Main Menu

৬ দিন পর শায়িত হলেন আশ্রয়কেন্দ্রে মৃত্যু হওয়া শিল্পী আশরাফ আলী

Manual6 Ad Code

আল-হেলাল, সুনামগঞ্জ থেকে: স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় সুনামগঞ্জে মানুষ ও গবাদিপশুর মৃত্যুর একের পর এক খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে অনাহারে অর্ধাহারে একজন অসুস্থ বৃদ্ধ জারীগানের শিল্পীর করুণ মৃত্যুর হৃদয় বিদারক ঘটনা এখনও ভূলতে পারছেনা শহরতলীর সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের ইব্রাহিমপুর গ্রামবাসী।

জানা যায়, ইব্রাহিমপুর পশ্চিমপাড়া নিবাসী জারীগানের শিল্পী মোঃ আশরাফ আলী প্রতিবছর মহরম মাসে নবীদৌহিত্র ইমাম হোসেন (রাঃ) ও কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা স্মরণে নিজ বাড়ীতে মহরমের জারী গানের আসর বসাতেন। নিজে জারী গান ও পুথি পাঠ করার পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন বাউল শিল্পীদের গান পরিবেশনের মাধ্যমে মেতে উঠতেন কারবালা শোকের মাতমে। একজন সহজ সরল নিরীহ শান্ত স্বভাবের মানুষ হিসেবে এলাকায় তার ব্যাপক পরিচিতি ছিল। ২ পুত্র ও ৫ কন্যার জনক তিনি। জেলার প্রধান নদী সুরমা ও ধোপাজান নদীর পাড়ে অপেক্ষাকৃত নিচু জমিতে একখানা বসতঘর নির্মাণ করে কোনরকমে অভাবের সংসারে মানবেতর দিন যাপন করতেন তিনি। চলমান বন্যার আগে ঘরে ১০ বস্তা ধান,এক বস্তা চাল ও লাকড়ীসহ জ্বালানী উপকরণ রেখেছিলেন। তার বসতঘরে আরো ছিল হাসমুরগীসহ জীবন জীবিকার অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরন সামগ্রী। কিন্তু দ্বিতীয় দফা বন্যার সুচনালগ্নে ১৫ জুন বুধবার প্রথম দফাতেই তার বসতঘরটি বন্যার পানি দ্বারা বেষ্টিত হয়। ১৬ জুন বৃহস্পতিবার ঘরের মেঝেতে বন্যার পানি যখন মুখ বরাবর ভরপুর হয়ে যায় তখন নিরুপায় হয়ে ঐ রাতেই তিনি ইব্রাহিমপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে স্বপরিবারে আশ্রয় নেন। বুধবার লাকড়ীর চুলোটি পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় তার ঘরে কোন খাবার রান্না করা সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার দিনভর পুরো পরিবারবর্গ পানিতে জিম্মি হয়ে থাকায় তারা উপবাসে থাকেন। ১৭ জুন আশ্রয়কেন্দ্রেও কোন খাবার জুটেনি তাদের।
শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেয়ার প্রয়োজন মনে করেন পরিবারের লোকজন। কিন্তু ভরা বন্যায় ভারী বৃষ্টিপাত ও প্রবল পাহাড়ী ঢলের স্রোতের কারণে সুরমা নদী পার হয়ে জেলা সদর হাসপাতালে নেয়ার জন্য কোন নৌকা পাননি তার পরিবারের লোকজন। এ অবস্থায় ১৭ জুন শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় অনাহারে থেকে বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। পরদিন ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বন্যার মাঝে নৌকার মধ্যে ভাসমান লাশ রেখে ১৮ জুন শনিবার বাদ জোহর তাঁর নামাজে যানাজা সম্পন্ন করা হয়। পরে দাফনের জন্য গ্রামের একমাত্র কবরস্থানটি পানিতে নিমজ্জিত থাকায় কাপনের কাপড়ে ঢাকা লাশটি পলিথিন দ্বারা মুড়িয়ে কাঠের তৈরী কফিনে আবৃত করে বাঁশের খুটিতে বেধে রাখা হয়। পরিবারের লোকজন ও আত্মীয় স্বজনরা ২২ জুন বুধবার পর্যন্ত লাশটি পাহারা দেন। একপর্যায়ে কবরস্থান থেকে বন্যার পানি কিছুটা সরে যাওয়ায় বুধবার লাশটি দাফন করা হয়। এসময় কোস্টগার্ডের সুনামগঞ্জ অঞ্চলের দায়িত্বরত অধিনায়ক লে: কর্ণেল সাব্বির ও ইউপি সদস্য মোঃ গিয়াস উদ্দিন এবং বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

