Main Menu

কোম্পানীগঞ্জে টিলা ধ্বসে শ্রমিক নিহতের ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল

Manual1 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি: সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিন টিলা ট্রাজেডি ও প্রাণহানীসহ সকল অঘটনের জন্য থানার ওসি মো. বায়েছ আলমকে দায়ী করে পরপর দুটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
বুধবার জেলা পুলিশ গঠিত তদন্ত কমিটির দাখিলা প্রতিবেদনে ওসির প্রত্যাহার ও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের সুপারিশ করা হয়েছে।
এর আগে জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদনেও ওসি বাছেকে দায়ী করা হয়েছে।
গত ৬ ফেব্রয়ারি ওসি বায়েস আলমের বিরুদ্ধে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক চড়াই উতরাই শেষে বুধবার (৮ ফেব্রয়ারী) তা দাখিল করা হয়।২৩ জানুয়ারি শাহ আরেফিন টিলায় প্রাণহানী ট্রাজেডির পর জেলা ও পুলিম প্রশাসন পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে।
সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুলহাসনাত খানকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা পুলিশ। এই কমিটি তদন্তে নেমে ওসি বায়েস আলমের বিরুদ্ধে পাহাড়সম অভিযোগ খুজে পায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওসি বায়েস আলম এই থানায় যোগদানের পর থেকে পাথররাজ্য সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে আইনশৃংখলার চরম অবনতি ঘটে। খুন, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই-রাহাজানী, চাঁদাবাজি, মাদক ও চোরাচালানীসহ এমন কোনো অপরাধ-অপকর্ম নেই, যা কোম্পানীগঞ্জে সংঘটিত হচ্ছে না।
ভারতের পর্বতময় মেঘালয় রাজ্যের পাদদেশে অবস্থিত সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে রয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ পাথরকোয়ারি ভোলাগঞ্জ। এছাড়াও উৎমা ও শাহআরফিন টিলার মত রয়েছে আরো কয়েকটি পাথরকোয়ারী। এ তিন পাথর কোয়ারী থেকে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় করে থাকে। পাথর কোয়ারীগুলোকে ঘিরে জীবন জীবিকা নির্বাহ করে থাকে লাখ লাখ পাথরশ্রমিক। প্রতিদিন শত-শত কোটি টাকার পাথর উত্তোলন ও কেনা-বেচা হয়ে থাকে এ কোয়ারীগুলোতে। হাজার হাজার ট্রাক ও ট্রাক্টর নিয়োজিত থাকে পাথর পরিবহনে। পরিবহনেও কাজ করে থাকে হাজার হাজার শ্রমিক।
ওসি বায়েছ আলমের বাড়ি ব্রাহ্মণ বাড়িয়ার নাসিরনগরে। ২০১৫ সালেল ১৮ নভেম্বর কোম্পানীগঞ্জ থানায় তিনি যোগদান করেন। এর পর থেকে মাত্র একবছর দুই মাসেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছেন তিনি। উপজেলার পরিবেশ ও প্রতিবেশ ধবংসকারী পাথর খেকোদের কাছ থেকে অবলীলায় আদায় করে চলেছেন বখরা ও চাঁদা। আর এ অবৈধ আয় দিয়ে রাজধানী ঢাকায় ও নিজবাড়ি কুমিল¬ার মুরাদনগরে গড়ে তুলেছেন বিশাল সম্পদ। মালিক হয়েছেন একাধিক আলীশান বাড়ি-জমি ও বিলাসবহুল গাড়ির। ওসি বায়েছ আলম কোম্পানীগঞ্জ থানায় যোগদান করেই গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ও নিজ পরিবারের একটি বখরাবাহিনী। সরকারি বাসভবনে স্ত্রী সন্তানের পাশাপাশি নিয়ে এসেছেন তার বখরাবাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের। স্ত্রী সাথী ছাড়াও এ বাসভবনে নিয়ে এসেছেন শ্যালক শাকিল, ভাই বিল¬াল, ভাতিজা ও ভাগ্নেসহ কয়েকজনকে। কোয়ারীগুলোর বিভিন্ন স্পটে এদের নিয়োগ করে তাদের নেতৃত্বে প্রত্যহ আদায় করে থাকেন অবৈধ চাঁদা ও বখরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার লোকজন জানান, ভোলাগঞ্জ, শাহ আরফিনটিলা, কালাইরাগ, দয়ারবাজার ও উৎমা, নয়াবস্তী, বিজয়পাড়–য়াসহ বিভিন্ন স্পট থেকে নিজে ও তার বাহিনীর সদস্যরা দৈনিক লাখ লাখ টাকা চাদাঁ আদায় করে থাকেন। তাদের দেয়া তথ্যমতে শাহ আরফিন টিলা থেকে দৈনিক দেড়লাখ, কালাইরাগ ও দয়ারবাজার এলাকা থেকে ৩লাখ,উৎমাসহ ছোটবড় অন্যান্য স্পট থেকে আরো ২লাখ টাকাসহ তার দৈনিক আয় প্রায় ৭ লাখ টাকা। এছাড়াও মামলা রেকর্ড, জিডি,তদন্ত, চার্জশিট, ফাইনাল রিপোর্ট, জুয়ার আসর, মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানী, ইয়াবা ব্যবসায়ী, গ্রেফতার বানিজ্য ইত্যাদি মিলিয়ে আরো দৈনিক গড় আয় লাখ টাকারও বেশী। তাছাড়া সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ভূমিদস্যু, সংঘবদ্ধ ডাকাত ও পেশাদার খুনী-অপরাধীদের কাছ থেকেও নিয়মিত মোটা অংকের বখরা পেয়ে থাকেন। ফলে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে এবং থানার আইনশৃংখলার চরম অবনতি ঘটেছে। অবৈধ পাথর উত্তেলনকালে টিলা ও মাটি ধ্বসে গত ২০১৬সালে প্রাণহানী ঘটেছে ৭ জনের। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর টিলা ধ্বসে মৃত্যু ঘটে সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারা বাজারের লুৎফুরের, ১৫ নভেম্বর আনোয়ার, ২২ নভেম্বর প্রাণহানী ঘটে আরো ৫পাথরশ্রমিকের। তারা হচ্ছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ছনবাড়ির জালাল উদ্দিন, বাঘারপার গ্রামের চুনু মিয়া ও অজ্ঞাতনামা আরো ৩ জন।
এবছরের ২৩ জানুয়ারি শাহ আফরিন টিলায় প্রাণহানী ঘটে আরো ৬ জনের। তারা হচ্ছেন নেত্রকোণার আব্দুল কুদ্দুছ, খোকন মিয়া, আব্দুল কাদির, আব্দুল হাদী, জহর উদ্দিন ও আসিফ। এ নিয়ে শুধু অবৈধপাথর উত্তোলনকালে ওসি বায়েছ আলমের আমলেই ঘটেছে ১৩ জনের প্রাণহানী। আহত ও পঙ্গু হয়েছেন আরো প্রায় শতাধিক পাথরশ্রমিক। ফলে ওসি বায়েছ আলমের আমলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা এক মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়েছে।
হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও শাহ আরফিন টিলা, ভোলাগঞ্জ ও কালাইরাগ এলাকায় বোমামেশিনের মাধ্যমে পাথর উত্তোলন অব্যাহত থাকায় এসব প্রাণহানীর ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে ওসি বায়েছ আলমের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ভূমিখাদকরা পরিবশে ও প্রতিবেশ ধবংস করে পাথর উত্তোলন ও গর্ত করন অব্যাহত রাখে। ফলে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের মানচিত্র পাল্টে গেছে।
ওসি বায়েছ আলমের এহেন চাঁদাবাজি ও বখরাবাজির কারনে অবৈধপাথর ব্যবসায়ীরা সম্পূর্ন বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। আর ঘটেই চলছে খুনখারাবিসহ নানা অঘটন। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাকে অঘটন এবং সন্ত্রাসমুক্ত করতে হলে অবিলম্বে ঘুষখোর ওসি বায়েছ আলমের প্রত্যাহার দাবি এলাকার সচেতন নাগরিকদের।
অভিযোগ পাওয়া গেছে, ওসি বায়েস আলম যাদের ব্যবহার করে কোম্পানীগঞ্জকে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছেন তার তালিকা অনেক দীর্ঘ। এই তালিকায় রয়েছে প্রায় শতাধিক অপরাধী। এর মধ্যে অন্যতম হলেন, সাংবাদিক পরিচয়দানকারী প্রতারক শেখ মোর্শেদ, উপজেলা চেয়ারম্যানের পুত্র বেলাল, জয়নাল, শামীম, নাতী কেফায়েত, রাসা ও আজিজ প্রমুখ।
পরিবেশবাদী সংগঠন বেলা ও বাপা পৃথক কর্মসূচী পালনের মাধ্যমে ওসি বায়েছ আলমের অপসারনসহ তার বিচার দাবি করেছে। সোস্যাল ও অনলাইন মিডিয়ায়ও ওসি বায়েছ আলম হয়ে উঠেছেন বহুল আলোচিত ও বিতর্র্কিত পুলিশ কর্মকর্তা। ঝড় উঠেছে তার অপসারন ও বিচার দাবিতে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও ওসি’র অপসারন ও বিচার দাবি অব্যাহত রেখেছে।
অভিযোগের ব্যাপারে বক্তব্য নিতে কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি বায়েছ আলমের সরকারী মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। শাহ আরফিন টিলায় প্রাণহানীর ঘটনার পর থেকে প্রায় সময়ই ওসি বায়েছ আলমের সরকারি মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
সর্বশেষ গত ২ ফেব্র“য়ারি বেলা তিনটায় শাহ আরফিন টিলায় মাটি ধসে আরো এক শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে। নিহত সুহেল আহমদ (২৭) সুনামগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার রঙারচর ইউনিয়নের ছমদ নগর গ্রামের মৃত আবদুল আজিজের পুত্র। শাহ আরফিন টিলার আবুল বশরের পাথরের গর্তে এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই সোহেল আহমদের লাশ গুম করা হয়। ঘটনা থামা চাপা দিয়ে রাখতে ওই পাথরের গর্তের মালিক ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এসআই তরিকুল ইসলাম ও এএসআই নাজমুলের মাধ্যমে ওসি বায়েছ আলমের কাছে পাঠায়। এএসআই নাজমুলকে ৫ ফেব্র“য়ারি তাৎক্ষণিক বদলির আদেম দেয়া হলেও এখনো তিনি বহাল তবিয়তে থানায় রয়েছেন।

Share





Related News

Comments are Closed

Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code