গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে ছাত্রবিক্ষোভ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে পাওয়া যাচ্ছে বিক্ষোভের উত্তাপ। স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ব উপকূলে শুরু হওয়া কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন এখন উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়কার মতোই শিক্ষার্থীরা গাজার গণহত্যার সঙ্গে নিজেদের আর তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাচ্ছে। সে কারণেই এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে।
পুলিশ বিক্ষোভ দমনে জোর খাটানোর চেষ্টা করছে। চালানো হচ্ছে নির্বিচারে গ্রেফতার। এই ছাত্র বিক্ষোভকে ইহুদিবিদ্বেষ আকারে হাজিরের চেষ্টা করেছেন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে বল প্রয়োগের মধ্য দিয়ে এই বিক্ষোভ দমনের প্রচেষ্টার নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। বিকল্প ধারার মার্কিন সংবাদমাধ্যম জ্যাকোবিনের ব্র্যাঙ্কো মারকেটিক লিখেছেন, নৈতিক পরাজয় আড়াল করতে ইসরাইলের তাবেদাররা ছাত্র বিক্ষোভকে কলঙ্ক দেওয়ার চেষ্টা করছে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানহাটন ক্যাম্পাসের মূল চত্বরে এই ছাত্র বিক্ষোভের সূচনা। গত কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হচ্ছেন। সেখানে তারা সবুজ ভূমির ওপর তাঁবু স্থাপন করে গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। এ অবস্থায় কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট নেমাত মিনোচে শাফিক নিউইয়র্ক পুলিশকে ক্যাম্পাসে ডেকে আনেন। দাঙ্গা পুলিশ একশ’রও বেশি শিক্ষার্থীকে আটক করে। আটক শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারও করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী ও ফিলিস্তিনি-জর্দানিয়ান সাংবাদিক জিউদ তাহা বিকল্প ধারার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ডেমোক্র্যাসি নাউকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, গ্রেফতারের ঘটনা ছিল চমকপ্রদ। তবে সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল ছাত্ররা তাদের বাধা দেয়নি। শিক্ষার্থীদের হতাশার জায়গাটা হলো নিজেদের এবং তাদের বিশ্ববিদ্যালয়কে এই গণহত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মনে করছে তারা। জিউদ তাহার মতে, এই ছাত্র বিক্ষোভ ১৯৬৮ সালের ভিয়েতনাম-যুদ্ধবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মতো ঘটনা।
শিক্ষার্থীদের গ্রেফতারের পর সোমবার (২২ এপ্রিল) কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ওয়াক-আউট করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বের সমালোচনা করেছেন তারা। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলিস্তিনপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর প্ল্যাটফর্ম কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি অ্যাপারথাইড ডাইভেস্ট তাদের ইনস্টাগ্রামে প্রতিবাদের বিষয়ে লিখেছে, আমরা চাই গাজায় ফিলিস্তিনিদের গণহত্যার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ যেন শোনা যায়।
গত সপ্তাহের শুক্রবার থেকে এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীসহ কয়েকশ’ বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে কলম্বিয়া, ইয়েল, সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির মতো বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন। বৃহস্পতিবার বস্টন পুলিশ সিবিএস নিউজকে জানিয়েছে, এমারসন কলেজ থেকে আরও ১০৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আর আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে ৯৪ জন আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৩ জনকে আইন ভঙ্গের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। অন্য একজনকে প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে হামলার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়।
ফক্স নিউজ খবর দিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাস বন্ধ থাকবে। বিক্ষোভের কারণে ক্যালিফোর্নিয়া পলিটেকনিক হামবোল্ডটও বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ছাত্রদের বিক্ষোভে বলপ্রয়োগের সমালোচনা করেছে। ক্যাম্পাসগুলোতে অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