মরহুম আশরাফ আলী’র জেষ্ট কন্যা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তালিকাভূক্ত বাউল শিল্পী ও সুরমা ইউনিয়নের সংরক্ষিত ১,২,৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যা মোছাঃ তানজিনা বেগম রোকশানা বলেন,এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি আমরা। বসতভিটে ধান চাল কাপড়চোপড় হাড়িপাতিলসহ আমাদের সবকিছুই নিয়ে গেছে কাল বন্যার পানি। সর্বশেষ আমাদের বাবাকেও আশ্রয়কেন্দ্রের আশ্রয়স্থলে হারিয়েছি। আমার বাবা মারা যাওয়ার পর কবরস্থানে বন্যার পানি এতটাই ভরপুর ছিল যে,কবর খুড়া সম্ভব হয়নি। তাই ছয় দিনের ব্যবধানে বাবার মরদেহ ২২ জুন বুধবার দাফন করা হয়েছে। এই ৬টা দিন আমরা পরিবারের প্রতিটি সদস্য জীবিত থেকেও মৃতের মত কালক্ষেপন করেছি।

Manual8 Ad Code

উল্লেখ্য বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ায় গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন আশরাফ আলী ও তার পরিবার পরিজন। এর মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে শুরু হয়েছিল শোকের মাতম। দীর্ঘদিন রোগে ভোগা আশরাফ আলী (৮৫) মারা গেছেন। নৌকা না থাকায় বাবাকে হাসপাতালে নিতে পারেননি পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী জেষ্ট ছেলে ইব্রাহিম আলী। একদিকে ঘরবাড়িতে কালবন্যার পানি চারপাশে থইথই করছে অন্যদিকে বাবাকে হারিয়ে কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না ইব্রাহিম। তাই বাবার মরদেহ পলিথিনে মুড়ে বাক্সের ভেতর রেখে কবরস্থানের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখেছিলেন পাঁচ দিন ধরে। পানি নামলে মাটিতে শুইয়ে রাখবেন, এই আশায় অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন তিনি। বন্যার সময় সাধারণত কোনোভাবে মরদেহ দাফন করতে না পারলে পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু নিজের বাবার মরদেহ বন্যার পানিতে ভাসিয়ে দেওয়ার সাহস হয়নি ইব্রাহিমের। তাই চাচা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাজী সাজুল মিয়ার পরামর্শে পলিথিনে মুড়ে বাক্সবন্দি করতে হয়েছে তাকে। এমন হৃদয়বিদারক ঘটনা শহরতলির সুরমা ইউনিয়নের ইব্রাহিমপুর গ্রামে আর কখনও সংগঠিত হয়েছে বলে কারো জানা নেই।

বিষয়টি নিশ্চিত করে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ইব্রাহিম জানান, গত ১৭ জুন (শুক্রবার) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় তার বাবা মারা যান। সর্বত্র বন্যার পানি থাকায় বাবার মরদেহ দাফন করতে না পারায় তিনি বাক্সবন্দি করে রেখেছেন। ইব্রাহিম বলেন, ‘আব্বা মারা গেছইন। আমরার কবরস্থান পানির নিচে। জানাজাও পড়ছি নৌকার ওপর। আমরা অসহায় হয়ে গেছি। এখন বসে আছি কখন পানি কমবে আর লাশ দাফন করতে পারব।’

Manual4 Ad Code

একই গ্রামে একই দিন মৃত্যু হয় সাজু মিয়া নামে একজনের। তিনি ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ আসার পথে মারা যান। ছাতকের গোবিন্দগঞ্জ এলাকায় বন্যার কারণে আটকে যায় তাদের গাড়ি। সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় এক অটোরিকশা চালকের মাধ্যমে বাড়িতে খবর পাঠানো হয়। পরে সাজু মিয়ার মেয়েজামাই ছালাতুল নৌকাযোগে শ্বশুরের লাশ গ্রামে নিয়ে আসেন। এখন পাশাপাশি বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে আছেন সাজু মিয়া ও আশরাফ আলী। বুধবার বিকেল পর্যন্ত আশরাফ আলীর বাক্সের নিচে কিছুটা মাটি দেখা গেলেও পানির ওপরে ভাসছে সাজু মিয়ার বাক্সবন্দি মরদেহ।

