জন্মে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে। ভেজা- স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে থাকার ফলে গবাদিপশুর নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া হতে পারে। পানি ও কাদার সংস্পর্শে গবাদিপশুর পায়ে ক্ষত ও ফোড়া হয়। বন্যাকালীন ও বন্যা পরবর্তী সময়ে মানুষ ও গবাদিপশুকে কৃমিনাশক খাওয়াতে হবে। আবার আঘাতজনিত ক্ষতও হয়, যেখানে মাছি বসে চর্মরোগ সৃষ্টি করে। এ সময় গরুর খুরারোগ, গলাফোলা রোগ, তড়কা, বাদলা, লেপটোস্পাইরোসিস, হাঁস-মুরগির রানীক্ষেত এবং ছাগলের পিপিআর রোগ দেখা দিতে পারে।
মৃত ও পঁচা জীবজন্তু মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। মৃত প্রাণীকে মাটির তিন মিটার নিচে পুঁতে ফেললে তা পঁচে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশকে দূষিত করতে পারবে না। গবাদি পশু-পাখির প্রতি যত্নবান হলে এগুলো অনেকাংশেই কমানো সম্ভব হবে। বন্যা-পরবর্তী বাড়িঘর, পয়োনিষ্কাশনসহ বাড়ির আঙিনা ও আশপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। বন্যায় ডুবে যাওয়া টিউবওয়েলের মূল অংশ খুলে পাইপের পানিতে ০.০৫ ভাগ ব্লিচিং দ্রবণ ঢেলে, আধা ঘণ্টা পর মূল অংশ পুনঃস্থাপন করে ১৫-২০ মিনিট ধরে চেপে পানি বের করে ফেললেই টিউবওয়েলের পানি পানের উপযোগী হয়ে যাবে। অন্যান্য রোগও কম-বেশি হয়ে থাকে। তবে কিছু সাধারণ নিয়ম-কানুন যেমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত গোসল ইত্যাদি মেনে চললে এসব রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে।
বন্যা পরবর্তী সময়ে দুই বছর কিংবা এর নিচের শিশু ব্যতীত সকল মানুষ এবং গবাদিপশুকে কৃমিনাশক ঔষধ খেতে হবে। বন্যার সময়ে খাদ্য এবং পানীয়তে দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পায় বিধায় বন্যা পরবর্তী সময়ে কৃমিনাশক ঔষধ খাওয়া বাঞ্চনীয়। আবার বন্যা পরবর্তী সময়ে বসতবাড়ি কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাপসহ বিভিন্ন প্রাণীর উপিস্থিতি দেখা যেতে পারে। তাই বন্যা পরবর্তী সময়ে অবশ্যই এসব বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে। প্রয়োজনে জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তাদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। প্লাবনের পানিতে বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান থাকে যা নলকূপের পানির সাথে মিশে পানি দূষণ ঘটায়। আর এ পানি আমাদের শরীরের জন্য বেশ ক্ষতিকর। তাই বন্যা পরবর্তী সময়ে নলকূপ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রথমে বেশ কিছুক্ষণ নলকূপ চেপে পানি ফেলে দিতে হবে। এতে করে পরবর্তীতে পানি পান করার উপযুক্ত হবে। বন্যা পরবর্তী সময়ে বসতবাড়িতে স্যাঁতস্যাঁতে ভাব দেখা যায় যা স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। তাই এসময় ঘর আবদ্ধ অবস্থায় না রেখে পর্যাপ্ত পরিমাণ বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করুন।
বন্যা বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন কোন বিষয় নয়। নানা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মতো এ ঘাতক বন্যা দেশের মানুষের কাছে চিরায়িত সংস্কৃতির এক অভিন্ন অংশে পরিণত হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এটি বন্ধ করা আমাদের পক্ষে মোটেই সম্ভব নয়। তারপরও বন্যার ক্ষতিকর প্রভাব যতটুকু পারা যায় ততটুকু কমানোর চেষ্টা করা উচিত। আন্তর্জাতিক ও জাতীয়ভাবে সমন্বিত উদ্যোগ; নদী ও পানি সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতা বন্যাকে নির্মূল করা না গেলেও তার তীব্রতা অনেকটাই হ্রাস সম্ভব। পাশাপাশি বন্যা ও বন্যা-পরবর্তী দুর্যোগ প্রতিরোধ, ক্ষয়ক্ষতি প্রশমন ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা যাতে ভেঙে না পরে সে বিষয়ে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। সরকারের তরফ থেকে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব রকমের প্রস্তুতি নিতে হবে। পরবর্তীতে সরকারকে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সহায়তা প্রদান করে পুর্নবাসন করতে হবে। প্রাকৃতিক এ দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে একজোট হয়ে কাজ করতে হবে। তবেই এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। পিআইডি ফিচার
Related News
শ্রমিক দিবসের গুরুত্ব ও বহুমাত্রিক তাৎপর্য
Manual8 Ad Code মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: সভ্যতার রূপায়ণ ঘটেছে শ্রমের বিনিময়। শ্রম করলেই শ্রমিক-এটাRead More
সমুদ্রপথ অবরোধ : যতো কথা
Manual1 Ad Code মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: ইতিহাসের ধুলো জমা পাতা উল্টালে দেখা যায়, যুদ্ধRead More



Comments are Closed