দিরাইয়ে ধীরগতিতে চলছে হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ, আতংকে কৃষকরা
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক : সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় বিগত দিনের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার আশায় লক্ষমাত্রার চেয়ে বেশি আবাদ করলেও হাওররক্ষা বাঁধ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না কৃষকদের। সময়মত বাঁধের কাজ শেষ না করায় গতবছর অকাল বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয়। নিজ উদ্যোগে প্রাণপণ চেষ্টা করেও অকাল বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষা করা যায়নি। এবারও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। নির্ধারিত সময় থেকে দুই মাস পরও হাওরগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ও বাঁধ উঁচুকরণের কাজ শুরু হয়নি। যার কারণে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা শুরু হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু এবং ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার কথা। ফেব্রুয়ারির দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও উপজেলার অনেক বাঁধে কাজই শুরু হয়নি, কোন কোন বাঁধে ১০-৩০ ভাগ কাজ করা হয়েছে বলে দাবী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতোপূর্বে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় এ নিয়ে জেলা প্রশাসকও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কাজ দ্রুত শুরু করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। এখনই কাজ শুরু না করলে সময়মত কাজ শেষ করা যাবে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমে জেলার ৩৭টি বড় হাওরসহ মোট ৪২টি হাওরের ২২৫টি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) এবং ৪৮টি প্যাকেজে ঠিকাদারদের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এবারের পিআইসিতে ১০ কোটি ৭২ লাখ টাকা এবং দরপত্রের মাধ্যমে কাজ করার জন্য ৪০ কোটি টাকা মোট বরাদ্দ ধরা হয়েছে।
পাউবোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে পিআইসিদের অনুকূলে অর্থ ছাড় দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে। পিআইসিদের কাজ শুরু করতে তাগিদ দেয়া হয়েছে। এখন কাজ পুরোদমেই চলছে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, দিরাই উপজেলায় টাঙ্গুয়ার হাওর, ভান্ডাবিল হাওর, বরাম হাওর, চাপাতি, সুরাইয়া বিবিয়ানা হাওর, হুরামন্দিরা হাওর, উদগলবিল হাওর, কালিকোটা হাওর, পাগনার হাওরসহ ৯টি হাওরে ৪৬টি পিআইসির মাধ্যমে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড । মোট ২২ দশমিক ০৫০ কিলোমিটার অস্থায়ী ডুবন্ত বাঁধের ভাঙ্গা বন্ধকরণ ও মেরামত বাবদ বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৮৭ লাখ ৩২ হাজার ৬৩০ টাকা।
এবারও সময়মত বাঁধের কাজ শুরু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে কৃষির সাথে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন নিয়ে এমপির মনোনিত সদস্য ও পাউবো কর্মকর্তাদের দেনদরবার নিয়ে সময়ক্ষেপণ হয়। পিআইসিতে এমপির প্রতিনিধি ও পাউবোর’র মাঠ প্রকৌশলীসহ কর্মকর্তারা যথাসময়ে যথাযথভাবে বাঁধ নির্মাণের কাজ মাঠ পর্যায়ে নজরদারি করেন না, বিল উত্তোলনের সময় ভাগ ভাটোয়ারায় ব্যস্ত থাকেন তারা। বরাদ্দ বিভাজন থেকে শুরু করে কোথায় কেমন কাজ হবে তার সবটাই নিয়ন্ত্রণ করেন পাউবো’র উপ-প্রকৌশলীরা (এসও) ।
