স্বাগত ২০১৭
বৈশাখী নিউজ ২৪ ডটকম: প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে দিন যায়, দিন আসে। দেখতে দেখতেই বিদায় নিল সুখ-দুঃখের আরেকটি বছর ২০১৬ সাল। বিশ্বজুড়ে কত ঘটনা, কত হাসি-কান্না, বিষাদ ও উত্তেজনা- সবকিছুকে ছাপিয়ে স্বপ্ন আর দিনবদলের অপরিমেয় প্রত্যাশার রক্তিম আলোয় উদ্ভাসিত ইংরেজি ক্যালেন্ডারের শুভ নববর্ষ। বাংলা বছর গণনা আমাদের কৃষিকেন্দ্রিক সমাজ-অর্থনীতি, আচার-সংস্কৃতি, আবেগ-অনুভূতি-চেতনার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকলেও নাগরিক-ব্যবহারিক জীবনে ইংরেজি বছর গণনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের তথা ইংরেজি নববর্ষও এ দেশে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে উৎসবমুখর পরিবেশেই উদযাপিত হয়ে আসছে। নতুন বছরে নতুন রঙে শুরু হোক আমাদের পথচলা। নতুন দিনে সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।
বিদায়ী বছরে দেশের রাজনীতি অঙ্গন ছিল অনেকটাই শান্তিপূর্ণ। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিরোধিতা ছিল। ছিল প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা। তবে জ্বালাও-পোড়াও ছিল না। ছিল না অকারণে হরতাল, অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক কোনো কর্মসূচি। ছিল জাতীয় ঐক্যের আহ্বান। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ রাজনৈতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলারও জোরালো আহ্বান ছিল। সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির চেষ্টা ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। এ লক্ষ্যে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং ক্ষমতার বাইরে থাকা দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি তাদের জাতীয় কাউন্সিল করেছে। ঘোষণা করেছে নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি। সরকারের সহযোগী ও বিরোধী কয়েকটি রাজনৈতিক দলও তাদের জাতীয় কাউন্সিল সম্পন্ন করেছে। গেল বছরের রাজনীতিতে সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সংলাপ। এ সংলাপ রাজনীতিতে এক ধরনের স্বস্তি ও শান্তি ফিরিয়ে এনেছে।
আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বিদায়ী বছর ছিল ঘটনাবহুল। গত ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জিম্মিকে হত্যা করে জঙ্গিরা। পরদিন অপারেশন থান্ডার বোল্ট কমান্ডো অভিযানে নিবরাজ ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও সাইফুল চৌকিদার নিহত হন। এদের মধ্যে সাইফুল ছাড়া বাকিরা নব্য জেএমবির সদস্য বলে পুলিশি তদন্তে উঠে আসে। হলি আর্টিজান হামলা বছরের একটি মর্মান্তিক ঘটনা। বছরের শেষ প্রান্তে রাজধানীর আশাকোনায় একটি জঙ্গি আস্তানায় পুলিশি অভিযানের সময় দেশে প্রথমবারের মতো এক নারী আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনা দেশের জঙ্গি তৎপরতায় এক নতুন দিক। তবে জঙ্গি দমনে এ বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতু হত্যাকাণ্ড, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ড, স্কুলছাত্রী রিশা হত্যাকাণ্ড। এ ছাড়া ঘটেছে জুলহাস মান্নান ও তনয় হত্যা, রাবি শিক্ষক রেজাউল করিম হত্যা, বৌদ্ধভিক্ষু হত্যা, পীর হত্যা। যার মধ্যে অনেক হত্যাকাণ্ডেরই কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। এ ছাড়াও বছরটিতে সামাজিক অপরাধের ঘটনাও ছিল উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো। সিলেট এমসি কলেজের শিক্ষার্থী খাদিজার ওপর নৃশংস হামলা এবং তার সুস্থ হয়ে ওঠাও ছিল বহুল আলোচিত।
এতসব নেতিবাচকতার মধ্যে ইতিবাচক অর্জনও কম ছিল না। বিদায়ী ২০১৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতি ছিল বিস্ময়কর। অর্থনীতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অর্থনীতির সব সূচকেরই উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির উদীয়মান শক্তির কাতারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। নারী-পুরুষের অর্থনৈতিক ব্যবধান কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার চেয়ে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি এখন ৭ শতাংশের উপরে। ২০১৬ সালেই এই মাইলফলক অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এমনকি চলতি অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাও ৭ শতাংশের বেশি ঠিক করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জিডিপি সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির পরিমাণ ৭ দশমিক ১১ শতাংশ, যা গত ছয় বছরের জিডিপি বিবেচনায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উজ্জ্বল এক নিদর্শন। আগের দুই অর্থবছরে অর্জিত জিডিপি ছিল যথাক্রমে ৬.৬ এবং ৬.৫৫ শতাংশ। বিগত বছরে ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্য ছিল অন্যান্য বছরের তুলনায় ঈর্ষনীয়। টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের ৪ নম্বরে থাকা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঢাকা টেস্ট জিতে টাইগাররা অনন্য এক নজির স্থাপন করেছে। ২০১৬ সালের সূচনাতেই বাংলাদেশের মেয়েরা জাতিকে স্বর্ণপদক উপহার দিয়েছে। ভারতে অনুষ্ঠিত ১২তম এসএ গেমসে লাল-সবুজের পক্ষে প্রথম স্বর্ণ জয় করেন নারী ভারোত্তোলক মাবিয়া আকতার সীমান্ত। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা হিসেবে এসএ গেমস সাঁতারে একাই দুটি স্বর্ণ জিতেছেন জলকন্যা মাহফুজা। এসব প্রাপ্তি দেশের তারুণ্যের সাহস, উদ্যম ও শক্তিকে নতুনভাবে চিনিয়েছে। এ রকম অনেক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, আশা-নিরাশা, হাসি-কান্না নিয়ে গতকাল বিদায় নিয়েছে ২০১৬ সাল। বিদায়ী বছরের ব্যর্থতার উত্তরণ ও সাফল্য সংহত করার প্রত্যয় নিয়ে আমরা বরণ করতে যাচ্ছি নতুন বছরকে।
বিগত বছরের ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠা আর সাফল্যকে সংহত করার প্রত্যয় নিয়ে আমরা বরণ করছি নতুন বছরকে। আমরা চাই, দ্রুত বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও অনিশ্চয়তার অবস্থার অবসান হোক। সংকীর্ণ ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের কল্যাণ-চিন্তায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ায় একমত হোন রাজনৈতিক মহল।
Related News
সাগরের বুকে মৃত্যুর মিছিল
Manual1 Ad Code মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: দেশে দেশে আর্থ-সামাজিক অস্থিরতা আর নিরাপত্তার অভাবে জীবনেরRead More
দশ মহররম কারবালা এবং শোকাবহ
Manual4 Ad Code মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান: প্রায় এক হাজার ৩৩৫ বছর আগের এই দিনেRead More



Comments are Closed