Main Menu

সুশাসন ও জবাবদিহির হাতিয়ার তথ্য অধিকার আইন

মাসুদ পারভেজ: নাগরিকের জানার ও তথ্য পাওয়ার অধিকারের ধারণা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়াতেই বেশ নতুন। এ অঞ্চলে ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় জ্ঞান ও তথ্য সর্বসাধারণের অধিগম্য নয়- এমন ধারণা সাধারণ মানুষের মনে দৃঢ়ভাবে গড়ে উঠেছে। ঐতিহ্যগতভাবে শাসক পক্ষ ঢেড়া পিটিয়ে যে তথ্য জানাত, জনগণ তাই জানতে পারত। আস্তে আস্তে জনসাধারণের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত সব ধরনের তথ্য জানার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে-এমন ধারণা বিকশিত হতে থাকে। এরফলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গ ও সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে তথ্য প্রকাশের প্রবণতা বাড়তে থাকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার দু-তিন মাসের মধ্যেই ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ সংসদে পাস হয়; এ আইনের আলোকে একটি তথ্য কমিশন গঠিত হয় এবং একজন প্রধান তথ্য কমিশনারের নেতৃত্বে কমিশন কাজ শুরু করে। এ আইনের মাধ্যমে নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার অধিকারের তাত্ত্বিক স্বীকৃতি অর্জিত হয়। বাস্তব ক্ষেত্রে সব নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হলে আমাদের এ বিষয়ে জানতে হবে এবং নিজেদের অধিকারের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা শিরোনামে ১৭৬৬ সালে সুইডেনে প্রবর্তিত আইনটি তথ্য অধিকারের প্রাচীনতম রূপ বলে মনে করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এটা আলোকিত আইন নামে এবং বিশ্বের অনেক দেশে তথ্য স্বাধীনতা আইন নামেও পরিচিত। বিভিন্ন শিরোনামে পৃথিবীর 8০টিরও বেশি দেশে এ আইন রয়েছে। ২০০০ সালের প্রথমের দিকে পৃথিবীর অনেক দেশে নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার অধিকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ সময়েই গণতান্ত্রিক চর্চার বিকাশ ও মানবাধিকার সুরক্ষায় জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে বিষয়টির পক্ষে মতামত গঠনের চেষ্টা চলছিল। দাতা সংস্থার বিভিন্ন শর্তের কারণে সুশাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকার বিষয়ক নানা সূচকে ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে তথ্য অধিকার আইনের প্রণয়ন শুরু হয়।

২০০২ সালে ভারতে ‘ফ্রিডম অব ইনফরমেশন অ্যাক্ট’ নামের একটি আইন পাস হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশেও সে রকম একটি আইনের দাবিতে লেখালেখি, সভা-সেমিনারে আলোচনা শুরু হয়। নাগরিক সমাজের চাওয়াকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করে, যা একই বছর ৫ এপ্রিল মহামান্য রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে ৬ এপ্রিল গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। এ আইনে স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ, তথ্য প্রদানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ, তথ্যপ্রাপ্তির আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের সুযোগ এবং সর্বোপরি আইন বাস্তবায়নের জন্য একটি স্বাধীন তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠার বিধান রয়েছে। আইনটি কার্যকর করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে তথ্য কমিশন তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সাংবিধানিকভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ।

তথ্য অধিকার আইনের একটি অন্যতম ইতিবাচক দিক হচ্ছে কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ পরিমাণ তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করবে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে (ভলান্টারি ডিসক্লোজার); অর্থাৎ অংশীজনের চাওয়ার অপেক্ষায় না করে কর্তৃপক্ষ অধিকাংশ তথ্য তাদের ওয়েবসাইটে এবং অন্যান্য মাধ্যমে প্রকাশ করবে। তাঁরা (রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য হুমকি এমন তথ্য ছাড়া) নাগরিকদের তরফ থেকে চাওয়া যেকোন তথ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য আন্তরিকভাবে প্রস্তুত থাকবেন; তথ্য প্রদানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানাবেন না; বরং প্রশ্নের উত্তরের পাশাপাশি তাঁর এখতিয়ারে থাকা আনুষঙ্গিক আরো তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করবেন। তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে স্বীকার করে নেওয়া হয় যে, তথ্যের মালিক জনগণ; তা গোপন না রেখে জনগণকে নানা মাধ্যমে জানানো ব্যবস্থা করবে সরকারি-বেসরকারি নীতিনির্ধারকবৃন্দ। যাতে কর্তৃপক্ষ ও অংশীজনের মধ্যে তথ্যের শূন্যতা বা অসমতা না থাকে, অপতথ্য যেন কাউকেই বিভ্রান্ত করতে না পারে।