সাজু মিয়ার জামাতা সালাতুল ইসলাম বলেন, দুদিন ধরে আমার শ্বশুর আর ছেলের খোঁজ পাচ্ছিলাম না। পরে একজন এসে খবর দেন শ্বশুর আব্বা মারা গেছেন। অনেক কষ্টে একটা নৌকা জোগাড় করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছুটে যাই গোবিন্দগঞ্জ। সেখান থেকে লাশ এনে এখন বাক্সের ভেতর ভরে রেখেছি। পানি কমলে মাটি দেব।

Manual4 Ad Code

এলাকাবাসী জানান, ছয় দিন ধরে পুরো জেলা ডুবে আছে পানির নিচে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, বাজার এমনকি উঁচু কবরস্থানও পানির নিচে ডুবে আছে। পা রাখার এতটুকু জায়গা নেই কোথাও। মানুষের বাড়িঘরে গলা পর্যন্ত পানি। এই পরিস্থিতিতে আরও বিপদ হয় কেউ মারা গেলে। কারণ, মরদেহ দাফনের কোনো উপায় থাকে না। তারা জানান, বন্যার সময় কবরস্থান পানির নিচে ডুবে যাওয়ায় মরদেহ দাফন করা যায় না। তাই হাওর এলাকার কবরগুলো উঁচু করার উদ্যাগ নেওয়া খুব প্রয়োজন। অন্তত কবরগুলো যদি উঁচুতে থাকে, তাহলে শেষ সময়ে এক মুঠো মাটি পড়বে লাশের ওপর।

গ্রামের বিশিষ্ট সালিশী মহরম আলী ও গ্রাম পুলিশ আসকর আলী বলেন, এমন ভয়াবহ বন্যা আমরা কেউ জীবনে দেখিনি। বন্যার কারণে লাশ নিয়ে বসে আছি পাঁচ দিন ধরে। বাক্সের ভেতর ভরে রেখেছি। এখনো আছে।

মৃত আশরাফ আলীর মেয়ে রেজিয়া বেগম বলেন,ঘরে পানি ওঠায় বাবার পাশাপাশি আমি ও আমার স্বামী সন্তানদেরকে নিয়ে স্কুলে আশ্রয় নিয়েছিলাম। স্কুলে আশ্রয় থাকাবস্থায় আব্বা মারা যান। কোনো উপায় না পেয়ে আমরা দু দুটি পরিবার এখন বড় বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। সেখানে আমরা ৩টি পরিবার একসাথে বসবাস করছি। এখন পর্যন্ত আমার ও আব্বার ভিটার পানি সরেনি। তাই আমরা কখন বন্যার পানি মুক্ত হবো সেই প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছি।

সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমির হোসেন রেজা বলেন, আশরাফ আলী ভাইয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে মারা যাওয়ার ঘটনাটা অপ্রত্যাশিত ও বড়ই হৃদয় বিদারক বেদনাদায়ক। এটা যেমন তার পরিবারের পক্ষে মেনে নেয়া কঠিন তেমনি আমাদের জন্যও বড় কষ্টের। তবে এই অনাকাঙ্কিত মৃত্যু আমাদেরকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। ইঙ্গিত দিচ্ছে ভবিষতে আমাদের গ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রাস্তাঘাট ও কবরস্থানকে উচু করাসহ মেরামত ও সংস্কারের। এই মৃত্যু সারা দেশবাসীকে এবং সদাশয় সরকারকে বন্যার্ত মানুষের পূণর্বাসনে ইব্রাহিমপুর গ্রামসহ সারা সুরমা ইউনিয়নবাসীকে অগ্রাধিকারের পর্যায়ে টেনে আনবে।

ইব্রাহিমপুর জামে মসজিদের ইমাম ও মুসল্লীয়ানরা বলেন, দুনিয়াতে হয়তো তিনি শহীদ এর পরিচিতি পাবেননা। তবে দুর্যোগকালীন সময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয়রত অবস্থায় মৃত্যুবরন করায় তিনি পরকালে শহীদের মর্যাদা পাবেন।

গ্রামের কৃতিসন্তান বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রযোজক সংগীত শিল্পী মোঃ আপ্তাব মিয়া বলেন,আধ্যাত্মিক জগতের একজন নিভৃতচারী প্রচারভিমুখ মানুষ ছিলেন জারী গানের শিল্পী আশরাফ আলী। আমি তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত ও শোকাহত পরিবারবর্গের প্রতি সমবেদনা জানাই।

 

Manual7 Ad Code

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code