Main Menu

তাহিরপুরে যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতা সহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের বাদাঘাটে চুরির অপবাদ দিয়ে নির্যাতন ও পূর্ব পরিকল্পিতভাবে এক যুবকের মুখে বিষ ঢেলে হত্যার অভিযোগে বৃহস্পতিবার রাতে যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতা সহ ১১ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের হয়েছে।
নিহত যুবকের নাম মানিক মিয়া (২০)। সে উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়নের বারহাল গ্রামের ছাত্তার মিয়ার ছেলে ও বাদাঘাট বাজারের পান দোকানদার।
এদিকে এ মর্মান্তিক ঘটনায় গোটা জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজের লোকজনের পক্ষ থেকে নিরব শোক আর নিন্দার ঝড় বইলেও ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ এ ঘটনায় জড়িত কাউকেই গ্রেফতার করতে পারেনি।
মামলা সুত্রে জানা যায়, উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়নের হতদরিদ্র পরিবারের সদ্য বিবাহিত যুবক ছাক্তার মিয়ার ছেলে পান দোকানদার মানিককে গত মঙ্গলবার রাতে চোর শনাক্ত করণে চাল পড়া ও মানসিক চাঁপ সৃষ্টির পাশাপাশি নির্যাতন করে বিষপানে আত্বহত্যার প্ররোচনায় বাধ্য করা হয়। ওই ঘটনায়, উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়নের যুবলীগের যুগ্ন আহবায়ক ও বাদাঘাট বাজার বণিক সমিতির সাধারন সম্পাদক পৈলনপুর গ্রামের মৃত রহিছ উদ্দিনের ছেলে মাসুক মিয়া, তার সহোদর একিনুর, কুদ্দছ, ভাগ্নে একই গ্রামের খুর্শীদ মিয়ার ছেলে মনসুর আলম, মাসুকের শ্যালক একই গ্রামের মৃত নুর ইসলামের ছেলে এবং বাদাঘাট সরকারি কলেজের ছাত্রলীগ সভাপতি প্রার্থী আজহারুল ইসলাম সোহাগ, একই গ্রামের মৃত কালাগাজীর ছেলে মুছা, বাদাঘাট ইউনিয়নের দীঘিরপাড় গ্রামের মৃত মহিউদ্দিনের ছেলে বাজারের সুতা-মসলা ব্যবসায়ী শফিকুল, তার সহোদর আমিরুল, লামাপাড়া মৃত শাহ নেওয়াজের ছেলে সুতা মসলা ব্যবসায়ী ক্বারী মিয়া, কামড়াবন্দ গ্রামের মৃত আবদুল হামিদের ছেলে জহিরুল, মোল্লাপাড়া গ্রামের ইলিয়াস মিয়ার ছেলে জুবায়েরের বিরুদ্ধে নিহত মানিকের সহোদর রতন বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে এ মামলা দায়ের করেন। মামলায় অজ্ঞাত নামা আসামী করা হয়েছে ৪ জনকে।
নিহতের বাবা ছাত্তার মিয়ার দাবি, তার ছেলে মানিক মিয়া বিষপান করেনি। তাকে নির্যাতন করে মুখে বিষ ঢেলে দিয়ে হত্যা করেছে ওই ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম-আহবায়ক ও বাদাঘাট বাজারের বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাসুক মিয়া এবং তার লোকজন। তারা এখন খুনের বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে।’ তিনি আরো বলেন, পুলিশ আমাদের কথা আমলে না নিয়ে হত্যা মামলা না করার জন্য নানাভাবে চাঁপ সৃষ্টি করে, বৃহস্পিতবার রাতে তদন্ত করতে নামে পুলিশ, তদন্ত কাজে প্রভাব বিস্তার করতে চারপাশে অভিযুক্তরা তাদের আত্বীয়-স্বজন নিয়ে ঘুরঘুর করতে থাকে। পুলিশ প্রথমেই স্থানীয় আওয়ামীলীগ অফিসে বসে মাসুকের নিজস্ব লোকজনের নিকট থেকে সাজানো স্বাক্ষ্য গ্রহন করতে থাকে। এরপর রাতে পুলিশ আমার বাড়িতে গেলে মাসুক ১০ থেকে ১৫টি মোটর সাইকেলে করে তার লোকজন পাঠায় তদন্তকাজে বাঁধা সৃষ্টি করতে। অভিযুক্তদের জনববল নিয়ে দিনভর বাজারে মহড়া দেয় যেন বাজারবাসী ঘটনার ব্যাপারে মুখ না খুলতে পারেন। নিহত মানিকের বয়োবৃদ্ধা মা কান্নাজড়িত কন্ঠে আহাজারী করতে করতে বলেন, মাত্র দু’মাস আগে আমার মানিককে বিয়া করাইছলাম, আর বুধবার রাতে মানিক খুনের মধ্য দিয়ে তার নববধুর হাতের মেহেদীর রং মুছতে না মুছতেই কেন তাকে বিধবার সাদা শাড়ি পড়তে হল-? কারা সালিসকারী? কারা নির্যাতনকারী? এসব প্রশ্নের উত্তর খুজলেই আইনশৃস্খলা বাহিনী খুজে পাবে মানিক কাদের হাতে খুন হয়েছে?