উদগল হাওরের মাউচ্চাখাড়া, কালিকোটা হাওরের কলকলিয়া, বরাম হাওরের বোয়ালিয়া, চাপাতি হাওরের বৈশাখীসহ ৩০-৩৫টি বড় ভাঙ্গা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে কৃষকরা দাবী জানিয়ে আসলেও হাওর রক্ষার নামে প্রতিবছর বাঁধের বরাদ্দ নয়ছয় করতে পাউবো এগুলো স্থায়ী করছে না। প্রতিবছরই তিন মাসের জন্য অস্থায়ী বাঁধ মেরামতে সরকারের লাখ লাখ টাকা ব্যয় করছে পাউবো। এসব বাঁধ কৃষকের কোন উপকারে আসছে না। পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে এর অর্ধেক বাজেটে স্থায়ীবাঁধ নির্মাণ করা যেতো।
বরাম হাওর উপপ্রকল্পের তুফানকালী বাধের .২১২কিলোমিটার ডুবন্ত বাধের ভাঙ্গা বন্ধকরন ও মেরামতকরন কাজের প্রকল্পবাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি)সভাপতি তাড়ল ইউপি সদস্য সালমা বেগম জানান, ১২ ফেব্রুয়ারীতে তিনি কাজ শুরু করেছেন, এতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১৪ লাখ ৭৫ হাজার ৪২৩টাকা।
এই বাঁধের পার্শ¦বর্তী গ্রামের কৃষকরা জানান, আড়াই লাখ টাকায় ৩ মাইয়া(মাস) বাঁধ বাঁধতে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ অথচ এখানে ২ ভাগ কাজও করা হয়নি।
একই প্রকল্পে তুফানকালী বাধের .১৩৮ কিলোমিটার অংশের কাজ করছেন ইউপি সদস্য লাল মিয়া। তিনি এ পিআইসির সভাপতি । এ বাঁধে বরাদ্দ ৯ লাখ ৯৮ হাজার, তিনি দাবী করছেন ৩০ভাগ কাজ করা হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ লাল মিয়া মেম্বার ৫ লাখ টাকা চুক্তি দিয়ে বাঁধে মাটি ভরাটের কাজ করছেন।
বোয়ালিয়া বাধের .১৯৯ কিলোমিটর অংশের পিআইসির সভাপতি ইউপি সদস্য রাশেদ মিয়া। এখানে ১০ভাগ কাজ করা হয়নি। এ বাধের বরাদ্দ ১৪ লাখ ৮৫ হাজার টাকা । তিনি দাবী করছেন ৩০ ভাগ কাজ করা হয়েছে।
বোয়ালিয়া বাধের ০.১০১কিলোমিটার অংশের পিআইসির সভাপতি ইউপি সদস্য মঞ্জুরুল হক মঞ্জু। এখানে ধীর গতিতে চলছে বাধের কাজ। এতে বরাদ্দ রয়েছে ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা।
তাড়ল ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল কুদ্দুস নিজেই দুটি প্রকল্পের পিআইসির সভাপতি। চাপাতি ও বরাম হাওরের দুটি প্রকল্পে ৩০ লাখ টাকার বরাদ্দ রয়েছে। তিনি বলেন, ৩ ফেব্রুয়ারী থেকে কাজ শুরু করেছেন, ৩০ ভাগ কাজ করেছেন বলে দাবী করছেন তিনি ।
সংশ্লিষ্ট সকলকে বাঁধ নির্মাণ কাজের প্রতি নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৌহিদুজ্জামান পাবেল বলেন, হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়ে পাউবোর কোন রকম গাফলতি মেনে নেয়া যাবে না, যথাসময়ে যথাযথভাবে কাজ শেষ করে কৃষকদের দুশ্চিন্তা দূর করতে হবে।
পাউবো’র উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী দিরাই পওর মোহাম্মদ খলিলুর রহমান হাওরপাড়ের কৃষকদের বিভিন্ন অভিযোগের কথা অস্বীকার করে বলেন, এবার ২৪ জানুয়ারী কমিটিই(পিআইসি) পাশ করা হয়েছে, তবে বাঁধের কোন গাফিলতি সহ্য করা যাবে না, শতভাগ কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে, এ ব্যাপারে কোন ছাড় দেয়া হবে না,সব জায়গায় কাজ শুরু হয়েছে, যথা সময়ে কাজ শেষ করা হবে বলে তিনি দাবী করেন।
Related News
সুনামগঞ্জ সীমান্তে বাংলাদেশি যুবক নিহত
Manual6 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার চারাগাঁও সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশRead More
ছাতকের ৩ যুবককে কাশ্মীরে নেওয়ার পর নিখোঁজ, মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ
Manual7 Ad Code ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: ভারতের কাশ্মীরে ভালো বেতনে কাজ দেওয়ার কথা বলে সুনামগঞ্জেরRead More



Comments are Closed