এ বিষয়ে আঞ্চলিক তথ্য অফিস সিলেটের আয়োজনে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অপতথ্য মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সিলেটের পরিচালক (উপসচিব) জুলিয়া যেসমিন মিলি বলেছেন, স্বচ্ছতা এবং সত্যতা যাচাইয়ের অনুশীলনের অভাবের কারণে বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া খবরের দৌরাত্ম্য মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। এটা শুধু ঝুঁকিপূর্ণ নয় বরং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণে ভয়াবহ হুমকির কারণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জনপ্রিয়তা এবং জনসাধারণের কাছে এর অব্যাহত গ্রহণযোগ্যতা অপতথ্য ও ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইকে আরো জটিল করে তুলেছে।

সেমিনারে আঞ্চলিক তথ্য অফিস সিলেটের উপপ্রধান তথ্য অফিসার সুমন মেহেদী বলেন, আগামী দিনে অপতথ্য যুদ্ধ, চরম আবহাওয়া বা মূল্যস্ফীতির চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হবে। এজন্য অপতথ্য ও বিকৃত বা ত্রুটিপূর্ণ তথ্য প্রতিরোধে আর্থিক সংগতি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো, প্রযুক্তি পরিবর্তনশীল হওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মত দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। তবেই আমরা ২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অপতথ্য মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ গ্রহণে স্বাবলম্বী হয়ে উঠব।

তথ্য অধিকার আইনের মূল উদ্দেশ্য হল- নাগরিকদের ক্ষমতায়ন, কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, দুর্নীতি প্রতিহত করা; সর্বোপরি রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি যাতে জনগণের স্বার্থে কাজ করে, তা নিশ্চিত করা। এ সবকিছুর জন্য প্রয়োজন সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুকূল মানসিকতা। এ লক্ষ্যে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ বাংলাদেশে আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। জনগণের ক্ষমতায়ন এবং সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, বেসরকারি ও বিদেশি সাহায্যপুষ্ট সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত হয় এ আইন। নাগরিকের তথ্য লাভের অধিকারকে স্বীকৃতির পাশাপাশি কর্তৃপক্ষকেও যাবতীয় তথ্য সংরক্ষণের বিধান দেওয়া হয়েছে এ আইন। আইনটির বাস্তবায়ন-অবস্থা পর্যালোচনা ও সঠিক ব্যবহার সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করবে। তবেই আইনটি প্রণয়নের উদ্দেশ্য সফল হবে।

আইনটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী স্টেকহোল্ডার হল- বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও বা সিএসও) এবং গণমাধ্যম। তাঁরা এ আইনটি ব্যবহার করে সেবা খাত পরিবীক্ষণ ও আইনটি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারবেন। আবার সাংবাদিকবৃন্দ সমাজের অগ্রসর মানুষ হিসেবে জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি আয়-ব্যয়, সিদ্ধান্ত, প্রকল্প-সম্পর্কিত সঠিক ও পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করবেন এবং জনগণের উদ্দেশে গণমাধ্যমে তার অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তা প্রকাশ করবেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের মাধ্যমে জনগণের যে ক্ষমতায়ন করেছেন তারই অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তথ্য অধিকার আইন পাস করেন। জনগণের মানবাধিকার সমুন্নত রাখতে ও তথ্য অধিকার আইনের অধিকতর ব্যবহার নিশ্চিতে অংশীজনের সমন্বয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সরকারি অফিস, দপ্তর, সংস্থার পাশাপাশি বিদেশি অর্থপুষ্ট এনজিওসমূহের যাবতীয় তথ্যাদি সহজলভ্য ও সর্বজনের প্রাপ্তি নিশ্চিত করা দরকার। বিশুদ্ধ ও প্রকৃত তথ্য জানার অধিকার সমাজের তথা জনগণের রয়েছে, অন্যদিকে বিকৃত তথ্য, মিথ্যাচার, বিদ্বেষ ও ঘৃণাপ্রসূত তথ্য প্রচার এবং গুজব রটনা সমাজের জন্য ক্ষতিকর। সরকার তথ্য অধিকার আইনের সফল ও যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের অধিকার সুনিশ্চিত করছে। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তথ্যপ্রাপ্তিকে মানবাধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, যাতে মানুষ কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সরকার তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করে মানবাধিকার সুরক্ষার কাজটিই করে যাচ্ছে। -পিআইডি ফিচার

Share





Comments are Closed