Main Menu

হত্যাকান্ডকে যেভাবে হজম করল পুলিশ!

বিশেষ প্রতিনিধি: ছবিটি ঝুলন্ত নয়, খাটের উপর দাঁড় করে রাখা, একপা খাটের উপর বিছানায় পাতিয়ে রাখা এবং অপর পা বাঁকা করে রাখা। বিছানার উপরের পলিথিনও মোড়ানো। পা সোজা করে রাখতে গিয়ে মুড়ে যায় পলিথিন। দু’পা বেয়ে ঝরছিল রক্ত। নিচে দেখা গেছে একখানা ভেজা লুঙ্গি কাপড়, যেটার উপর রক্ত ঝরে পড়েছে। পেছনে খাটের উপর দেহের সাথে লাগানো পরিপাটি ও সোজা ‘পাতাইর’ করে রাখা প্লাস্টিকের একটি চেয়ার। ঘরে তীরের সাথে গলায় ওড়না পেচানো। ঘরের তীর এতো নিচু যে চেয়ারে উঠলে মাথাটা তীরের উপরে উঠে যাবে। যার মাথার চুল আউলা, চোখ বুঝা ও জিহবাটাও ঠুটের ভেতর। হাতের দুটি শাহাদত আঙ্গুলও সোজা। হাতের চুড়িগুলো উপরের দিকে উঠিয়ে রাখা। দেহটা হেলে রাখা যা সোজা খাড়া করলে আরো উপরের দিকে উঠবে। এসময় তার শরীরে হাটছে অসংখ্য কালো ছোট ও লাল পিপড়া। কিন্তু বিছানা, খাট ও ঘরের তীরে কোন পিপড়া দেখা যায়নি। চোখবুঝা মহিলাটি দৃশ্যত বিছানার উপর ভর করে একটু হেলে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে। পুলিশ যাওয়ার আগে ঘরটির দরজাও ছিল খোলা।
এটা সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ থানাধীন দিঘলবাক নোয়াগাঁয়ের গৃহবধূ এক সন্তানের জননী সাজনা বেগমের মরদেহ। তার স্বামী লিয়াকত আলী ওই গ্রামের রইছ আলীর পুত্র।
গত ২২ জুন এসএমপির জালালাবাদ থানার এসআই আক্তারুজ্জামান পাঠন-এর নেতৃত্বে একদল পুলিশ ওই মহিলার মরদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য ওসমানী মেডিকেল কলেজ মর্গে প্রেরন করে।
তখন মৃতার স্বজনসহ প্রত্যক্ষদর্শীরা এটাকে হত্যাকান্ড বলে দাবি করেন। তারা বলেন, গৃহবধূ সাজনা সহিংসতার শিকার হয়ে ঘাতক স্বামী ও স্বামী পরিবারের হাতে খুন হয়েছে। খুনীরা মৃতার স্বজনদের না জানিয়ে পুলিশকে খবর দেয় এবং পুলিশকে ম্যানেজ করেই এটাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়। পুলিশ মোটা অংকের টাকা পেয়ে এটাকে আত্মহত্যা প্রমান করার জন্য যা’ যা’ কৌশল অবলম্বন করার তাই করেছে। আলামত হিসেবে শুধুমাত্র মৃতার গায়ের জামা জব্ধ করলেও পায়ের নিচে থাকা রক্তভেজা লুঙ্গিটি জব্ধ করেনি। জব্ধ করেনি বিছানার চাঁদর ও চাঁদরের উপর থাকা রক্তভেজা পলিথিন। ঘটনাস্থলে পুলিশ সুরতহাল রিপোর্ট তৈরী না করেই অলিখিত সাদা কাগজে মৃতার স্বজনসহ কয়েকজনের দস্তখত সংগ্রহ করে তড়িগড়ি লাশ ময়না তদন্তের জন্য ওসমানী মেডিকেল কলেজ মর্গে প্রেরন করে।
এখানেই শেষ নয়, ঘটনাস্থলে জোরপূর্বক অলিখিত দুটি সাদা কাগজে মৃতার ভাইবোনদের স্বাক্ষর নিয়ে পুলিশ থানায় ও ফাঁড়িতে বসে ইচ্ছেমত মৃতার সুরতহাল রিপোর্ট করে। পাশাপাশি অলিখিত সাদা কাগজের নিচে জোরপূর্বক মৃতার বোনের নেয়া দুটি স্বাক্ষর সম্বলিত কাগজটিতে তার অগোচরেই ইচ্ছেমত দরখাস্ত লিখিয়ে থানার ওসির অবর্তমানে এসআই আরিফকে দিয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা (নং-১১/৬) রুজু করিয়ে জলন্ত একটি হত্যাকান্ডকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়। পাশাপাশি ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট আত্মহত্যার পক্ষে করানোর নিমিত্তে পুলিশ ও খুনীরা মোটা অংকের টাকা দিয়ে ওই দিন রাতেই এক দালালকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়।
