খরস্রোতা সোনাই নদীতে চলছে লাল মাটি ভরাটের মহোৎসব
হাবিব সরোয়ার আজাদ : সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা এক সময়ের খরস্রোতা সোনাই নদীতে খুব জোরেসোড়েই প্রতিনিয়ত চলছে টিলার পাথর উক্তোলনের পর অপসারিত মাটি ফেলে নদী ভরাটের মহোৎসব।
মাটি ভরাটের ফলে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে কৃষি জমির সেচ সুবিধার জন্য নির্মিত বিএডিসির রাবার ড্যাম প্রকল্প প্রায় পানি শুণ্য হয়ে পড়েছে।
ভোক্তভোগীদের অভিযোগ রহস্যজনক কারনে পরিবেশ ও আইন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্তা ব্যক্তিরা শাহ আরেফিন টিলাকাঁটার পাথর খেকো চক্রের বিরুদ্ধে নদী ভরাট ও টিলা কাটা বন্ধে কোন ধরণের আইনী পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।
সরজমিনে গিয়ে শনিবার দিনভর স্থানীয় এলাকাবাসীর সাথে আলাপকালে জানা গেছে, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের ইসলামপুর ইউনিয়নের কযেক শত একরের শাহ আরেফিন টিলা অবৈধভাবে স্থানীয় কয়েকটি প্রভাবশালী পাথর খেকো চক্র প্রশাসনের নাকের ডগায় জবর দখল করে গত ১০ বছর ধরে প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকার পাথর উক্তোলন করে বিক্রি করছে।
টিলা কেটে পাথর উক্তোলনের পর টিলার অপসারিত লালমাটি গত তিন বছর ধরে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সোনাই নদীর পুর্ব তীরে ও নদীর মাঝ খানে দিবারাত্রী প্রায় তিন শতাধিক মাহেন্দ্র ট্রলি ও ট্রাকে করে নদীতে ফেলে নদীর তীর ও নদীর তলদেশ ভরাট করা হচ্ছে। এর ফলে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে পড়েছে। পরিবেশ বিপর্যয় ঘটিয়ে এলাকার বোরো–আমন ধান উৎপান ও শীতকালীন সবজি উৎপাদন ব্যাহত করা হলেও সিলেট ও সুনামগঞ্জ এ দুই জেলার প্রশাসন এমনকি সিলেটের পরিবেশ অধিদপ্তরেরও ঘুম ভাঙ্গেনি গত প্রায় তিন বছর ধরে।
সুনামগঞ্জের ছাতকের ইসলামপুরের নোয়াকোট রতনপুর সহ সাত গ্রামের লোকজন শনিবার এ প্রতিবেদকের মাধ্যমে নদী ভরাটের কারনে তাদের কৃষি ও আর্থসামাজিক নদীর নাব্যতা সংকট সহ নানা ভোগান্তির কথা তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে বাইরং নদীর জিরো পয়েন্ট থেকে ভারত–বাংলাদেশ সীমানার ১২৪৫-১২৪৬ এর মাঝখান দিয়ে প্রায় ১৬ কি.মি. দৈর্ঘ্যরে সোনাই নদী ছাতকের সুরমা নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে।’ সুদুর পাকিস্তান আমলে ওপারের বাইরং ও শিলং এমনকি মেঘালয় ষ্টেইটকে ঘিরে ভারত থেকে সোনাই নদীর নৌ-পথ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বোল্টার , কয়লা-চুনাপাথর, কমলা, তেজপাতা আমদানি হত। দেশ স্বাধীনের পরও বেশ কয়েক বছর সচল ছিল ছাতকের এ নৌ পথ কেন্দ্রীক শুল্ক ষ্টেশন। সময়ের ব্যবধানে নদী ভরাট ও নাব্যতা সংকটের মুখে গত কয়েক বছর ধরে বন্ধ হয়ে গেছে সোনাই নদী পথে আমদানি কার্যক্রম। টিলার অপসারিত লাল মাটি ফেলে নদীর তীর ও তলদেশ ভরাটের কারনে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে সরকার তিন দফা ড্রেজিং করেও নাব্যতা ফেরাতে পারেনি সোনাই নদীর।