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মামলার আসামী ও মাসুকের ভাগ্নে মনসুর আলম তার এক পোষ্টে নিজস্ব মতামত তুলে ধরে বলেন “চাউল পরা খাওয়ানো হয় বনিক সমিতির অফিসের বাহিরে, কিন্তু সে সময় মাসুক এখানে উপস্থিত ছিলেন না।’ তবে চুর আর চাউল খাওয়ানোর ঘটনা শুনে মাসুক মিয়া সেখানে উপস্থিত হয়ে সবাই কে নিয়ে তার বনিক সমিতির অফিসে চলে যায় সমাধান দিতে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বনিক সমিতির সভাপতি সেলিম হায়দার ও সাধারন সম্পাদক মাসুক মিয়া আরো অনেকেই। তবে সেখানে কারো উপর কোনো মানসিক নির্যাতন হয় নাই, সম্পূর্ন বোয়া খবর।
প্রশ্ন উঠেছে যেখানে মাসুকের ভাগ্নে ও মামলার আসামী নিজেই জানান দিয়েছে, মানিককে বণিক সমিতির অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেখানে বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ তদন্তের নামে কী কারনে স্থানীয় আওয়ালীগ অফিসে অভিযুক্তদের স্বজনদের স্বাক্ষ্য নিতে তৎপর ছিলেন?।
উল্ল্যেখ যে, উপজেলার বাদাঘাট বাজারের সুতা ও মসলা ব্যবসায়ী শফিকুলের দোকান থেকে মঙ্গলবার রাতে ৭০ হাজার টাকা চুরি হয়। ওই রাতে শফিকুল তার সহযোগিরা চোর শনাক্ত করার জন্য কথিত এক নারী কবিরাজের কাছ থেকে চালপড়া নিয়ে আসে। এরপর চোর সন্দেহে রাত সাড়ে ৭টার দিকে শফিকুলের দোকানের সামনে পান দোকান নিয়ে বসা হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে মানিকসহ স্থানীয় গাড়িচালক, হোটেল কর্মচারী ও তার নিজের দোকানের কর্মচারীকে পড়া চাল খেতে দেয়। মানিক চাল খেতে না পারায় শফিকুল ও তার সহযোগীরা বাজারের শতাধিক ব্যবসায়ীর উপস্থিতিতে তাকে চোর বলে চিহ্নিত করে। এরপর সালিশ বৈঠকে যুবলীগ নেতা মাসুক মিয়া, তার ভাগ্নে মনসুর, তার শ্যালক আজহারুল ইসলাম সোহাগসহ তার লোকজন এসে মানিককে চুরির টাকা ফেরত দেয়ার জন্য চাপ দেয়। পরে মাসুক ও তার লোকজন মানিককে রাতে বণিক সমিতির অফিস কিংবা কাপড় পট্টির একটি দোকানে নিয়ে দরজা বন্ধ করে নির্যাতন করে। পরে মানিকের অবস্থা বেগতিক দেখে বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টার অপপ্রচার চালায় তারা।
সূত্র জানায়, বুধবার রাতে মাসুকের লোকজন স্থানীয় বাদাঘাট বাজারের এক চিকিৎসকের কাছে মানিক নিয়ে গেলে তিনি তার চিকিৎসায় অপারগতা প্রকাশ করেন। এর পর মাসুকের লোকজন মানিককে ফেলে রেখে যে যার মত চলে গেলে মানিকের পরিবারের লোকজন রাত সাড়ে ১০টার দিকে গুরুতর আহত মানিক মিয়াকে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে রহস্যজনক কারনে সেখান থেকেও তাকে জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হলে পথে সে মারা যায়। এরপর থেকেই সালিশকারী ও মাসুকের লোকজন এলাকায় প্রচার করতে থাকে মানিক চুরির অপবাদ সইতে না পেরে নিজেই বিষপানে আত্বহত্যা করেছে।
মাসুকের ভাতিজা কলেজ শিক্ষার্থী “কামাল উদ্দিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের মন্তব্য তুলে ধরে বলেন, মানিক দুই মাসও পূর্ণ হয়নি ছেলেটা বিয়ে করেছে হয়তোবা দুই হাতের মেহেদীর রং এখনও মুছে যায়নি ৷ অনেক স্বপ্ন নিয়ে নতুন ব্যবসা শুরু করেছিল ৷ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত লাজুক এই ছেলেটা ৷ মিথ্যা অপবাদ সহ্য করতে পারেনি বলে আত্নহত্যা করল বুধবার রাতে ৷ মানিকের সাথে যারা মিশেছে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি তারা কেউই বিশ্বাস করবেনা যে সে এভাবে চুরি করতে পারে ৷ চাল পড়া দিয়ে চোর ধরা যায় এই অন্ধ কুসংস্কারই মানিককে চোর বানিয়ে দিল ৷ এই অন্ধ বিশ্বাস মানিকের জন্য কাল হল । যাদের জন্য মানিকের এই নির্মম মৃত্যু, যারা তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে তাদের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করছি ।’
তাহিরপুর থানার ওসি শ্রী নন্দন কান্তি ধর শুক্রবার এ প্রতিবেদককে বলেন, আপাতত মানিককে আত্বহত্যার প্ররোচনায় বাধ্য করা হয়েছে এ অভিযোগেই মামলা নেয়া হয়েছে, পরবর্তীতে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে যদি দেখা যায় মানিককে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে তখন মামলায় হত্যা মামলার ধারাও যুক্ত করা হবে।

Share





Related News

Comments are Closed