ঘটনার প্রায় ১মাস পর গত ১৭ জুলাই পুলিশের আরেক পদস্থ কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে রক্তমুছা ও ধোয়া পলিথিন, চেয়ার ও দরজার বেন্দা (ওড়কা) জব্ধ করেন । কিন্তু রক্তভেজা লুঙ্গিটা খোজে পাননি তিনি। ঘরের দরজার চাবি ঘাতকদের হাতে থাকায় তারা হত্যার অনেক আলামত নষ্ট ও লুকিয়ে ফেলেছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।
এলাকাবাসী আরো জানান, ওই দিন আগের রাতে তারা ওই বাড়িতে কান্নাকাটি ও আর্তচিৎকার শুনেছেন। পুত্রবধু সাপ দেখে চিৎকার করেছে বলে তার শাশুড়ী জমিলা আশপাশের লোকজনকে জানান। তাই লোকজন আর ঘটনাস্থলে আসেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার দুজন মহিলাসহ লোকজন জানান, আগের রাতে সাজনাকে মারপিট করে গুরুতর আহত করা হয়। সেহরী খাওযার সময় সে সেহরীও খায়নি। বলেছে রাত পোহালে তার ভাই-বোনদেরকে খবর দেবে এবং বাড়িতে আগুন লাগবে। এ ধমকি শুনে স্বামী ও শশুরবাড়ির লোকজন মুখে বালিশ চাপা দিয়ে নিন্মাঙ্গের দিকে আঘাত করে তাকে হত্যা করে প্রথমে ঘরের মেঝেতে মাটিতে ফেলে রাখে। ফলে তার গায়ে পিপড়া ওঠে। পরে সকালে গলায় ওড়না পেচিয়ে তীরের সাথে টানিয়ে তাকে বিছানার উপর দাঁড় করিয়ে রাখে ও পুলিশকে খবর দেয়। কিন্তু সাজনার স্বজনদের খবর দেয়নি। গ্রামের লোকদের মাধ্যমে খবর পেয়ে সাজনার স্বজনরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরে পুলিশ কৌশলে অলিখিত সাদা কাগজে জোরপূর্বক মৃতার ভাই-বোনদের স্বাক্ষর নিয়ে তাদের অজান্তে সুরতহাল রিপোর্ট লিখে হত্যামামলার বদলে একটি অপমৃত্যু মামলা রুজু করে। কিন্তু সত্য যে সত্য তা অনেক সময় গোপনকারীদের মাধ্যমেও বেরিয়ে আসে। জালালাবাদ থানার এসআই আক্তারুজ্জামান পাঠান তার সুরতহাল রিপোর্টে মৃত্যুর সময় ২২ জুলাই সকাল ৯টা লিখেছেন। কিন্তু এ ঘটনায় দায়ের করা অপমৃত্যু মামলায় (নং-১১/১৬) লিখা হয় মৃত্যুর সময় ওইদিন দুপুর ১টা। মামলার দরখাস্তের নিচে আবেদনকারীর দুটি দস্তখত এবং আবেদনে কালি ও কলমের সাথে দস্তখাতের কালি ও কলমের কোন মিল নেই। আরো মজার ব্যাপার ওই দিন ঘটনাস্থলে লাশ উদ্ধারে জালালাবাদ থানার মহিলা কনেষ্টবল (কং৮৪৩) খায়রুন নাহার মোটেও যাননি। কিন্তু এসআই আক্তারুজ্জামান সুরতহাল রিপোর্টে মিথ্যেভাবে কনষ্টেবল খায়রুন নাহারের নামও লিখে দেন। ময়না তদন্তের আগের রাতেই এসআই আক্তার থানার জিডি নং ১০৩১ তাং ২২.০৬.২০১৬ ও অপমৃত্যু মামলা নং ১১/১৬ এবং মৃতার নাম দিয়ে ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা রিপোর্ট আত্মহত্যার পক্ষে করানোর জন্য মোটা অংকের টাকা দিয়ে তদবিরের জন্য এক দালালকে ঢাকাস্থ সংশ্লিষ্ট অফিসে পাঠিয়ে দেন।

Share





Related News

Comments are Closed