বুধবার (২৪ এপ্রিল) সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রধান লনে শত শত শিক্ষার্থী জড়ো হওয়ায় দিনটি তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হয়েছিল। অনেকগুলো তাঁবু স্থাপন করা হয়েছিল। পুলিশ তা অপসারণ করে। তবে গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানোর বিভিন্ন প্রতীক ধারণকারী মানুষ শিগগির শূন্যস্থান পূরণ করে দেয়। দিনের জন্য ক্লাস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ একটি ছত্রভঙ্গ আদেশ জারি কওে : লাউড স্পিকারে বিক্ষোভকারীদের বলা হয়, স্থান ত্যাগ করতে তাদের কাছে ১০ মিনিট সময় আছে। অথবা তাদের গ্রেফতার করা হবে। অন্তত ৫০ জন ছাত্রের একটি দল তখনও ছিল ক্যাম্পাসে। ‘মুক্ত, মুক্ত, ফিলিস্তিন’র পক্ষে স্লোগান দিচ্ছিলেন তারা।
আরবীয় স্কার্ফ পরা এক নারী পুলিশের দিকে বোতল ছুড়েছিল। তাকে মাটিতে ফেলে হাতে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশভ্যানে তোলা হয়। পুলিশ সরে যাওয়ার আদেশ দেওয়ার পরও যারা প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে বসে পড়েছিল; তাদের একে একে হাতকড়া পরানো হয় এবং লস অ্যাঞ্জেলস পুলিশ তাদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয়।
‘আপনি কি গ্রেফতার হওয়ার ভয় পাচ্ছেন?’ স্কাই নিউজের এমন প্রশ্নের জবাবে একজন তরুণী বলেন, ‘না, আমি মনে করি গাজার শিশুরা আমার চেয়ে বেশি ভয় পায়।’ কেন সে সাত হাজার মাইলেরও বেশি দূরের গাজাকে ঘিরে এতটা আবেগ কাজ করে। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা জানি যে আমরা এখনই ইতিহাসের সঠিক পথে রয়েছি।’ শিক্ষার্থীদের দুই দাবি। প্রথমত, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ইসরাইলের সঙ্গে সব আর্থিক সম্পর্ক ছিন্ন করবে এবং দ্বিতীয়ত, তাদের দেশ তাদের অস্ত্র পাঠানো বন্ধ করবে।
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে আরও চড়াও হয় পুলিশ। স্কাই নিউজের সরেজমিন প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন পুলিশ কর্মকর্তা এক তরুণকে মেঝেতে ফেলেছেন। অন্য একজন নারীকে লাঠি দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে।
স্কাই নিউজ বলছে, পুলিশ হয়তো বুধবারের বিক্ষোভের অবসান ঘটিয়েছে কিন্তু সামনের দিনগুলোতে শিক্ষার্থীদের আরও ফেটে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই আন্দোলনকে ইহুদিবিদ্বেষ আকারে হাজিরের চেষ্টা করেছেন নেতানিয়াহু। বুধবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ‘ইহুদি-বিদ্বেষী গুন্ডাদের’ দখলে চলে গেছে। তারা ইসরাইলের ধ্বংস চায়। তারা ইহুদি শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ইহুদি শিক্ষক ও কর্মচারীদের ওপরও হামলা করছে। এটি নিষ্ঠুর আচরণ, যা বন্ধ করতে হবে। নেতানিয়াহুর দাবি, প্রায় ১০০ বছর আগে জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসি পার্টির ক্ষমতায় থাকার সময় যেমন মিছিল হতো, এই ছাত্রবিক্ষোভ তেমনই কিছু।
ক্যাম্পাসে ইহুদি শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করবে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে এক তরুণ স্কাই নিউজকে বলেন, আমরা যা বলেছি, যা করছি তার কোনোটিই সহজাতভাবে ইহুদি-বিদ্বেষী নয়। ফিলিস্তিনের মুক্তির আহ্বানও ইহুদি-বিরোধী নয়। এদিকে জ্যাকোবিনের ব্র্যাঙ্কো মারকেটিক লিখেছেন, নৈতিকভাবে ও আত্মিকভাবে ইসরাইলের সমর্থকরা হেরে গেছে। তারা তাই যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্র আন্দোলনকে কলঙ্ক দেওয়ার চেষ্টা করছে।
Related News
শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল জাপান
Manual3 Ad Code আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জাপানের পূর্ব উপকূলে একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। রিখটার স্কেলেRead More
কলকাতার রাস্তায় জুমার নামাজ পড়তে বাধা পুলিশের, ব্যাপক উত্তেজনা
Manual4 Ad Code আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জুমার নামাজ পড়াকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গেRead More



Comments are Closed