সুনামগঞ্জ বিএডিসি সেচ সুবিধা দিতে গিয়ে প্রায় সাড়ে ১০ কোটি ব্যয়ে একটি রাবার ড্যাম তৈরী করলেও লালমাটির আগ্রাসনে নদী ভরাটের কারনে বোরো-আমন ও শীতকালীন সবজী মৌসুমের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়েছে ছাতকের ইসলামপুরের সোনাই নদীর পশ্চিম তীরের বাগানবাড়ি, রতনপুর, নীজগাঁও, গাঙপাড়, নোয়াকোট, বাহাদুরপুর, বৈশাকান্দি গ্রামের প্রায় দু’ হাজার প্রান্তিক ও নিন্ম আয়ের কৃষক পরিবার। নদী ভরাটের তান্ডবের কারনে সামান্য বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে সাত গ্রামের লোকজনের কৃষি জমি বোরো ফসল গোলায় তোলার আগেই আগাম বন্যায় রতনপুর, বাগানবাড়ি, নোয়াকোট, নীজগাঁও নতুন বস্তি, বনগাঁও, গাঙপাড় নোয়াকোট বন্দ (হাওর) সহ সাত হাওরের প্রায় কয়েক হাজার একর বোরো ফসলী ধান তলিয়ে যাবার পাশাপাশী প্রায় ১ হাজার ঘরবাড়িতে টানা সপ্তাহ থেকে পনোরো দিন পর্যন্ত জলাবদ্ধতায় বন্দী থাকে।
ছাতকের রতন পুরের প্রবীন মুরুব্বী আবদুল মন্নান (৭৫), শামসুল হক (৫৫), আবদুল জলিল (৬২), বাগানবাড়ির আশিক আলী (৫৮), গাঙপাড় নোয়াকোট নুরুল ইসলাম (৫৯), মখলিছুর রহমান ৩৮), শফিকুর রহমান (৫০) অভিযোগ করে বলেন, এ নদীর পশ্চিম তীরের সাত গ্রামের পক্ষ থেকে নদী পূর্ব তীরের দামবাড়ি রাখাল তলা, ছনবাড়ি, নতুন জালিয়ার পাড়, বাহাদুর পুর, বৈশাকান্দি, ও সূর্যখাল পর্য্যন্ত শাহ আরেফিন টিলার অপসারিত লালমাটি ট্রাকে করে নদীর তীর ও তলদেশ ভরাটের ফলে বোরো আবাদের মাঘ-পৌষেই পানি যেমন থাকেনা তেমনী ধান কাটার মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে আগাম বন্যায় গত তিন বছর ধরে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার মেট্রিক টন ধান তলিয়ে যায়। শুধু এখানেই শেষ নয় পাহাড়ি ঢলে নদীর কোল উপছে ঘরবাড়িতে ঢলের পানির সাথে বালি ও লালমাটি হাওরে প্রবেশ করে জমির উর্ববরতা বিনষ্ট করছে, মরে যাচ্ছে গ্রামের গাছপালা, ভাঙছে নদীর পশ্চিম তীরবর্তী ঘরবাড়ি। গত তিন বছরে নদীর পশ্চিম তীরের সাত গ্রামের প্রায় ২ শতাধিক বসতবাড়ি নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে। বালির স্তুপের কারনে বারবার বসতবাড়ির ভিটে উচু করতে হচ্ছে সেই সাথে সরাতে হচ্ছে বসতবাড়ি।
গাঙপাড় নোয়াকোটের রহিম উল্লাহ জানান, এক সময় সোনাই নদীতে দেশীয় প্রজাতির রুই, কই, গনিয়া, কালিবাইশ, সরপুটি, বোয়াল, কাতলা, বাইম সহ ছোট ছোট একাধিক জাতের মাছ পাওয়া যেত, সাত গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষকরা সারা বছর প্রায় অর্ধকোটি টাকার মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত কিন্তু এই খরস্রোতা সোনাই নদী ভরাটের ফলে মাছ তো দুরের কথা পানি লালচে হয়ে যাওয়ায় গ্রামের লোকজন গোসল, কাপড় চোপড় ধুতেই পারেনা তাহলে মাছ থাকবে কেমন করে?।
অভিযোগ রয়েছে সিলেটের কোম্পনীগঞ্জের ইসলামপুরের শাহ আরেফিন টিলার পাথর খেকো দানবদের সাথে আতাত করে ছনবাড়ির আবদুর নুরের নেতৃত্বে রাস্তায় চেয়ার টেবিল বসিয়ে ইসমাইল তার সহোদর আবদুল লতিফ, লালু মিয়া, আবদুল মন্নান তার সহোদর আবদুল হান্নান গং সংঘবদ্ধ হয়ে নদীর তীর ও নদীর তলদেশে লালমাটি ফেলে ভরাটের জন্য প্রতি ট্রাক থেকে ১’শ টাকা করে গড়ে প্রতিদিন ৩’শ ট্রাক থেকে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করছে।
তাদের নির্দেশে ট্রাক চালকরা ওপারের ভারতীয় বিএসএফ এবং এপারের বাংলাদেশ বর্ডারগার্ড বিজিবির বাঁধাও মানতে নারাজ। প্রতিনিয়ত অবৈধ ভাবে লালমাটি বাহি ট্রাক নিয়ে সীমান্তের ১২৪৬ পিলারের জিরো লাইনে নদীর তীর ঘেষে মাটি ফেলছে।
শনিবার বেলা ১১টায় সরেজমিন অবস্থান কালে গ্রামবাসীর এমন অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। একদল শ্রমিক মাহেন্দ্র ট্রাক নিয়ে ১২৪৬ এর জিরো লাইনে লালমাটি নদীর তীরে ফেলার সময় খবর পেয়ে ওপারের কুড়িখাল বিএস্এফ ক্যাম্পের টহল দল এসে মাটি ফেলতে নিষেধ করে। পরবর্তীতে সিলেট-৫ বর্ডারগার্ড ব্যাটালিয়ন বিজিবির ছাতকের নোয়াকোট বিওপির একদল বিজিবির সদস্য জিরো লাইনে গিয়ে বিএসএফ ও অদুরে দাড়িয়ে থাকা গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে মাহেন্দ্র ট্রাক্টরটি আটক করেন।
