জকিগঞ্জ মুক্ত দিবস আজ
রহমত আলী হেলালী: একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের আগেই দেশের যেসব অঞ্চল মুক্ত হয়েছিল তন্মধ্যে সুরমা-কুশিয়ারা বেষ্ঠিত সিলেটের সীমান্ত উপজেলা জকিগঞ্জ-ই ছিল প্রথম মুক্তাঞ্চল। একাত্তরের অগ্নিঝরা দিনের ২১শে নভেম্বর সারাদেশের আগে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও এদেশীয় রাজাকারদেরকে পরাজিত করে হানাদারমুক্ত করেছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এটা ছিল জকিগঞ্জ তথা সিলেট অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের গৌরবোজ্জ্বল ও বীরত্বপূর্ণ অধ্যায়। এনিয়ে আজ অবধি পুরো বাংলার মানুষকে দ্বি-মত পোষণ করতে দেখা না গেলেও মুক্তিযোদ্ধের সেই গৌরবময় ইতিহাস রাষ্ট্রীয়ভাবে আজও উপেক্ষিত। মহান স্বাধীনতার দীর্ঘ পয়তাল্লিশ বছর পেরিয়ে গেলেও অদৃশ্য কারণে স্বাধীন বাংলার প্রথম মুক্তাঞ্চলের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাচ্ছেনা জকিগঞ্জ উপজেলাবাসী। প্রতি বছর-ই বেসরকারিভাবে পালিত ২১শে নভেম্বর প্রথম মুক্তাঞ্চল দিবসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ অনেকেই প্রথম মুক্তাঞ্চলের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির আশ্বাস প্রদান করলেও তা হাওয়ায় উড়ে যায়। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে জকিগঞ্জের তরুণ প্রজন্মসহ সচেতন মহলের সবাইকে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে এখন চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ উপজেলার মানুষ এখন জানতে চায় জকিগঞ্জকে প্রথম মুক্তাঞ্চল হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়া আর কতদূর? মহান স্বাধীনতার দীর্ঘ চার যুগ পরও নতুন প্রজন্ম দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল রাষ্ট্রীয়ভাবে জানতে না পরে তাহলে জানবে কখন? যে সকল বীরমুক্তিযোদ্ধারা জকিগঞ্জ উপজেলাকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে মুক্ত করেছিলেন তাদের বীরত্বপূর্ণ এ স্বীকৃতি রাষ্ট্র দেবে কখন? মৃত্যুর আগে না পরে? এমন অনেক প্রশ্ন এখন জকিগঞ্জ উপজেলার সচেতন মহলের মুখে মুখে। এখন সবাই জানতে চায় জকিগঞ্জকে প্রথম মুক্তাঞ্চল হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কতদূর?
জানা যায়, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে জকিগঞ্জ সফরে আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার বক্তব্যেই জকিগঞ্জের মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার বীজমন্ত্র রোপিত হয়। উজ্জীবিত হয় জনতা। রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকেই জকিগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়। ২৫ মার্চের কালো রাতে ঢাকায় পাকস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর আক্রমণের খবর পেয়ে জকিগঞ্জের মানুষ মুক্তিসংগ্রামের জন্য সংগঠিত হতে থাকে। সেসময় জকিগঞ্জে মুক্তি বাহিনীকে সংগঠিত করতে নেতৃত্ব দেন আবদুল লতিফ এমসি, আবদুল আজিজ (কুটুলা মিয়া), মজিদ উদ্দিন (বলই মিয়া), অ্যাডভোকেট নিছার আলী, মোঃ নূর উদ্দিন, ফয়জুর রহমান মাস্টার প্রমুখ। ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল সকালে একটি জিপে করে ৮-১০ জন পাকসেনা জকিগঞ্জে প্রবেশ করে। পাকসেনাদের আগমনের খবর পেয়ে পাকিস্তানের মদদপুষ্ট প্রশাসন জকিগঞ্জ শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। এ সময় বাজারের চৌরাস্তায় পাকসেনারা পীরেরচক গ্রামের সরফান আলীর ১০ বছরের ছেলে ফরিদকে গুলি করে হত্যা করে। আর ফরিদই হলো জকিগঞ্জের প্রথম শহীদ। তখন মুক্তিযুদ্ধে জকিগঞ্জ ছিল ৪নং সেক্টরের অন্তর্ভূক্ত। অধিনায়ক ছিলেন তৎকালীন মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত (সিআর দত্ত)। সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত দেওয়ান ফরিদ গাজী এমপি ছিলেন এই সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা। ৬টি সাব সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন মেজর চিত্ত রঞ্জন দত্ত (সিআর দত্ত)। মরহুম দেওয়ান ফরিদ গাজী ৩ এপ্রিল ভারতের করিমগঞ্জে গিয়ে সেখানকার ডিসি, এসপিসহ আসাম সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশী শরনার্থীদের থাকা খাওয়া ও যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবস্থা করেন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, পাক বাহিনীর দোসর রাজাকার, আল বদর, আস শামস ও খনতি বাহিনী যখন সারাদেশে তান্ডব অব্যাহত রেখেছিল তখন মুক্তিযোদ্ধারা সিদ্ধান্ত নেন যে কোন মূল্যে জকিগঞ্জকে শত্র“মুক্ত করার। সে মতে একাত্তরের ২৭ মার্চ জকিগঞ্জ ডাক বাংলোয় এক গোপন বৈঠকে থানার সকল ইপিআর ক্যাম্পের পাক সেনাদের খতমের সিদ্ধান্ত হয়। ২৮ মার্চ বীর মুক্তিযোদ্ধা মেকাই মিয়া, চুনু মিয়া, আসাইদ আলী, ওয়াতির মিয়া, তজমিল আলী, মশুর আলী, হাবিলদার খুরশিদ, করনিক