ছনবাড়ির আবদুর নুর তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, গ্রামের স্কুলে ছেলে মেয়েরা যাতায়াতকালে ট্রাকে করে মাটি ফেলার কারনে ধুলাবালিতে তাদের জামাকাপড় নষ্ট হয়ে যায়, যে কারনে ট্রাক প্রতি ৫০ টাকা করে নিয়ে রোজ রাস্তায় পানি ফেলা হয়।
সিলেট সেক্টরের-৫ বর্ডারগার্ড ব্যাটালিয়নের বিজিবির ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক মেজর লুৎফুল করীম শনিবার সন্ধায় মুঠোফোনে আলাপকালে বলেন, অবৈধভাবে জিরো লাইনে অনুপ্রেবেশ করে মাহেন্দ্র ট্রাক্টর দ্বারা সোনাই নদীর তীরে মাটি ফেলা বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা কৃষি অফিসার কেএম বদরুল হক জানান, সোনাই নদীতে লালমাটি ফেলার কারনে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় রাবার ড্যামেও এখন প্রায় পানি শুন্য, বোরো–আমন ও শীত মৌসুমে ওই এলাকায় নাব্যতা সংকটের কারনে ধানের আবাদ এবং সবজী উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, পরিবেশ আইনের তোয়াক্কা না করে এভাবে নদী ভরাটের কারনে ফি বছর প্রায় আমন মৌসুমে এ উপজেলার সোনাই নদীর সেচ সুবিধা ভোগী কৃষকদের প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার মেট্রিকটন ধান উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বোরো মৌসুমে আগাম বন্যার ঝুকিতে থাকবে ছোট বড় ১০ হাওরের ৫ হাজার মেট্রিক টন ধান।
সিলেটের কোম্পনীগঞ্জের ইসলামপুরের ইউপি চেয়ারম্যান শাহজামালের নিকট নদী ভরাটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি শনিবার বলেন আমি পরিবেশের পক্ষে আছি, আমার ইউনিয়নের কিছু লোক ট্রাক প্রতি ১শ টাকা করে চাঁদা নিয়ে নদীর তীরে ও নদীর তলদেশে টিলার লাল মাটি ফেলে ভরাটের সুযোগ করে দিয়েছে, আমি বার বার বাঁধাও দিয়েছি, ইউএনও স্যারকেও বিষয়টি অবহিত করেছি।’
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক শেখ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়টি কেউ আমাকে অবহিত করেনি, নদী ভরাট করার অধিকার কারো নেই, নদীর কোন ব্যক্তি মালিকানাও নেই, আমি বিষয়টি সিলেটের জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলে দ্রত আইনি ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেব। এমনকি যেহেতু সুনামগঞ্জের ছাতকের কৃষকরাও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন নদী ভরাটের কারনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ও ছাতকের ইউএনওকেও বলব আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে নদী ভরাট বন্ধে দ্রত পদক্ষেপ নিতে।’
এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. জয়নুল আবেদীন এ প্রতিবেদককে বলেন, টিলা কাঁটা সম্পুর্ণ বে-আইনি, পরিবেশ ধ্বংস করে যারা সোনাই নদীর তীর ও তলদেশ ভরাট করছে সে বিষয়ে আমি কোম্পানীগঞ্জের ইউএনও’র সাথে আলাপ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেব।
Related News
৫ বছরেও শেষ হয়নি সুনামগঞ্জে সোমেশ্বরী সেতুর কাজ
Manual4 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বাসিন্দাদের স্বপ্নের সেতু এখন দুঃস্বপ্নে পরিণতRead More
সুনামগঞ্জ সীমান্তে বাংলাদেশি যুবক নিহত
Manual6 Ad Code বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার চারাগাঁও সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশRead More



Comments are Closed