আবদুল ওয়াহাব, সিগনালম্যান আবদুল মোতালেব প্রমূখ প্রথম জকিগঞ্জ ও মানিকপুর ইপিআর ক্যাম্পে অপারেশন চালিয়ে পাক সেনাদের খতম করে জকিগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেন। তারপর সাবেক এমপি মরহুম দেওয়ান ফরিদ গাজী, এমএলএ আবদুল লতিফ, এমএলএ আব্দুর রহিম, সেক্টর কমান্ডার চিত্ত রঞ্জন দত্ত, মিত্র বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার ওয়াটকে ও কর্নেল বাগচিসহ ভারতের মাছিমপুর ক্যান্টনম্যান্টে জকিগঞ্জকে স্বাধীন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ঐ পরিকল্পনায় ছিল কিভাবে কুশিয়ারার ওপারে ভারতের করিমগঞ্জের মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে জকিগঞ্জ দখল করা যায়। জকিগঞ্জ শত্রুমুক্ত করার যুদ্ধ শুরুর পূর্বে অন্য কেউ এমনকি অনেক মুক্তিযোদ্ধারাও এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। এই যুদ্ধ পরিকল্পনায় আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের মধ্যে সাবেক এমপি দেওয়ান ফরিদ গাজী, তৎকালীন এমপি আব্দুল লতিফ, ইসমত চৌধুরী ও আব্দুল মুয়িদ চৌধুরী ছিলেন। পরিকল্পনা অনুসারে ২০ নভেম্বর রাতে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনী ৩টি দলে বিভক্ত হয়ে প্রথম দল লোহার মহলের দিকে ও দ্বিতীয় দল আমলশীদের দিকে অগ্রসর হয়। মূল দল জকিগঞ্জের কাস্টমঘাট বরাবর করিমগঞ্জ কাস্টম ঘাটে অবস্থান নেয়। প্রথম ও দ্বিতীয় দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে কুশিয়ারা নদী অতিক্রম করে জকিগঞ্জের দিকে অগ্রসর হয়। খবর পেয়ে দিকবিদিক ছুটাছুটি শুরু করে বর্বর পাক বাহিনী। মুক্তিবাহিনী তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে ভেবে তারা আটগ্রাম-জকিগঞ্জ সড়ক দিয়ে পালাতে থাকে। এর ইমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় দল ভারত থেকে জকিগঞ্জে পৌঁছে যায়। মুল দল কুশিয়ারা নদীতে সেতু তৈরী করে জকিগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। তখন জকিগঞ্জ কাস্টমঘাটের নদীরচরে পাক সেনাদের বুলেটে প্রাণ হারান ভারতীয় মিত্রবাহিনীর মেজর চমন লাল ও তার দুই সহযোগী। এ সময় কয়েকজন পাক সেনাকে আটক করা হয়। এভাবেই মুক্ত হয় জকিগঞ্জ। ২১ নভেম্বর ভোরে জকিগঞ্জের মাটিতেই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেন মুক্তিযোদ্ধারা। এ সময় পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক আটকৃত বন্দিদের জকিগঞ্জ থানা থেকে মুক্ত করা হয়। পরদিন জেডফোর্সের অধিনায়ক সাবেক রাষ্ট্রপতি মেজর জিয়াউর রহমান জকিগঞ্জে প্রবেশ করেন। ঐদিন জকিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক ঐতিহাসিক সভার মাধ্যমে দাউদ হায়দারকে জকিগঞ্জের বেসামরিক প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। শত্র“মুক্ত এলাকায় শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে বীর মুক্তিযোদ্ধা এনাম চৌধুরীকে প্রধান করে মুক্তিযোদ্ধা স্পেশাল কামান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এনামুল মজিদ চৌধুরীকে উপপ্রধান করে ও বর্তমান জকিগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার খলিল উদ্দিনকে সহকারি কামান্ডার নিয়োগ করে প্রশাসনিক কর্মকান্ড শুরু হয়।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মতে, অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে ২১শে নভেম্বর প্রথম জকিগঞ্জ উপজেলাকে মুক্ত করে গৌরবোজ্জ্বল ও বীরত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচনা করেছিলাম আমরা-ই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিজয়ের চার যুগ পরেও রাষ্ট্রের নিকট আজও স্বীকৃতিটা দাবী করছি! তারা মনে করেন, জকিগঞ্জকে প্রথম মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করা না হলে এক সময় ইতিহাস বিকৃতকারীদের হাতে মহান মুক্তিযোদ্ধের স্বর্ণালী এ অধ্যায় বিকৃত হতে পারে। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের নিকট স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা দেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল হিসেবে জকিগঞ্জকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের জোর দাবী জানিয়েছেন।
লেখক: সম্পাদক- সাপ্তাহিক জকিগঞ্জ সংবাদ ও যুগ্ম সম্পাদক- জকিগঞ্জ প্রেসক্লাব, সিলেট।
Related News
ওসমানীনগরে জমি নিয়ে বিরোধে কুপিয়ে খুন, গ্রেফতার ১
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের ওসমানীনগরে ‘আতিক মিয়া’ হত্যা মামলার পলাতক এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে স্পেশালRead More
জকিগঞ্জে প্রবাসীর বাড়িতে ডাকাতি, টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট
বৈশাখী নিউজ ডেস্ক: সিলেটের জকিগঞ্জে প্রবাসী হোসেন আহমদের বাড়িতে এক দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। ডাকাতRead More



Comments are Closed